ঘনাদা থামলেন।
তা হলে মানে বুঝতে না পেরেই এতদিনে সে সুতোটা আপনার কাছে পাঠিয়েছিল! কিন্তু দুবছর বাদেই পাঠাবে কথা ছিল না? শিশির সাগ্রহে জিজ্ঞাসা করলে।
হ্যাঁ, কথা তা-ই ছিল। কিন্তু আমার ঠিকানা তো পাওয়া চাই। ঘনাদা শিশিরের নির্বুদ্ধিতায় যেন একটু বিরক্ত, কত মুল্লুক ঘুরে তবে ঠিকানা পেয়েছে কে জানে! দেরি হয়েছে তাইতেই।
কিন্তু সুতো সমেত চিঠিটাই যে এখন লোপাট। তাহলে উপায়? শিবু প্রায় আর্তনাদ করে উঠল, ও-কিপুর মানেও তাহলে আর জানা যাবে না, গুপ্তধনও উদ্ধার হবে না।!
গুপ্তধন অনেক আগেই উদ্ধার হয়েছে! ঘনাদা আমাদের প্রতি একটু অনুকম্পার হাসি হেসে বললেন, আমি কি দুবছরের পরেও ঘুমিয়ে ছিলাম! পেরুর লিমা শহরে প্লাজা দস দে মেয়োর কাছে সরকারি মিউজিয়ামে গেলেই দেখতে পাবে, কিপু-তে যার সংকেত দেওয়া ছিল সে সমস্ত দুর্লভ সোনার জিনিস একটি আলাদা ঘরে সাজানো।
তার মানে? গৌর হতভম্ব হয়ে বললে, আপনি কিপ পড়তে পারেন। সেই রাতেই তার মানে বুঝে নিয়ে আপনি মুখস্থ করে ফেলেছিলেন।
ঘনাদা এ প্রশ্নের উত্তর দিতেই যেন ঘৃণা বোধ করে শিশিরের পুরো সিগারেটের টিনটা তুলে নিয়ে পকেটে ফেললেন।
নীচে নেমে শিশিরকে না জিজ্ঞেস করে পারলাম না, আচ্ছা, ইনসিওর করা চিঠিটা কি আমাদের বানানো, না সত্যি এসেছিল?
শিশির চিন্তিত মুখে বলল, তা-ই তো ভাবছি।
হাঁস
গৌর শিশির শিবুনয়, এ একেবারে বুনো বাপি দত্ত। যেমন গোঁয়ার তেমনই ষণ্ডা।
এহেন লোককে মেসে নতুন জায়গা দিয়ে কী ভুলই হয়েছে সেদিন রাত্রে হাড়ে-হাড়ে বুঝে আমরা সবাই ইষ্টদেবতা স্মরণ করতে লাগলাম।
কুরুক্ষেত্রের বুঝি আর বাকি নেই। বিরাট-পর্ব শুরু হয়ে গেছে। এথম বোমা ফেটেছে।
বোমাটা ফাটল রাত্রের খাওয়া-দাওয়ার পর।
খাওয়া-দাওয়াটা বেশ ভালই হয়েছিল। মফস্বলে যাদের বাড়ি তাদের কল্যাণে শুক্রবার রাত্রের খাওয়াটা আজকাল এই রকমই হয়। শুক্রবারের পর শনিবার হাফ । হলিডেতে তাঁরা সকাল সকাল বাড়ি যান আর ফেরেন সেই সোমবার সকালে। রবিবারের খ্যাঁটটার অভাব শুক্রবারের রাত্রের ভোজ দিয়েই তাঁরা তাই উশুল করে নেন।
মফস্বলীদের মধ্যে বাপি দত্ত একজন। সাঁটিয়েদের ভেতরও।
তিনবারের জায়গায় চারবার চেয়ে খেয়ে যেভাবে সে পাত চাটছিল ঘনাদা দেখলে বোধহয় ঈর্ষান্বিত হতেন। তাঁদের খাওয়ার রেষারেষির পাল্লায় ঠাকুর চাকরের জন্য কিছু থাকত কিনা সন্দেহ। কী ভাগ্যি ঘনাদা আজ শরীর খারাপ বলেনা, না-খেয়ে নয়—আগেই খেয়ে দেয়ে তাঁর ঘরে চলে গেছেন।
পেতলের থালাটা মাজবার দায় থেকে লছমনিয়াকে প্রায় নিষ্কৃতি দিয়ে নিজের হাত চুষতে চুষতে বাপি দত্ত বললে, বাঃ চমৎকার!
