কী ব্যাপার! ঘুম চোখে যেন সদ্য বিছানা থেকে উঠে এসে হাই তুলে ঘনাদা বললেন, এত রাত্রে দরজায় টোকা কেন?
টোকা শুনেই বোধহয় বাপি দত্ত কাত। পাড়ার লোক যে আওয়াজে ডাকাত পড়ার ভয়ে এতক্ষণে হয়তো লালবাজারে ফোন করেছে তার নাম টোকা!
কিন্তু ভেতরের বারুদ তখনও জ্বলছে। বাপি দত্ত গর্জন করে উঠল, কেন, আপনি জানেন না! কে আমার হাঁস কেটেছে?
আমিই কেটেছি। ঘনাদা নির্বিকার।
আপনিই কেটেছেন তা আমি জানি। নইলে এত বড় আস্পর্ধা কার হবে। কিন্তু কার হুকুমে কোন সাহসে আপনি আমার হাঁস কেটেছেনবাড়ি নিয়ে যাব বলে বাছাই করে কেনা আমার চার চারটে হাঁস!
চারটে তো মোটে! ঘনাদা যেন দুঃখিত।
ওঃ, চারটে হাঁস কিছু নয় আপনার কাছে! বাপি দত্ত আগুন।
কিছুই নয়। এ পর্যন্ত কেটেছি বারোশো বত্রিশটা। আরও কত যে কাটতে হবে কে জানে! ঘনাদা তাঁর খাটের দিকে বিষণ্ণ ভাবে পা বাড়ালেন। আমরাও সঙ্গে সঙ্গে। কিন্তু তখুনি থামতে হল।
যাচ্ছেন কোথায়? বাপি দত্ত হুংকার দিয়ে উঠল, আপনার ওসব গুল আমার কাছে ঝাড়বেন না। ওসব চালাকি আমি সব জানি।
জানো! ঘনাদা যেন অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে ফিরে দাঁড়ালেন। জানো গারুসেরচ কাকে বলে!
কী বললেন! বাপি দত্ত ক্ষিপ্ত।
ঙগারুসেরচঙ্! তুমি নয়, হাঁসের নাম। ঘনাদা আশ্বস্ত করলেন, জানো, তিনশো সেরা শিকারি দুনিয়ার সমস্ত জলা জঙ্গলে এই হাঁস খুঁজে ফিরছে? জানো, একটা হাঁসের জন্য গলায় গলায় যাদের ভাব এমন দু-দুটো রাজ্য এ ওর গলা কাটতে পারে? জানো একটা হাঁসের পেট কেটে এই কলকাতা শহরটা কিনে নিয়েও যা থাকে, তাতে বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা ইজারা নেওয়া যায়!
এই শেষের কথাতেই বাপি দত্ত কাবু। তবু গলাটা চড়া রেখেই শুধোল, কী আছে সে হাঁসের পেটে? হিরে, মানিক?
হিরে মানিক! ঘনাদা অবজ্ঞার হাসি হাসলেন, এই বুদ্ধি না হলে হাঁস শুধু এতকাল খেতেই কেনো!
কী আছে তা হলে? বাপি দত্ত এবার উদগ্রীব।
কী আছে? ঘনাদা জুত করে নিজের খাটের ওপর বসলেন। আমরাও যেখানে যেমন পারলাম বসলাম। শিশির সদ্য খাওয়া থেকে উঠে এসে সিগারেটের কৌটোটা আর সঙ্গে আনতে পারেনি। তার দিকে একটু ভৎসনার দৃষ্টিতে তাকিয়ে ঘনাদা গম্ভীর ভাবে বললেন, আছে একটা নস্যির কৌটো।
নস্যির কৌটো! আমি ভাবছিলাম কলকে বুঝি কিছুর! বাপি দত্তর বিদ্রুপে কিন্তু আর তেজ নেই। খাটের ধারেই সে-ও জায়গা নিয়েছে।
ঘনাদার মুখে তীব্র ভ্রুকুটি দেখা গেল। রাত তো অনেক হয়ে গেল, এখন শুতে গেলে হয় না। তিনি হাই তুললেন।
আমরা সন্ত্রস্ত, বাপি দত্ত নাছোড়বান্দা। নস্যির কৌটো কেন? চার চারটে হাঁসের শোক সে প্রায় ভুলেছে মনে হল।
কেন? উনিশশো পঁয়ত্রিশ সালের জুলাই মাসের সতেরোই তারিখে পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু মালভূমিতে তুষারঝড়ে পথ হারিয়ে মরতে বসেছিলাম বলে, দুনিয়ার সেরা শয়তান ফন ব্লুল সদলবলে নেকড়ের পালের মতো আমার পিছু নিয়েছিল বলে, প্রাণ যায় যাক, মান বাঁচাবার আর কোনও উপায় ছিল না বলে, যোল হাজার দশ ফুট উঁচু গুরলা গিরিদ্বারের তিন মাইল সোজা খাড়াই-এর পথে ভূত দেখেছিলাম বলে, আর বন্দুকের শেষ গুলিতে চাঙ্গু-টাকে মারতে পেরেছিলাম বলে!
