আচ্ছা, তাই হবে।
রাম বসু চলে গেলে রেশমী স্থির করল যে, কখনও সে বিশ্বাসভঙ্গ করবে না, কখনও সে মিস এলমারের বিছানার তলায় কবচ রাখবে না।
তার পরে মনে মনে বলল, আর ঐ বোকা হাঁদা মানুষটা বিয়ে করবে কিনা মিস এলমারকে। নিজের পৌরুষে যখন কুলোল না, তখন আন তাবিজ, আন কবচ। যত সব বুজরুকি! নাঃ, কখনই এমন হীন কাজের মধ্যে আমি নেই।
এইভাবে সঙ্কল্প স্থির করে নিজ শয়নগৃহে প্রবেশ করল আর কবচটা নিজের বালিসের তলায় চাপা দিয়ে রেখে বলল, আপাতত থাকুক এখানে। আর যাই হক, মিস এলমারকে আমি বিপন্ন করতে পারব না। তাবিজ কবচের ফলে অনেক সময়ে মানুষ মারা যায়।
এমন তিন-চারটি ঘটনা ঠিক সময় বুঝে মনে পড়ে গেল তার হঠাৎ।
রেশমী বেশ নিশ্চিন্ত ছিল। কিন্তু জনের অপ্রত্যাশিত সাদর অভ্যর্থনায় তার আপাদমস্তক বিষিয়ে উঠল, বিস্ময়ে ও তিক্ততায় তার মন গেল ভরে। জন ও মিস এলমারের প্রীতিপূর্ণ আলাপের অন্তরায়িত পটভূমিতে দাঁড়িয়ে বারংবার সে মনে মনে। বলতে লাগল-ওঃ সব্বাই এমন, ওঃ সব্বাই এমন!
সব্বাই বলতে কে কে আর এমন বলতে কি কি বিচার করবার মত মনের অবস্থা তখন তার ছিল না। নিজের ভদ্রাসন নীলাম-নহবতে উঠে বিক্রি হয়ে যাচ্ছে দেখলে ধীরমস্তিষ্কে বিচার করতে পারে কয়জন?
জন ও রোজ এলমার বেড়াতে বেরিয়ে গেলে যতক্ষণ তাদের দেখা যায় দেখল। চেয়ে রেশমী, সাপে-কাটা মানুষ যেমন একদৃষ্টে চেয়ে দেখে ভয়াল সাপটার দিকে। তার পরে এক ছুটে সরে গিয়ে বের করে নিল কবচটা, হাতের চাপে দিল সেটাকে চেপটিয়ে, তার পরে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল বাড়ির প্রান্তের পুকুরটার* ধারে—সবলে ছুঁড়ে দিল সেই দীর্ণ কবচ গভীর জলের দিকে—যাঃ!
রেশমী ফিরে এসে দেখে, অপেক্ষা করছে কর্নেল রিকেট।
সে আভূমি নত হয়ে সেলাম করল।
মিস এলমার কোথায়?
বেড়াতে বেরিয়েছে।
একাকী?
না।
সঙ্গে কে গিয়েছে?
মিঃ স্মিথ। তার সঙ্গেই তো যায় মিস এলমার।
সে কি কথা! গতকাল পর্যন্ত আমি তো গিয়েছি তার সঙ্গে!
তবে আজ থেকেই শুরু হল।
এ কেমন হল? জানিয়েছিলাম যে, আমি আসব!
হয়তো সেইজন্যেই আগে বেরিয়েছে।
কি জন্যে?
তোমাকে এড়াবার জন্যে।
অসম্ভব।
সম্ভব তো হল।
মধুর সঙ্গে বিন্দু বিন্দু বিষ মিশিয়ে দিতে মেয়েরা কেমন পারে! মধুর অধরে কঠিন কথা কেমন অঙ্গুলিতে হীরের অঙ্গুরীয়ের মত শোভা পায়!
কর্নেলের আত্মম্ভরিতায় আঘাত পড়ায় তার কাণ্ডজ্ঞান লোপ পেয়েছিল, নতুবা বুঝতে পারত, সামান্য একজন পরিচারিকাকে এমন করে জেরা করা ভদ্রতাসম্মত নয়।
কার বেশি আগ্রহ দেখলে?
রেশমী একটু ভেবে বলল, দুজনেরই সমান মনে হল।
কখন ফিরবে জান?
বোধ হয় রাত হবে।
কেমন করে জানলে?
