ঘনাদার জরুরি কাজ! এই সান্ধ্যভ্রমণে খিদেটা শানিয়ে আসার পর!
আমরা কোনও রকমে হাসি চাপলাম।
কিন্তু এত খেটে শেষে শক্ত অসুখে পড়বেন যে! শিবু গভীর সহানুভূতি জানাল, এক-আধ দিন একটু বিশ্রাম নিলে হয় না?
ঘনাদা জবাব না দিয়ে যেভাবে ভসনার দৃষ্টিতে আমাদের দিকে চেয়ে বেরিয়ে গেলেন, তাতে মনে হল য়ুরি গ্যাগারিনকে ভোস্টকে চড়বার মুখে আমরা যেন পিছু ডেকেছি।
অতএব আবার মন্ত্রণাসভা বসাতে হল।
ঘনাদাকে এবার চাগানো যায় কী করে?
গতিক এবার মোটেই সুবিধের নয়। সমস্যাটাই গোলমেলে।
রাগারাগি ঝগড়াঝাঁটি কিছু হয়নি যে ঘনাদা জেদ করে গুম হয়ে আছেন। দিব্যি খাচ্ছেন-দাচ্ছে, ঘুরছেন-ফিরছেন, আলাপ-সালাপ করছেন, কিন্তু আসল টোপটি গেলাতে গেলেই কেমন পিছলে বেরিয়ে যাচ্ছেন। এ ক-দিন হেন চেষ্টা নেই যে করিনি, কিন্তু সবই পণ্ডশ্রম। আমাদের জ্বলন্ত দেশলাইয়ের কাঠি যেন বারুদের বদলে ভিজে বালিতে পড়ে নিবে গিয়েছে।
এখন করা যায় কী!
তোয়াজ করা ছেড়ে চটিয়ে দেখা যাক। শিবুর পরামর্শ।
আহা, চটাতেই তো গেলাম। গৌরের হতাশা, কিন্তু কাজ হল কই।
আরও কড়া দাওয়াই চাই। আমার সিদ্ধান্ত।
আমার ধার দেওয়া সিগারেট সব ফেরত চাইব? শিশিরের দ্বিধা।
না, তাতে হিতে বিপরীত হতে পারে। আমাদের আশঙ্কা।
তা হলে ধার বাড়িয়ে দি? একেবারে পাঁচ হাজার? শিশিরের উৎসুক জিজ্ঞাসা।
মন্দ নয় মতলবটা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেটাও বাতিল করতে হল। প্যাঁচটা পুরোনো। দাঁত কেটে গেছে। ঠিক ধরবে না।
হঠাৎ গৌর বলে উঠল, ঠিক হয়েছে, আর ভাবনা নেই।
কী ঠিক হয়েছে, কী? আমরা উৎসুক।
কানের জল কী করে বেলোয়? গৌর প্রশ্ন করে নিজেই জবাব দিলে, জল ঢেলে। তাই ভাঁওতা দিয়েই ভাঁওতা বার করতে হবে।
সেটা কী রকম?
ভাঁওতাটা দেব কী?
ভবি কি ভুলবে?
আমাদের প্রত্যেকের নানারকম সন্দেহ।
চল, দেখাই যাক না।
আমাদের তেতলার সিঁড়ির নীচে দাঁড় করিয়ে রেখে গৌর ঘরের মধ্যে কী করতে গেল জানি না।
খানিকবাদে যখন বেরিয়ে এল তখন হাতে তার একটা বাঁধানো খাতা।
আমাদের সরব ও নীরব কৌতূহল অগ্রাহ্য করে সে আগেভাগে সিঁড়ি দিয়ে বেশ একটু সশব্দেই ওপরে উঠল। আমরা তার পিছু পিছু।
তেতলায় ঘনাদার একানে একটি ঘর। সামনে ছোট একটু খোলা ছাদ।
সিঁড়ি দিয়ে উঠতেই খোলা দরজার ভিতর দিয়ে দেখতে পেলাম ঘনাদা আমাদের পায়ের শব্দ পেয়ে তাড়াতাড়ি একটা জামা আর হাতের ছুঁচসুতোটা তক্তপোশের তলাতেই সরিয়ে ফেলে চোখের চশমাটা খুলছে।
তাঁকে এ সব তুচ্ছ কাজ যে করতে হয়, ঘনাদা তা জানাতে চান না।
