হঠাৎ গহুরটা আলোয় আলো হয়ে গিয়েছে। আর তারই মধ্যে ওপর থেকে নেমে আসা একটা লোহার হেলানো সিঁড়িতে একটু অদ্ভুত মূর্তিকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে।
মূর্তিটি যদি অদ্ভুত হয় তার প্রথম সম্ভাষণটা তার চেয়েও বেশি।
শীর্ণ হাড়-বেরুনো মুখে একটা শয়তানি হাসি নিয়ে সে বলছে, তোমাদের জন্যই অপেক্ষা করছি।
বলে কি মানুষটা! আমরা তো সবাই তাজ্জব!
সব কিছুই যে আজগুবি সৃষ্টিছাড়া ব্যাপার হয়ে যাচ্ছে।
ধু ধু মরুভূমির মাঝখানে একেশ্বর এক বিরাট বালির ঢিবি।
সে বালির ঢিবির মাথায় এমন আলো যে মরুর ঝড়ের ভেতরও দূরদূরান্ত থেকে দেখা যায়।
বালির ঢিবি আবার ফোঁপরা। তার ভেতর ঢোকবার পর তা যেন বিরাট অন্ধকার এক খাঁচা হয়ে ওঠে। যেখান দিয়ে তাতে ঢুকেছি সেখানে একটা ঝাঁপ পড়েই যেন বন্ধ হয়ে যায়, আর খাঁচার মতো গহ্বরটা হঠাৎ কাঁপতে শুরু করার সঙ্গে সঙ্গে আলোয় আলো হয়ে কোথা থেকে এক অদ্ভুত মূর্তি এসে দেখা দিয়ে বলে কিনা—তোমাদের জন্যে অপেক্ষা করছি!
মানুষটা কি পাগল নাকি?
তা না হলে কী মানে ওই অদ্ভুত কথার?
যে বলেছে সে লোকটাই বা কে? আমাদের জন্যই বা অপেক্ষা করছে কেন?
এসব প্রশ্নের উত্তর অবশ্য শেষ পর্যন্ত মিলেছে, কিন্তু যখন তা পেলাম তখন এমন এক সৃষ্টিছাড়া ব্যাপারের নিরুপায় ভাগীদার হয়েছি যে নিয়তি বলে তাকে মেনে নেওয়া ছাড়া আমাদের আর করবার কিছু নেই।
০৭. কী বা করবার থাকতে পারে
কী বা করবার থাকতে পারে চিরকালের চেনা-জানা দুনিয়ার সঙ্গে একেবারে সব সম্পর্ক চুকিয়ে দু-চার হাজার নয়, অমন দু-চার কোটি কিলোমিটার ভেসে ভেসেই ছাড়িয়ে যেতে যেতে!
হ্যাঁ, ক-দিন বাদে তা-ই তখন আমাদের অবস্থা।
অনেক কিছুই তার মধ্যেই জানতে পেরেছি।
জেনেছি যে ফোঁপরা ঢিবির খাঁচায় বন্দী হবার পর অদ্ভুত যে মানুষটার প্রথম দেখা পেয়েছিলাম, মিথ্যা সে কিছু বলেনি।
সত্যিই আমাদের অপেক্ষাতেই সে ছিল। আমাদের মানে, একেবারে নাম ধরে সুরঞ্জন, ঘনশ্যাম, বটুকেশ্বরের নয়, মানুষ হিসেবে যে-কেউ আসে।
কিন্তু কেন? কী তার মতলব? কে সে?
তাও জেনেছি। সে নিজেই বড়াই করে সব শুনিয়েছে, কিন্তু আমাদের জানপ্রাণের চাবিকাঠি যে তার হাতে সে কথাটা ভাল করে বোেঝবার আগে নয়।
ঢিবির ফোঁপরা গহ্বরটা তখন বেশ বিশ্রীভাবে কাঁপতে শুরু করেছে। যেখান দিয়ে ঢুকেছিলাম সেখানকার ফাঁকটা ঝাঁপের মতো একটা কিছু পড়ে তখন বন্ধ।
এ সব থেকে তখন বুঝতে পারছিলাম যে বাইরে যেটার বালির ঢিবির মতো চেহারা, আসলে সেটা কোনওরকম একটা ধাতুর তৈরি বিরাট আশ্রয় গোছের।
মরুভূমির মাঝখানে এরকম একটা আস্তানা বানাবার কী উদ্দেশ্য তা অবশ্য তখন ধরতে পারিনি। মরু সম্পর্কে কোনওরকম বৈজ্ঞানিক গবেষণাই উদ্দেশ্য বলে মনে হয়েছে।
খাঁচার মতো আস্তানাটার ঝাঁপ বন্ধ হয়ে সেটা অমন বিশ্রীভাবে কাঁপতে শুরু করায় বেশ একটু অস্বস্তি বোধ হয়েছে।
আমার চেয়ে সুরঞ্জনেরই বেশি। লোহার সিঁড়িতে দাঁড়ানো অদ্ভুত মূর্তিটাকে তাই সে প্রথমেই প্রশ্ন করেছে, আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন কেন? কে আপনি?
