.
৩.০৮ পলে চাঁদের ছায়া
সেদিন জন আসবামাত্র রোজ এলমার সাগ্রহে সানন্দে বলে উঠল, এস, এস জন, তোমাকে দু দিন দেখি নি কেন?
প্রত্যাশাতীত স্বাগতে অভিভূত হয়ে জন বলল, একটু ব্যস্ত ছিলাম। তা ছাড়া, আমার ধারণা কি জান?
কি তোমার ধারণা, শুনি?
আমার ঘন ঘন আসাটা তুমি পছন্দ কর না।
আমার প্রতি অবিচার করছ, জন। আমি সারাদিন অপেক্ষা করে থাকি কখন তুমি আসবে।
এই যদি সত্যই তোমার মনের কথা হয়, বেশ তাহলে আর কখনও আসা বাদ পড়বে না।
রোজ এলমার হেসে বলল, নিশ্চয় তো?
হাসতে হাসতে প্রত্যুত্তর দিয়ে জন বলল, দেখো নিশ্চয় কি না।
রোজ এলমার বলল, তুমি একটু অপেক্ষা কর, আমি একখানা শাল নিয়ে আসি, তোমার সঙ্গে বেড়াতে বের হব।
জনের বিস্ময়ের আর অন্ত থাকে না। বলে, জীবনের শেষদিন পর্যন্ত অপেক্ষা করে থাকব।
না না, ততখানি ধৈর্যের প্রয়োজন হবে না, দশ মিনিটের মধ্যেই আসব, বলে হেসে লঘুছন্দে গৃহান্তরে যায় মিস এলমার।
অভিভূত জন ভাবে, হঠাৎ এ পরিবর্তন কেমন করে সম্ভব হল? তার পরে ভাবে, এই তো স্বাভাবিক, না হলেই তো বিস্ময়কর হত। সাধে কি আড়াইশ টাকা খরচ করে ইণ্ডিয়ান yogic ট্যালিসম্যান যোগাড় করেছি! মনে পড়ে তার রাম বসুর কথা। রাম বসু কবচখানা তাকে দেবার সময়ে বলেছিল, মিঃ স্মিথ, ফল না ফলে যায় না, মাদার কালী হচ্ছে এভার ওয়েকফুল গডেস! এখন জন রাম বসুর ভাষায় hand to hand fruit হাতে হাতে ফল পেয়ে মনে মনে বলে উঠল, “জয় মা কালী”। রাম বস শিখিয়ে দিয়েছিল, মাঝে মাঝে বলতে হবে “জয় মা কালী”।
আগের দিন মন্ত্রপূত তামার কবচখানা নিয়ে রাম বসু জনের সঙ্গে দেখা করে বলে, মিঃ স্মিথ, এ ট্যালিসম্যান অব্যর্থ, তোমার মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হবেই।
জন শুধায়, এবারে কি করতে হবে?
এবারে নিয়ে গিয়ে এটা মিস এলমারের হাতে বেঁধে দাও।
বিভ্রান্ত জন বলল, তা কি করে সম্ভব? এ যে বিড়ালের গলায় ঘন্টা বাধার মত। না, মুন্সী, তা কখনও সম্ভব নয়, ও রকম অদ্ভুত প্রস্তাব আমি মিস এলমারের কাছে করতে পারব না।
গম্ভীর হয়ে রাম বসু বলল, তবেই তো মুশকিল!
জন বলল, আর কি কোন উপায় নেই?
উপায় নেই সে কি হয়! আমাদের হিন্দুশাস্ত্র খুব উদার, বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিভিন্ন উপায়ের নির্দেশ দিয়েছে!
তবে তারই একটা বল।
কিন্তু সে যে আবার খরচের ব্যাপার!
Damn it! কত চাই বল, বলে এক মুঠো টাকা বের করল জন।
বেশি নয়, আপাতত গোটা কুড়ি হলেই চলবে।
এই নাও। কিন্তু talisman কখন দেবে?
ট্যালিসমান এখনই নাও, পরে আমি পূজো দিয়ে দেব। এ রকম posthumous পূজার রীতি আমাদের দেশে আছে।
তবে দাও, বলে কবচখানা প্রায় ছিনিয়ে নিল রাম বসুর হাত থেকে, বল এবারে কি করতে হবে?