গৌরই এখন সর্দার। কী তার প্যাঁচ না জেনে শুধু তার মুখের দিকে দৃষ্টি রেখে সকলে মিলে ভেতরে গিয়ে ঢুকলাম।
ব্যবস্থা সব করে ফেললাম, ঘনাদা! গৌর একেবারে মূর্তিমান উৎসাহ।
আমরাও চোখেমুখে যথাসাধ্য উজ্জ্বলতা ফুটিয়ে তুললাম দেখাদেখি।
হুঁ, করে ফেললে তা হলে! ঘনাদা চশমাটা খাপে ভরতে ভরতে এমনভাবে মন্তব্য করলেন যেন গৌর আর তাঁর মধ্যে এক ড্রয়ার ভর্তি চিঠিপত্র চালাচালি ইতিমধ্যে হয়ে গেছে। কমিটি মিটিং-টিটিং পার হয়ে ব্যাপারটা বিশেষজ্ঞদের অনুমোদন নিয়ে এবার শুধু আইনসভায় পাস হবার অপেক্ষায়।
আমরাই মাঝে থেকে ভ্যাবাচাকা। একবার গৌরের মুখের দিকে তাকাই, আর একবার ঘনাদার দিকে।
সাংকেতিক গৌর-ঘনাদা সংবাদ আরও কিছুক্ষণ এমনই ভাবে চলল।
এ তো আর ফেলে রাখবার জিনিস নয়! গৌর যদি বলে তো ঘনাদা তৎক্ষণায় সায় দিয়ে বলেন, ফেলে রাখলে চলবে কেন! সেরকম পরামর্শ কেউ দিচ্ছে বুঝি?
দিলেই বা শুনছে কে? গৌরের মুখ থেকে খসতে না খসতে ঘনাদা বলেন, না, উচিতই নয়। এ কি একটা ছেলেখেলা!
এর মধ্যে শিবুও আছে তা ভাবতেও পারিনি। সে হঠাৎ বলে উঠল, একটু অসুবিধে অবশ্য হবে।
আমার একেবারে চক্ষুস্থির করে দিয়ে শিশির তাতে চটে উঠে বললে, হোক না অসুবিধে, তাতে আমরা পেছপাও নাকি! কাজের উদ্দেশ্যটা তো ভাবতে হবে।
উদ্দেশ্যটাই তো আসল। কমল হেরি ভ্রান্ত কেন কাঁটাবনে যেতে! না না, কাঁটা হেরি শান্ত কেন কমল, কমল…ওই মানে, যা বলে আর কী! আমার মুখ দিয়েও ফস করে কী ভাবে বেরিয়ে গেল দেখে আমিই অবাক।
মুখে মুখে পাক খেতে খেতে ব্যাপারটা যখন বেশ ঘোরালো ধোঁয়া হয়ে উঠেছে, গৌর তখন একটুখানি আলো ছাড়ল, মাটি অবশ্য অনেকটা ফেলতে হবে।
ঘনাদার চোখদুটো একটু বড় হল কি? ও চোখ দেখে বোঝা কঠিন।
আমরা তখন যা তোক একটা জো পেয়ে গেছি। আর আমাদের পায় কে।
হ্যাঁ, বেশ ভাল মাটি, বললে শিশির।
গঙ্গামাটিই ভাল। শিবু সুপরামর্শ দিলে।
কতই বা আর খরচ! একটা ঠেলা বোঝাই করে আনলেই হবে, আমি ব্যবস্থাটাও করে ফেললাম।
গৌর আরেকটু আলোকপাতের জন্যেই বোধহয় উঠে দাঁড়াল। দাঁড়িয়ে ছাদটার দিকে তাকিয়ে যেন মনে মনে মেপে ফেলে বললে, ছোটখাটো একটা বাগান হবে— যাকে বলে, roof garden আর কী! তবে ফুল-টুল কিছু নয়, স্রেফ তরি-তরকারি। আলু-বেগুন-ঢ্যাঁড়স-ঝিঙে-পটল—পটলই বা নয় কেন?
গৌর ঘনাদার দিকে চেয়ে তাঁকে সমর্থন জানাবার সুযোগ দিলে।
কিন্তু ঘনাদার মুখে কোনও শব্দ নেই। শব্দ যদি বেরোয় তো মেঘের ডাকই শোনা যাবে মনে হয়। কারণ, ঘনাদা ছাড়া আর কারও মুখ হলে আষাঢ়ের মেঘের সঙ্গে তার মিলটা আরও স্পষ্ট বোঝা যেত!
ঘনাদা কিছু বলুন না বলুন, আমাদের থামলে চলে না। আমরা ধরতাই পেয়ে গেছি।
