কিন্তু তার ফল যা হল, তাতেই তাঁর হৃৎস্পন্দন বন্ধ হবার উপক্রম।
৩.
গল্প বলতে বলতে চুপ করে গেলেন ঘনাদা। কী হল? কেন আর তিনি মুখ। খুলছেন না? কেন যে খুলছেন না, শেষ পর্যন্ত শিশিরই সেটা বুঝতে পেরে এগিয়ে দিল তার সিগারেটের টিন। ঘনাদা তার থেকে একটা সিগারেট ধরিয়ে, একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে ফের শুরু করলেন তাঁর গল্প।
যেমন তাঁর নিয়ম, তেমনই সেদিন সকালের খাওয়া-দাওয়ার পর ড. লক তাঁর টেপরেকর্ডারটা নিয়ে তাঁর অভিযানের আগের দিনের বিবরণ রেকর্ড করবার ব্যবস্থা করছিলেন।
কিন্তু যন্ত্রটা দেখেই তো তাঁর চক্ষুস্থির।
তাঁর আগে কেউ যে সেটা ব্যবহার করেছে, তার স্পষ্ট চিহ্ন সেখানে রয়েছে।
সেটা নিয়ে যে নাড়াচাড়া করা হয়েছে তা লুকোবার কোনও চেষ্টাই করা হয়নি। যেখানে যন্ত্রটা থাকে, তার বদলে টেবিলের অন্য একধারে অগোছালো কাগজপত্রের মধ্যে এমনভাবে সেটা ফেলে রাখা হয়েছে, যাতে ওখানে যে অন্য কারও হাত পড়েছে, তা বুঝতে কোনও কষ্ট না হয়।
এরপর যন্ত্রটা চালাতে যা শোনা গেল, তাতে ভাবনায়, আতঙ্কে হাত-পা ঠাণ্ডা হবার জোগাড়। স্পষ্ট জার্মান ভাষায় সেখান থেকে তখন শোনা যাচ্ছে, আমি তোমার সঙ্গে আছি, ড. লক। আর লক, তোমার আসল নাম যে স্কুল, তা আমার জানা।
টেপরেকর্ডারের কথা ওইটুকুতেই শেষ হয়েছে। কিন্তু যেটুকু ওখানে আছে তাই শুনেই ড. লক তখন চোখে অন্ধকার দেখছেন বলা চলে। প্রথমত, নিজের ঠিক মতো হুঁশ আছে কি না সে বিষয়ে তাঁর সন্দেহ হচ্ছিল। সত্যিই, নেহাত স্বপ্নে ছাড়া এরকম ব্যাপার ঘটা কি সম্ভব? মনের সংশয় কাটাবার জন্য টেপরেকর্ডারটা একবারের জায়গায় ড. লক বারবার, অন্তত দশবার, চালিয়ে দেখলেন।
না, তাঁর মনের ভুল নয়। সত্যিই কে একজন স্পষ্ট চলিত জার্মান ভাষায় ওই ক-টা কথা সেখানে রেকর্ড করিয়ে রেখেছে।
কিন্তু কার দ্বারা, কেমন করে তা সম্ভব? এ কাজ যে করেছে, তার তো এই অভিযানের সঙ্গেই থাকা দরকার। যে দুর্গম অজানা সব অঞ্চলের ভিতর দিয়ে চিংড়ি তাঁদের নিয়ে যাচ্ছে, সেখানে কারওর পক্ষে অজান্তে তাঁর দলের রাস্তা ধরেই লুকিয়ে সঙ্গে থাকা প্রায় অসম্ভব।
আর তা-ও যদি সম্ভব হয়, তা হলেও তাঁবুর ভেতর কখন কীভাবে ঢুকে সে এ কাজ করবে? তাঁবুর মধ্যে তিনি নিজে অধিকাংশ সময় থাকেনই। আর তা ছাড়া লোধা-গোধা দুজনেই সারাক্ষণ থাকে কড়া পাহারায়। চিংড়ির কথা ধরবারই নয়। তবু অকেও বাদ না দিয়ে ড. লক লোধা-গোধার সঙ্গে তাকে ডেকে অত্যন্ত কড়া ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করলেন।
লোধা-গোধা দুজনেই তো ড. লকের জেরা শুনে একেবারে হতভম্ব। এই সফরে তাদের সঙ্গে লুকিয়ে আসা কেমন করে সম্ভব?