গায়ের শাল নিয়ে গিয়েছে।
টগবগ করে ফুটছিল কর্নেল-পায়চারি করছিল ঘরের মধ্যে।
আমার সম্বন্ধে কিছু বলল?
না। অনেক সময়ে উদাসীনতাটাই খারাপ।
রাইট! ময়দানের দিকে গিয়েছে?
না, বনের দিকে।
তার পরে প্রায় স্বগতভাবে—একটু নিরিবিলি চায় বোধ করি।
হেঁটে গিয়েছে?
হাঁ।
গাড়ি ছিল না?
ছিল।
তবে গেল না কেন?
নিতান্ত নির্বিকারভাবে রেশমী বলল, কোন কোন সময়ে তৃতীয় পক্ষের উপস্থিতি বিড়ম্বনাজনক।
রাইট! আজ ছবিখানায় ফুল দেখছি না কেন?
আজ ফুল অন্যত্র শোভা পাচ্ছে।
কোথায়, শীঘ্র বল।
মিঃ স্মিথের বুকে।
কে দিল?
দিতে একজনই মাত্র পারে।
আমি স্কাউভেলটাকে দেখে নেব-বলে সগর্জনে ছুটে বেরিয়ে গেল কর্নেল রিকেট।
রেশমী জানলা দিয়ে দেখতে পেল কর্নেলের বগি গাড়ি নক্ষত্ৰবেগে হুটে বেরিয়ে গেল বেরিয়াল গ্রাউঙ ধরে পুবদিকে।
বোজ এলমার ফিরে এসে শুধাল, কর্নেল এসেছিল নাকি?
রেশমী বলল, এসেছিল।
আমার জন্যে কি অপেক্ষা করেছিল?
না।
অপেক্ষা করতে বলেছিলে কি?
আর অপেক্ষা করতে বলে কি হবে?
রেশমীর কথার ভঙ্গীতে কিছু বিস্মিত হয়ে এলমার শুধাল, কেন?
কেন আর কি! মনে হল, তুমিও চাও না, আর খুব সম্ভব মিঃ স্মিথও বিরক্ত হবে।
কি আশ্চর্য, আমিই বা চাই না কেন, আর মিঃ স্মিথই বা বিরক্ত হবে কেন?
কোনদিন তো কর্নেলকে উপেক্ষা করে তোমরা বেরিয়ে যাও না, তাই মনে হল।
হঠাৎ চমক ভাঙল এলমারের, সে বলে উঠল, ওঃ বুঝেছি। তুমি ভেবেছ আমি মিঃ স্মিথকে ভালবাসি!
আমার ভাবায় কি আসে যায়, কর্নেল তাই মনে করেছে।
কর্নেল একটি গোয়ার আর তুমি একটি নির্বোধ।
সে তো বরাবরই আছে, নূতন করে মনে পড়াবার কারণ কি?
মনে পড়াবার কারণ এই যে, আজ সকালে দেশ থেকে কবির একখানা চিঠি পেয়েছি।
নিরানন্দমুখে রেশমী বলল, বড় আনন্দের কথা।
আগে সবটা শোনাই, তার পরে উত্তর দিও। জন আর কর্নেলের কথা কবিকে খুলে লিখেছিলাম। উত্তরে কবি লিখেছে যে, কর্নেলের মত লোকের জন্যে চিন্তা করি নে, ওদের হাতে সব সময়েই একাধিক তীর থাকে, ওরা জন্মতীরন্দাজ লোক। তোমার কাছে প্রত্যাখ্যাত হলে ভগ্নহৃদয় হয়ে ও মরবে না, সমান উৎসাহে অন্য লক্ষ্যে তীর নিক্ষেপ করতে শুরু করবে। চিন্তা করি অপর লোকটির জন্যে যার নাম লিখেছ জন স্মিথ। সংসারে মুষ্টিমেয় একদল লোক আছে যারা জন্মপ্রেমিক-স্মিথ সেই দলের। ভালোবাসার প্রত্যাখ্যান ওদের কাছে মৃত্যুতুল্য। ভালবাসতে ওকে যখন পারবেই না, অন্তত একটু আদর-যত্ন আত্মীয়তা কর। কবি লিখেছে, ওটা ভালবাসার বিকল্প নয় জানি তবু ওর বেশি তোমার হাতে তো নেই। সংসারে অনেক সময়েই চরমধন জোটে না, তখন কাছাকাছিটা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকা ছাড়া উপায় কি।
