জানলার কাছে ছুটে আসার সময়ই অবশ্য ব্যাপারটার আভাস পাওয়া উচিত ছিল।
ছুটতে গিয়ে আধা-ভাসমান অবস্থাতেই সবেগে জানলাটার কাছে পৌঁছেছি। দুহাত বাড়িয়ে দেয়ালে না ভর দিলে মাথাটাই ঠুকে যেত!
উত্তেজনা ও উদ্বেগে ব্যাপারটা তখন তেমন গ্রাহ্যের মধ্যে আনিনি।
এখন জানলা দিয়ে বাইরের দৃশ্যের সঙ্গে অন্য সব কিছু মিলিয়ে হতাশ হয়ে বুঝলাম, যেখানে ছিলাম থরের সেই মরুতে তো নয়ই, পৃথিবীরই কোথাও নামবার আর উপায় নেই।
পৃথিবীকে বহুদূরে পেছনে ফেলে আমরা মহাশূন্যে ভেসে চলেছি।
ওই উন্মাদ লোকটা যা বলেছে—পৃথিবী ক্রমশ প্রতি মুহূর্তে সেই বিশ হাজার কিলোমিটারের থেকেও দূরে সরে যাচ্ছে।
বিস্ময়ে যেমন হতভম্ব, নিজেদের নিরুপায় অবস্থায় তেমনই হতাশ হয়ে উন্মাদ চেহারার লোকটার দিকে এবার ফিরেছি।
লোকটা তখন আমাদের অবস্থা দেখে মিট মিট করে হাসছে।
চেহারা যার উন্মাদের মতো, লোকটা সত্যি কি তাই?
উন্মাদ হলে এমনই অবিশ্বাস্য আশ্চর্য একটা ব্যাপার সে কি সম্ভব করে তুলতে পারে?
পরে বুঝেছি যে উন্মাদ বলেই সে তা পেরেছে।
নাম অ্যালজার লুটভিক। পৃথিবীর কোনও দেশের বৈজ্ঞানিকদের তালিকায় তার নাম পাবে না।
তবে কোথা থেকে তার উদয় হল? লুটভিক কি ভুঁইফোড়?
না, নানা দেশে নানা নামে বহুকাল ধরে সে তার গবেষণা চালিয়ে এসেছে। তার আসল কাজ আর উদ্দেশ্য কাউকে বুঝতে না দেবার জন্যই এই চালাকি।
সব গবেষণা শেষ করার পর তার অবিশ্বাস্য পরীক্ষা চালাবার সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা হিসেবে বেছে নিয়েছে থরের এই মরুভূমি।
মরুভূমিই তার দরকার ছিল। কারণ পৃথিবীর সব জায়গায় বিঘ্ন হবার ভয় অনেক বেশি। সাহারায় তখনও ফরাসিদের দাপট। তারা নিজেরাই সেখানে পারমাণবিক পরীক্ষা-টরিক্ষা চালাচ্ছে। সুতরাং সেখানে নিশ্চিন্তে নিরিবিলিতে কাজ করা যাবে না।
টাকলা মাকানেও তাই। সেখানে চিনের নজর এড়িয়ে কিছু করা সম্ভব নয়। সবচেয়ে ভাল মনে হয়েছে থরের মরুর এই অঞ্চলটা। একদিকে ভারত, একদিকে পাকিস্তান। মাঝখানে খানিকটা প্রায় বেওয়ারিশ নো-ম্যানস-ল্যান্ড। একেবারে নিষ্ফলা ধু-ধু মরু বলে কারওর জায়গা নিয়ে মাথাব্যথা নেই।
লুটভিক তাই নিঝাটে এখানে তার আস্তানা গেড়েছে। সরকারের তরফ থেকে সামান্য খোঁজখবর যা হয়েছে তার মুখ চাপা দিয়েছে জ্যোতির্বিদ্যার মানমন্দির বসাবার জায়গা খোঁজার অজুহাত দিয়ে। অবিশ্বাসের কিছু নেই। মহাশূন্যের দুরবিন বসাবার মানমন্দিরের জন্য নির্মেঘ শুকনো এমনই মরু-অঞ্চলই সত্যি লাগে।
লুটভিক বড়াই করে নিজেই নিজের এসব কীর্তি শুনিয়েছে।
এ বিবরণে তার ধূর্ত বুদ্ধির পরিচয় থাকলেও সে যে অমানুষিক অপ্রকৃতিস্থ কিছু, এমন কোনও আভাস পাওয়া যায়নি।
সুরঞ্জনের পরের প্রশ্নের জবাবেই লুটভিক-এর সেই ভয়ংকর রূপটা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
লুটভিক-এর বাহাদুরির ইতিহাস শুনতে শুনতে সুরঞ্জন স্বাভাবিক কৌতূহলেই জিজ্ঞাসা করেছে, বুঝলাম, আপনি মস্ত একজন বৈজ্ঞানিক, যা এখানে গড়ে তুলেছেন তা আশ্চর্য এক মহাকাশযান। কিন্তু এতে আমাদের সওয়ারি নেবার আপনার কী দরকার ছিল?