আর যদিও লুকিয়ে-চুরিয়ে কেউ তাদের কাছাকাছি আসতে পেরে থাকে, এ তাঁবুর ভিতরে ঢুকে সাহেবের যন্ত্রপাতি ছোঁবার সময় সুযোগ সে পাবে কী করে?
লোধা-গোধার কাছে এর চেয়ে এ রহস্যের হদিস পাবার মতো উত্তর ড. লক আশা করেননি। তবু তাদের তিনি হয়রান করে মেরেছেন। সম্ভব-অসম্ভব হাজার রকম প্রশ্ন করে শেষ পর্যন্ত হতাশ হয়েই বিদায় দিতে হয়েছে তাদের।
লোধা-গোধার পর এ ব্যাপারে হদিস পেতে জংলি চিংড়িকে ডাকার কোনও মানে হয় না।
তবু কোনও দিকে ত্রুটি রাখবেন না বলে ড. লক লোধা-গোধাকে দিয়ে তাকেও ডাকিয়ে পাঠিয়ে তাদের দিয়ে চিংড়ির ভাষা কানুড়িতে তাকে জেরার ব্যবস্থা করেছেন। সে-জেরায় প্রথম প্রশ্নের উত্তরে চিংড়ির কথা শুনে কিন্তু তিনি থ। লকের হুকুমে লোধা-গোধা চিংড়িকে কানুড়িতে জিজ্ঞেস করেছিল, সে এ তাঁবুতে কাজ। করবার সময় আর কাউকে কখনও দেখেছে কি না।
চিংড়ি তাতে যা উত্তর দিয়েছে তা শুনে একেবারে থ হয়ে লোধা-গোধা সেটা অনুবাদ করে লক সাহেবকে বুঝিয়ে দিতেই গেছে ভুলে।
লক তাদের হতভম্ব ভাব দেখে ধমক দিয়ে ওঠার পর তারা থতমত খেয়ে চিংড়ি যা বলেছে তা জানিয়েছে।
চিংড়ি যা জানিয়েছে তাতে তাদের হতভম্ব হবারই কথা অবশ্য। চিংড়ি বলেছে, সে নাকি তাঁবুতে রোজই আর-একজনকে দ্যাখে।
রোজই আর-একজনকে দ্যাখে? কখন? লক লোধা-গোধাকে দিয়ে জিজ্ঞেস করিয়েছেন।
কখন আবার? চিংড়ি জানিয়েছে, যতক্ষণ সে এ তাঁবুতে থাকে, সারাক্ষণই।
সারাক্ষণই? লোধা-গোধার মারফত কথাটা শুনে কী মনে করবেন ভেবে না পেয়ে লক রাগে দাঁত খিঁচিয়ে জিজ্ঞেস করেছেন, কোথায়? এ তাঁবুর কোথায়, কোনখানে?
লোধা-গোধার কাছে প্রশ্নটা শুনে নির্বিকারভাবে চিংড়ি যা দেখিয়ে দিয়েছে, তাতে হাসবেন, না জ্বলে উঠবেন ড. লক তা ঠিক করতে পারেননি।
চিংড়ি যা দেখিয়ে দিয়েছে সেটা তাঁবুর এক ধারে লকের চুল আঁচড়ানো, দাড়ি কামানোর সরঞ্জাম রাখার জন্য টেবিলের ওপর ঝোলানো একটা আয়না।
জংলিটাকে তখনকার মতো হাসতে হাসতে তাঁবু থেকে দূর করে দিলেও ব্যাপারটা নিয়ে লকের দুর্ভাবনা ক্রমশ চরমে উঠেছে।
চিংড়ির দেখিয়ে দেওয়া পথ ধরে তখন তাঁরা তাঁদের লক্ষ্যে প্রায় পৌঁছে গেছেন।
কাঁটাঝোপের আধা-মরু পাথুরে ডাঙা পার হয়ে যেতে যেতে মাঝে মাঝে ছোটখাটো হ্রদ আর শুকনো গভীর খাদ তাঁদের পথে পড়েছে। দূরে একটা আকাশ-ছোঁয়া যে পাহাড়ের চূড়া তাঁদের চোখে পড়েছে, সেটা ক্যামেরুন আগ্নেয়গিরি ছাড়া আর কিছু নয় বলে বুঝেছেন লক।
কিন্তু এই সময়ে এমন কিছু হয়েছে যাতে তাঁর মাথা ঠাণ্ডা রাখাই শক্ত হয়ে পড়েছে। ব্যাপার যা ঘটেছে তা লকের টেপরেকর্ডারটা সম্পর্কেই।
