শিবুই ঘনাদার হয়ে জবাব দিলে, পটল নয় বা কেন, কী বলছিস! আলবৎ পটল, একশোবার পটল। পাটনাই পটল। পটলই যদি না ফলাতে পারলাম তো ছাদের উপর বাগান করা কেন? চেষ্টায় কী না হয়।
শিবু দম নেবার জন্য থামতেই আমি ধরে নিলাম, নিশ্চয়! অ্যাব্রাহাম লিংকনের কথা মনে করো না? কুড়ুল দিয়ে সেই গাছ কাটার পর বাবা জিজ্ঞেস করতেই কী বলেছিল?
জুৎসই দৃষ্টান্তগুলো যথাসময়ে আমার কেমন করে ঠিক জুগিয়ে যায়।
শিশির শুধু একটু শুধরে দিলে, লিঙকন নয়, স্যার আইজ্যাক নিউটন।
বন্ধুবিচ্ছেদের সময় এটা নয়। আমি উদারভাবে মেনে নিয়ে বললাম, ওই একই কথা। আসল ব্যাপার হল এই যে, খাদ্য বাড়াতে হবে, যেমন করে পারা, যেখানে পারো।
গৌর দ্বিগুণ উৎসাহিত হয়ে উঠল, ঠিক বলেছ। Grow more food! পৃথিবীতে খাদ্যাভাব দিন দিন বাড়ছে, দুর্ভিক্ষ রাক্ষসী করাল মুখব্যাদান করে ক্রমশ এগিয়ে আসছে সমস্ত মানবজাতির দিকে। এখন এতটুকু জমি ফেলে রাখলে চলবে না। ছাদ, ছাদই সই।
আর ঘনাদার ঘরের সামনেই যখন বাগান, তখন দেখাশোনা সম্বন্ধে তো ভাবতেই হবে, না! শিবু ছাদে তরি-তরকারির বাগানের সপক্ষে সব চেয়ে জোরালো যুক্তি দেখাল।
ঘনাদা তবু নীরব। চোখদুটোতেই শুধু একটু ঝিলিক যেন দিচ্ছে। এই ঝিলিক এখন না নেভে! গৌরকেই উদ্দেশ করে বললাম, নার্সারিতে বীজ-টিজের অর্ডার দিয়েছিস তো?
তা আর দিইনি! গৌর কর্তব্য সম্বন্ধে হুঁশিয়ারির প্রমাণ দিলে, শুধু বীজ কেন? সিৰ্জি থেকে ফসফেট, ধাপা থেকে হাড়ের গুঁড়ো-সব আনছি।
ঘনাদা এখনও যদি ফেটে না পড়েন তা হলে তো নাচার।
এইজন্যই বুঝি ব্রহ্মাস্ত্রটি গৌর এতক্ষণ চেপে রেখেছিল। এইবার বাঁধানো খাতাটা ভক্তিভরে ঘনাদার সামনে খুলে ধরে বলল, এখন এইটিতে শুধু একটা সই দিতে হবে ঘনাদা!
কেন? সেফটি ভালভ প্রায় ফাটিয়ে বয়লারের যেন স্টিম বেরুল।
এই আপনার সইটা সবার আগে থাকলে আবেদনটার দাম বাড়বে কিনা? গৌর সগর্বে জানালে।
কীসের আবেদন?–ছাদে ধান-খেত করার?