আমি, শুটকো লোকটা অদ্ভুত ভাবে হেসে বলেছে, আমাকে সারেং বলতে পারো, আর তোমাদের জন্য অপেক্ষা করছি সওয়ারি দরকার বলে।
সারেং, সওয়ারি—-লোকটা এসব বলছে কী? লোকটার চেহারায় চোখের দৃষ্টিতে একটা পাগলাটে ছাপ কিন্তু আছে।
একটু কড়া গলাতেই তাই জিজ্ঞাসা করেছি, কীসের সারেং তুমি? আমাদের সওয়ারি বলছ কেন?
কেন বলছি, দেখবে?
এবার সত্যিই পাগলের হাসি হেসে উঠেছে লোকটা। তারপর লোহার সিঁড়িটা দিয়ে একটু ওপরে উঠে—কোথায় একটা বোম টেপার সঙ্গে সঙ্গে অবাক হয়ে দেখেছি আমাদের খাঁচার মতো আশ্ৰয়টার একটা দিকের গোল দেওয়াল আপনা থেকেই সরে গিয়ে বিরাট একটা জানলা গোছের বেরিয়ে পড়ছে।
কিন্তু জানলার বাইরে ও কী দেখা যাচ্ছে?
আকাশ তো পরিষ্কার। ঝলমল করছে তার মধ্যে তারাগুলো! বালির ঝড় তা হলে থেমে গেছে? ঝড়ে আকাশটার এক রকম ঝাড়পোঁছ হয়ে গেছে বলেই বোধহয় তারাগুলো অত বেশি উজ্জ্বল মনে হচ্ছে।
কিন্তু তারাগুলো মিটমিট করছে না কেন?
ব্যাপারটা চোখে পড়লেও তার সঠিক তাৎপর্যটা তখনও বুঝিনি।
বুঝতে অবশ্য দেরি হল না। যার মধ্যে আছি সেই রহস্যময় আশ্রয়টার অদ্ভুত কাঁপুনি তখন আশ্চর্যভাবে থেমে গেছে। কিন্তু সব কিছু ব্যাপার মিলে আমাদের অস্বস্তি আর উদ্বেগ দিয়েছে বাড়িয়ে।
সুরঞ্জন তাই তার মনের কথাটা জোর গলাতেই জানিয়ে দিলে। বললে, সওয়ারি-টওয়ারি আমরা হতে চাই না। আকাশ দেখে তো বুঝছি বাইরের ঝড় থেমে গেছে। দরজা খুলিয়ে দিন, আমরা বেরিয়ে যাব।
বেরিয়ে যাবে? লোকটার আবার সেই শয়তানি হাসি, বেশ, যাও। তবে একটু লাফ দিতে হবে। পারবে?
লাফ দিতে হবে। এবার আমিই সন্দিগ্ধ হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, কেন?
তা না হলে নামবে কী করে? বাচ্চাদের সঙ্গে যেন তামাশা করার ধরনে লোকটা বললে, বেশি কিছু নয়! এখন হাজার বিশ কিলোমিটার লাফ দিলেই চলবে।
বিশ হাজার কিলোমিটার!
শুধু সন্দিগ্ধ আর নয়। রীতিমত ভীত হয়েই জানলাটার দিকে ছুটে গেলাম। খোলা বলে যা মনে হচ্ছিল সে জানলা দেখলাম বন্ধ, তবে কাঁচের চেয়ে স্বচ্ছ এমন কিছু জিনিস, যা হাতে না ছুঁলে কাছে থেকেও বোঝা যায় না।
তারাগুলোকে ঝিকমিক করতে না দেখে ক্ষীণ যে সন্দেহটুকু মনে জেগেছিল আর নেহাত আজগুবি ভেবে যে ধারণাকে আমল দিইনি, স্তম্ভিত হয়ে বুঝলাম তা-ই সম্পূর্ণ সত্য।