বাপি দত্তের মুখের হাঁটা আমাদের সকলের চেয়ে বড়।
কোনওরকমে হাঁ বুজিয়ে সে জিজ্ঞাসা করলে, ভূত! ভূতের নাম চাঙ্গু? সেই ভূত গুলিতে মারলেন!
ভূত নয়, মারলাম চাটাকে। চাঙ্গু হল ও অঞ্চলে নেকড়ে বাঘের নাম। ঘনাদা যেন ক্লান্তভাবে একটু থেমে আবার বললেন, তোমরা তো হাত মুখও ধোওনি দেখছি।
হাত মুখ! বাপি দত্তই সবাই আগে রুমাল বার করে হাত মুখটা চটপট মুছে ফেলে বললে, নেমন্তন্ন খেতে এসেছি মনে করলেই হয়! হ্যাঁ, তারপর শুনি।
তারপর নয়, তার আগে। ঘনাদা শুরু করলেন, কৈলাসটা চক্কর দিয়ে মানস সরোবর আর রাক্ষসতাল হয়ে টাকলাকোটে এসে তখন আটকে গেছি। টাকলাকোট ভারতে আসতে তিব্বতের শেষ গ্রাম। তার পরই বিপুলেখ গিরিদ্বার হয়ে ভারতে নামতে হয়। টাকলাকোটে এসেই শুনলাম বিপুলেখ গিরিদ্বার বরফ পড়ে বন্ধ হয়ে গেছে। পারাপার হওয়া মানুষের অসাধ্য! অসময়ে আসার দরুন এধরনের বিপদ যে হতে পারে তা অবশ্য আগেই জানতাম। মানস সরোবরের যাত্রীদের মরশুম অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে। খাস তিব্বতিরাও এ অসময়ে শীত কাটাবার জন্যে তৈরি হয়ে গাঁ থেকে নড়ে না। টাকলাকোটের মোড়ল জানালে শীতটা আমায় তাদের গাঁয়েই কাটাতে হবে। আপত্তি করলাম না। কাছাকাছি দেখবার শোনবার অনেক কিছুই আছে। দশ বারো মাইলের মধ্যে সিম্বিলিঙ গুম্ফা, খেচরনাথ গুফা তো বটেই, তাছাড়া কিছুদূরে গেলে এ অঞ্চলে এখনও নাকি ডং পাওয়া যেতে পারে। আর ডং যদি না মেলে তো গোয়া কি চো কি না আঁধিয়ান পেলেই বা মন্দ কী?
শিবুর কাশির শব্দে ঘনাদা থামলেন। গৌর বললে, এই সবে একপেট খেয়ে আসছি কিনা। মাথাটা কী রকম ঝিমঝিম করছে!
একটু ভ্রূকুটি করে ঘনাদা বললেন, ও, মাথায় ঢুকছে না বুঝি! আমারই দোষ। তিব্বতের কথা বলতে সেখানকার ভাষাই এসে যায়। গোয়া আর চো হল ছোট আর বড় দু-জাতের তিব্বতি হরিণ আর না আঁধিয়ান হল সেখানকার বুনো ভেড়া।
আর ডং বুঝি গাধা! উংকি থেকে? বাপি দত্ত সোৎসাহে শুধোলে।
আরে না! ডং গাধা হবে কেন? ঘনাদা যেন বিশেষ তাৎপর্যের সঙ্গে বাপি দত্তের দিকে তাকালেন। ডং হল বুনো চমরি গাই। খুব কমই পাওয়া যায় আজকাল।