ঘনাদার বিদ্রুপটা গৌর গায়েই মাখলে না৷ বিনীত ভাবে বলল, না, না, ছাদে চাষ তো হচ্ছেই, তার ওপরে আরও কিছু করা তো দরকার এই খাদ্য-সংকটে। তাই আমরা সবাইকে একটা শপথ নেবার আবেদন জানাচ্ছি। এই পড়ুন না। আন্তর্জাতিক আবেদন বলে এসপেরান্টোতে লিখলাম।
বাঁধানো খাতার প্রথম পাতাটাতেই হিজিবিজি একটা কী লেখা রয়েছে বটে, কিন্তু তার পাঠোদ্ধার করতে লিপিবিশারদ প্রত্নতাত্ত্বিকেরও ক্ষমতায় কুলোবে বলে মনে হয় না।
ঘনাদা একবার সেদিকে চকিত দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বললেন, তুমিই পড়ো।
এসপেরান্টোটা বাংলায় অনুবাদ করেই পড়ো। আমাদের কাতর অনুরোধ।
গৌর মূল এসপেরান্টো পড়তে না পারায় যেন বেশ ক্ষুন্ন হয়েই বাংলায় অনুবাদ করে যা শোনালে, তার মর্ম হল এই যে, পৃথিবীর অন্ন-সমস্যার আংশিক সমাধানের জন্যে আমাদের সকলকে এখন থেকেই স্বল্পাহারের শপথ নিতে হবে। আধ-পেটা যদি না পারি তো অন্তত সিকি ভাগ খাওয়া সকলে যেন ছাড়ে—এই আবেদন।
আবেদনটা বুঝিয়ে দিয়েই গৌর সোৎসাহে জানালে, পরীক্ষাটা নিজেদের ওপরই শুরু করছি, ঘনাদা! আজ থেকেই মেসের সিকি মেনু হেঁটে দিয়েছি। কাল সকাল থেকে ভাত ডাল আর স্রেফ একটি তরকারি। মাছ হতেও পারে, না-ও হতে পারে। মাপেও সব কিছু কম। থালায় বাটিতে যা দেবার দিয়ে এক হাতা করে তুলে রাখা হবে। যাকে বলে বাধ্যতামূলক জাতীয় সঞ্চয়।
এই? ঘনাদা নাসিকাধ্বনি করলেন।
হ্যাঁ, আপাতত তো এই। গৌর বেশ হতভম্ব। আমরা তো বটেই।
আপনি আরও কিছু ভেবেছেন নিশ্চয়? শিবুর উসকানির চেষ্টা।
আরও কিছু নয়, অন্য কিছু। ঘনাদা সংক্ষিপ্ত।
মানে গোড়াতেই আপনি অন্য কিছু বুঝেছিলেন? আমাদের বিস্ময়।
হ্যাঁ, ভেবেছিলাম, পেটেন্টটা বুঝি নেওয়ার ব্যবস্থা করে এসেছ। আমার চুঁচটা সত্যিই ফাল হয়ে বেরিয়েছে শেষ পর্যন্ত।
আপনার ছুঁচ! শিশির তক্তপোশের তলা থেকে ছুঁচসুষ্ঠু গুঁজে রাখা জামাটা তুলে ধরে ছুঁচটা বার করতে করতে বললে, ফাল তো হয়নি। এখনও ছুঁচই আছে দেখছি।
ও ছুঁচ নয়। ছুঁচের মতোই সরু ছোট কাঁচের পিপেট! ঘনাদা আমাদের প্রতি করুণাকটাক্ষ করে বললেন, একবার রক্তনদী বইয়ে যা সেইসঙ্গে একদিন জলে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিল, যা না থাকলে সূর্যদেবকে বধ করার অস্ত্র এ যুগে আর তৈরি করবার আশা মানুষকে ছাড়তে হত।
সূর্যদেব মানে, আমাদের এই সত্যিকার আকাশের সূর্য, আপনার সেই ছুঁচেই কাত।
এক রকম তাই বলতে পারো, ঘনাদার বলার ধরনে বোঝা গেল কোনওরকম বড়াই তাঁর পছন্দ নয়।
শিশির ছুঁচটা রেখে দিয়ে সিগারেটের টিনটা তখন খুলে ফেলেছে।
ঘনাদা সিগারেট তুলে নিয়ে, ধরিয়ে, গোটা দুই সুখটান দিয়ে খানিকক্ষণ চোখ দুটি বুজে চুপ করে রইলেন।
আমরা উদগ্রীব।
আমাদের বেশ কিছুক্ষণ আশা-নিরাশার দোলায় দুলিয়ে রেখে ঘনাদা অবশেষে চোখ মেলে তাকিয়ে ওপরের ছাদটাকেই সম্বোধন করে বললেন, তখন আমি কোথায়?
আমরাও তখন আর নেই।
ঘনাদার এরকম স্মৃতিভ্রংশ আমাদের কল্পনাতীত।
তাঁর স্মরণশক্তির মরা আঁচ যথাসাধ্য চাগিয়ে তোলার আশায় যে যেমন পারি কাঠকুটো এগিয়ে দেবার চেষ্টা করলাম।
কলম্বিয়ায়? আমার কুটো।
চুকচিদের দেশে! শিবুর প্যাঁকাটি।
নোভালা জেমলিয়া! গৌরের ক-ফোঁটা কেরোসিন।
আমাদেরই এই মেসে! শিশিরের এক আঁজলা জল একেবারে।