আর কিছু নয়, কোনরকমে মিস এলমারের বিছানার নীচে কবচখানা রেখে দিতে হবে।
আবার বিভ্রান্ত হয়ে জন বলল, তা কি করে সম্ভব? মিস এলমারের শয়নগৃহে আমি ঢুকব কি করে?
রাম বসু মনে মনে বলল, হাঁদারাম, তা কি আমি জানি নে, তার শয়নগৃহে যদি ঢুকতেই পারবে তবে কি আর আমার ফাঁদে পা দিতে এস! মনে মনে আরও বলল, তুমি ওর শয়নগৃহের বাইরে চিরদিন ফ্যা ফ্যা করে ঘুরে বেড়াবে। ঢুকবে ঐ বেটা জঙ্গী সেপাই। হয়তো এতদিন চুকেছে নইলে বেটী তোমাকে আমল দিতে চায় না কেন!
মুন্সীকে নীরব দেখে জন বলল, দেখ মুন্সী, আমার মাথায় এক বুদ্ধি এসেছে। রেশমী বিবি মিস এলমারের শয্যা প্রস্তৃত করে। সে ইচ্ছা করলে অবশ্যই গোপনে বিছানার তলায় রেখে দিতে পারে। সে তো তোমার হাতের লোক, তাকে দাও না কেন!
চমৎকার বলেছ মিঃ স্মিথ। আমাদের শাস্ত্রে বলেছে যে, প্রেমে পড়লে মানুষের বুদ্ধি খুলে যায়।
তখন স্থির হল যে, রেশমীকে দিয়ে কাজটা করাতে হবে।
রাম বসু রেশমীর সঙ্গে দেখা করে প্রস্তাবটা করল। সব শুনে রেশমী রেগে উঠে বলল, কায়েৎ দা, তুমি কত লেখাপড়া শিখে এই সব বুজরুকিতে বিশ্বাস কর!
রাম বসু বলল, ওরে রেশমী, রাম বসু কিছুতেই বিশ্বাস করে না, আবার কিছুতেই অবিশ্বাস করে না, তবে কিনা লাগে তাক না লাগে তুক। যা বলছি কর।
রেশমী বলে—এ যে বিশ্বাসভঙ্গ করা হবে!
কেমন?
মিস এলমারকে না বলে তার বিছানার তলায় রাখলে–
দূর বোকা মেয়ে! বিশ্বাসভঙ্গ তো দূরের কথা, সামান্য নিদ্রাভঙ্গও হবে না। বলছি কর।
শেষে সত্যি যদি মিস এলমার জনকে বিয়ে করতে চায়?
বিয়ে করবে। তাতে তোরই বা কি আর আমারই বা কি!
আমার অবশ্য কিছু নয়। কিন্তু ধর এর পরে কর্নেল সাহেব যদি আবার তোমাকে ধরে একটা কবচ করে দিতে?
করে দেব।
তখন যদি আবার মিস এলমার—তখন অবশ্য মিসেস স্মিথ-কর্নেলকে বিয়ে করবার জন্যে ক্ষেপে ওঠে?
করবে কর্নেলকে বিয়ে। ক্ষতিটা কি! ওদের কতবার করে ডাইভোর্স আর বিযে হয় জানিস না কি?
কিন্তু তখন মিঃ স্মিথের কি অবস্থা হবে ভেবে দেখেছ?
রেশমীর কথা শুনে রাম বসু হো হো করে হেসে উঠল, কামিখ্যেয় ঝড় হল, কাক মরল ময়নাকাঁদিতে, সেইরকম কথা বলছিস যে! আচ্ছা, জনের অবস্থা যদি তখন খুব খারাপ হয় তখন তুই না হয় কষ্ঠিবদল করে ওকে বিয়ে করিস! এই বলে আবার হেসে উঠল রাম বস।
কি যে বলছ কায়েৎ দা, থাম।
আচ্ছা থামছি, এখন বল, কবচটা নিবি কি না!
কিছুক্ষণ নীরব থেকে হঠাৎ বলে উঠল, দাও।
যেমন বলেছি ঠিক-ঠিক করিস, শিয়রের দিকে বিছানার তলায়।