কী দরকার ছিল? লুটভিক-এর সেই শয়তানি হাসি আবার তখন শুরু হয়েছে—ল্যাবরেটরিতে গিনিপিগ কি সাদা ইঁদুরের কী দরকার থাকে? ইচ্ছে করলে জন্তু-জানোয়ারও নিতে পারতাম, কিন্তু তার চেয়ে মানুষই ভাল মনে হল।
আমাদের আপনি আপনার বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় গিনিপিগের মতো ব্যবহার করবার জন্য সঙ্গে নিয়েছেন? আমাদের সকলের স্তম্ভিত প্রশ্নটাই সুরঞ্জনের মুখ দিয়ে বার হল। কী করবেন আমাদের দিয়ে?
যা-ই করি না, লুটভিক আমাদের যেন লোভ দেখিয়ে আশ্বাস দিলে, খাওয়া-দাওয়া থেকে আরামে থাকার ব্যবস্থার কোনও ত্রুটি হবে না। উপরি হিসেবে এই আশ্চর্য শূন্য প্রয়াণ তো আছেই। মিছে বাজে ভাবনা ভেবে তো লাভ নেই। বিজ্ঞানের জন্যই নিজেদের উৎসর্গ করছ জেনে এখন খাওয়া-দাওয়া বিশ্রাম করো। এখানে সবরকম ব্যবস্থা আছে। ইচ্ছে করলে ওই জানলা দিয়ে মহাকাশের গ্রহ-নক্ষত্রের শোভাও দেখতে পারো।
শেষ একটা নিষ্ঠুর শয়তানি হাসি হেসে লুটভিক আমাদের কামরার দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে যখন চলে গেল তখন আমরা সবাই বোবা হয়ে গেছি। ভয়ে ভাবনায় হতবুদ্ধি হয়ে আমাদের জিভগুলোও তখন আড়ষ্ট।
০৮. লুটভিক যা বলে গেছে
লুটভিক যা বলে গেছে তা মিথ্যে নয়। শূন্যযানের যে অংশটায় ছোটখাটো একটা হল-এর মতো কামরায় আমরা আছি, খাবার-দাবার থেকে সাধারণ দরকারি কোনও জিনিসের সেখানে অভাব নেই। নীচে প্রথম ঢোকার সেই অপ্রত্যাশিত অভিজ্ঞতার পর লুটভিক নিজে আমাদের এ কামরায় নিয়ে এসেছে। উঠে এসে কামরায় জায়গা পাবার পর লুটভিক-এর শূন্যযানটা যে নেহাত ছোটখাটো নয় তা বুঝতে পেরেছি।
এত বিরাট একটা শূন্যযান কীসের শক্তিতে মহাকাশে পাড়ি দিচ্ছে তা অবশ্য বুঝতে পারিনি। সামান্য একটা রকেটকে পৃথিবী ছাড়িয়ে পাঠাবার আর ফেরত আনবারই কত ঝামেলা। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল পার হয়ে আসাযাওয়া করতেই তো তার শুধু হাওয়ার ঘর্ষণেই পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়ার বিপদ। কত কাণ্ড করে সে বিপদ সামলাতে হয়!
আর এ শূন্যযান পৃথিবী ছাড়িয়ে মহাকাশে যে চলে এল, মাধ্যাকর্ষণের অভাবে ক্রমশ পালকের মতো হালকা হয়ে যাওয়া ছাড়া আর কোনও অসুবিধাই তো টের পেলাম না!
