বুঝবে না কী রকম? ড. লককে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করতে হয়, ও কি বান্টু জানে না?
এক বর্ণও না, লোধা-গোধা জানায়, বান্টু কেন, ওর নিজের ভাষা কানুড়ি ছাড়া হাউসা, ফুলানি, ফাং—কিছুই জানে না।
ঠিক, ঠিক, ড. লক খুশি-মুখে এবার বলেন, নিজের ভাষা ছাড়া আর কিছু জানে।
না, এমন লোকই আমাদের সবচেয়ে দরকার। আজই ওকে কাজে নাও।
তাই নেওয়া হল সেই দিনই। কাজে নেবার সময় নামটা নিয়ে শুধু একটু গোল বেধেছিল।
খাতায় লেখার জন্য তো বটেই, তাকে ডাকবার জন্যও একটা নাম তো দরকার। কিন্তু নিজের কোনও নামই সে বলতে পারে না। সে যেখানে থাকে সেখানে গোনাগুনতি ক-টা তার মতো জংলির মধ্যে ডাকাডাকির কোনও দরকারই নাকি হয় না। হলেও তারা এই ওই বলে ডেকেই তাদের কাজ সারে।
কিন্তু সেখানকার নিয়ম এখানে চলে না। নাম তো একটা দরকার। শেষে জংলিটা নিজেই বললে, এই কামর্দে মানে চিংড়ি নদীর মোহনাতেই যখন সে প্রথম কাজ পেয়েছে তখন তার নাম চিংড়িই রাখা হোক।
ড. লক খুশি হয়ে বলেছেন, ঠিক ঠিক। ওর যা চিমসে কুচোচিংড়ির মতো চেহারা, তাতে ওই নামই ওর ভাল।মানুষটা জংলি হলেও তার মাথাটা একেবারে নিরেট নয় দেখেও তিনি খুশি হয়েছেন।
চিংড়িটাকে প্রথমে তার কাজ বুঝিয়ে দেওয়া একটু শক্ত হয়েছে। বুদ্ধিশুদ্ধি নিরেট হলেও লোকটা একেবারে জংলি। সাহেবসুবো তো দূরের কথা, সাধারণ একটু ভাল অবস্থার গৃহস্থ বান্টু কি হাউসাদের ঘরদোরের খবরও জানে না।
ড. লকের তাঁবুতে বেশি কিছু দামি ও বিদেশি আসবাব না থাকলেও, তাঁর কাজের জন্য যা দরকার সেরকম কিছু যন্ত্রপাতি, সাজসরঞ্জাম ছিল। তাঁর তাঁবু ঝাড়পোঁছ করবার সময় ড. লক সেগুলো সম্বন্ধে তাকে হুঁশিয়ার হওয়ার নির্দেশ দিতে বলেছিলেন তাঁর খাস-পাহারাদার লোধা আর গোধাকে। তাই দিতে গিয়ে প্রায় কেলেঙ্কারি হওয়ার উপক্রম হয়েছিল।
জরিপ-টরিপের জন্য দরকারি যন্ত্রপাতি ছাড়া ড. লক তাঁর কাজের সুবিধের জন্য একটা টেপরেকর্ডার তাঁর সঙ্গে রেখেছিলেন। তিনি যে-ধরনের অভিযানে এসেছেন, তার প্রাত্যহিক বিবরণ রাখা একান্ত দরকার। একালে সে-বিবরণ হাতে লেখার তো কথাই আসে না। টাইপ করার জন্য সঙ্গে টাইপরাইটার রাখাও একটা বাড়তি বেয়াড়া বোঝা বওয়া। ড. লক তাই একটা ছোট টেপরেকর্ডার সঙ্গে নিয়েছিলেন, যাতে তাঁর অভিযানের প্রতিদিনের বিবরণ তিনি মুখে বলে টেপ-এ ধরে রাখতেন।
সেই যন্ত্রটা নিয়েই গণ্ডগোল বেধেছিল প্রথমে। সাফসুফ করার সময় ও যন্ত্রে হাত