তা মাংসটা সত্যিই অপূর্ব রান্না হয়েছিল।
আঙুল চোষা শেষ করে ঝকঝকে থালাটার দিকে একবার যেন করুণ ভাবে চেয়ে বাপি দত্ত বললে, কেমন, আমি বলি কিনা যে মাংস খেতে হয়তো হাঁসের। ও মুরগি বলো আর পায়রা বলল হাঁসের কাছে কিছু না! যদি জাত বিগড়ি হাঁস হয়।
কেন, উটপাখি হলে মন্দ কী! শিব একটু ফোড়ন কাটল।
উটপাখি! উটপাখি আবার খায় নাকি? বাপি দত্তর বুদ্ধিটা চেহারার-ই মাপসই।
খেলে দোষ কী! একটাতে তোমারও কুলিয়ে যায়। অন্যদের জন্যেও মাংসের হাঁড়িতে টান পড়ে না। শিবু উৎসাহ দিলে।
একটু যেন দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে বাপি দত্ত বললে, না না, উটপাখি খাওয়াই যায় না, আর তাছাড়া হাঁসের তুলনা নেই—আসল বিগড়ি হাঁস। হাঁস আবার চেনা চাই।
কথাটা বলেই বাপি দত্তর কী যেন মনে পড়ে গেল। ঠাকুরকে ডেকে জিজ্ঞাসা করলে, আজ হাঁস কিনে আনল কে, ঠাকুর?
ঠাকুর আমাদের ভালমন্দ বাজার করে। সে কিন্তু সামনে এলেও নীরবেই দাঁড়িয়ে রইল।
কই, কে কিনে এনেছে বললে না, তুমি? আজ্ঞে না, বাবু!
সে আমি জানতাম! বাপি দত্ত গর্বের হাসি হাসল। এ হাঁস চিনে আনা তোমার কর্ম নয়। কিন্তু কিনে আনল কে?
আজ্ঞে, কিনে আমরা কেউ আনিনি।
তোমরা কেউ আনননি! তাহলে বিগড়ি হাঁস কি নিজে থেকে উড়ে এসে তোমাদের হাঁড়িতে ঢুকল নাকি! ন্যাকামি কোরো না। বলো!
আজ্ঞে, আপনিই কিনে এনেছেন! ঠাকুরকে সভয়ে বলতেই হল।
আমি কিনে এনেছি! খানিকক্ষণ বাপি দত্তর মুখ দিয়ে আর কথা সরল না। তারপর আমরা টের পেলাম, পলতেয় আগুন লেগেছে। আমি মানেকাল বাড়িতে নিয়ে যাব বলে আমি যে কটা হাঁস কিনে রেখেছি, তা-ই কেটে রান্না হয়েছে! তাই তোমরা সবাই মিলে ফুর্তি করে খেয়েছ আর আমায় খাইয়েছ!
ঘরে কী বলে—আধুনিক কবিতার মতো—শিশির পড়লে শোনা যায়।
এইবার বোমা ফাটল।
কে? কে আমার হাঁস কেটেছে? কার এই শয়তানি আমি শুনতে চাই।
আমাদের চোখ যার যার থালার ওপর। কিন্তু উত্তর না দিলে ঠাকুরের নিস্তার নেই।
আজ্ঞে, বড়বাবু কেটেছেন।
বড়বাবু! বড়বাবু! বড়বাবু মানে তোমাদের সেই শুটকো মর্কট গেজেল চালিয়াৎ ঘনাদা!
হে ধরণী দ্বিধা হও—আমরা তখন ভাবছি।
কিন্তু ভাববার সময়ও পাওয়া গেল না।
সকড়ি হাতে এঁটো মুখ না ধুয়েই বাপি দত্ত তখন সিঁড়ি দিয়ে রওনা হয়েছে ওপরে! আমাদের ছুটতে হল পেছনে।
আরে শোনো! শোনো, দত্ত।
কে কার কথা শোনে।
ছাদ পর্যন্ত পৌঁছোবার আগেই শুনতে পেলাম ঘনাদার ঘরের দরজা সারা পাড়াকে সজাগ করে সশব্দে আর্তনাদ করছে। বর্মা নয়, সি-পির সামান্য সেগুন কাঠ। তার আর কতটুকু জান!
বাপি দত্তকে এখন সামলানো বুনো মোষের মওড়া নেওয়ার চেয়েও শক্ত। তবু মরিয়া হয়ে তাকে ধরতে যাব এমন সময় দরজা ভেতর থেকেই খুলে গেল।