দিতে বলার জন্য রেকর্ডারটা একটু চালিয়ে দেখাতে যেতেই হাউমাউ করে চিৎকার করে পড়ি কি মরি অবস্থায় চিংড়ি তো তাঁবুর বাইরে দে ছুট। সে তখন এই ভুতুড়ে তাঁবুর কাজ ছেড়ে দিতে চায়। লোধা-গোধাকে তারপর অনেক বুঝিয়ে-সুঝিয়ে তাকে তাঁবুতে ফেরাতে হয়েছে।
এরপর আর বিশেষ গোলমাল-টোলমাল হয়নি। যে কাজের জন্য তাকে নেওয়া, সে কাজে চিংড়ি বাহাদুরিই দেখিয়েছে দিন কয়েকের মধ্যে। ক্যামেরুনসের এই অঞ্চল প্রায় অজানা জঙ্গল-পাহাড়, আবার আধা মরুর দেশ। বুনো মোষ, হাতি, গণ্ডার, সিংহ থেকে হিংস্র জংলি আদিবাসীদের এড়িয়ে সেখানে প্রতি পদে প্রাণ হাতে নিয়ে টহল দিতে হয়। এ কাজে চিংড়ি কিন্তু দারুণ বাহাদুর। ড. লক ক্যামেরুনসের ভিতরের দিকে চাড় হ্রদের কাছে এক আগ্নেয়গিরির কাছাকাছি অঞ্চলেই যেতে চান। প্রায় চোদ্দো হাজার ফুট উঁচু সেই আগ্নেয়গিরি নয়, তার কাছাকাছি নিশ নামে এক হ্রদই তাঁর লক্ষ্য।
পদে পদে যেখানে বিপদ, সেই সম্পূর্ণ অজানা, অতি দুর্গম দেশে চিংড়ি কিন্তু কোনও অদ্ভুত ক্ষমতায় যে সবচেয়ে নিরাপদে আর তাড়াতাড়ি লক্ষ্যের দিকে পৌঁছচ্ছে, বোঝা গেল।
এদিক দিয়ে পুরোপুরি খুশি হবার কারণ থাকলেও, লক তখন কিন্তু দারুণ ভয় আর দুর্ভাবনায় পড়েছেন। তাঁর যে দুশমনের ভয়ে লোধা-গোধার মতো দুই যমজ ঘটোৎকচকে তিনি পাহারায় নিয়েছেন, তার হাত থেকে তিনি যে রেহাই পাননি, তা তিনি এই অভিযানে চিংড়ি নদীর মোহনা থেকে রওনা হবার কদিন পরেই টের পেলেন।
সে দুশমন যে তাঁর সঙ্গেই আছে তার প্রথম প্রমাণ যা পাওয়া গেল তা খানিকটা যেন ঠাট্টার মতো ব্যাপার। অভিযানের বিবরণ টেপরেকর্ডারে তুলে রাখলেও পথের হদিস ধরে রাখবার জন্য ড, লক খুব সংক্ষেপে একটা মানচিত্রের খসড়া লিখে আর এঁকে রাখতেন। সেই খসড়া ম্যাপের উপর একদিন হঠাৎ কিছু হিজিবিজি কাটা দেখা গেল।
সেই হিজিবিজি কাটাকুটিতে ভাবনার খুব বেশি কিছু ছিল না। চিংড়ি হয়তো তাঁবুর ঝাড়পোঁছ করবার সময় অসাবধানে বা জংলি খেয়ালে তাতে অমন দাগ কেটে থাকতে পারে, কিন্তু সেই হিজিবিজির পাশে স্পষ্ট অক্ষরে যা লেখা, সেটাই তো অবিশ্বাস্য একটা রহস্য।
হিজিবিজির আশেপাশে গোটা-গোটা হরফে স্প্যানিশে লেখা—ট কোয়ে তাল আমিগো?
ড. লক স্প্যানিশ না জানলেও ও ক-টা কথার মানে জানেন। ও কথাগুলোর মানে হল, কেমন আছ বন্ধু?
এই অজানা বিদেশে এক গোপন অভিযানে এতদূর আসবার পরে তাঁর দুই যমজ দানব আর এক জংলি নফরের পাহারা দেওয়া তাঁবুতে ঢুকে একাজ কার পক্ষে কেমন করে সম্ভব হতে পারে?
সম্পূর্ণ ভৌতিক ছাড়া ব্যাপারটার তো আর কোনও ব্যাখ্যা হয় না।
অত্যন্ত অস্থির হলেও ব্যাপারটা নিয়ে হইচই না করে ড. লক রহস্যটা বুঝবার জন্য কিছুদিন নিঃশব্দে সজাগ থাকবেন বলে ঠিক করলেন।
