এ কথার মোগ্য উত্তর মানবভাষায় সম্ভব নয় বুঝে অন্নদা সম্মার্জনীর সন্ধান করছিল। সশস্ত্র প্রত্যাবর্তন করে দেখল শত্ৰু প্ৰস্থিতা। তখন সে মনের আক্রোশ মিটিয়ে শত্ৰু-অধিকৃত স্থানটির উপরে সম্মার্জনী বর্ষণ করতে শুরু করল, মর মর তুই শুকিয়ে, পাটকাঠি হয়ে শীগগির মর।
.
টুশকি বলে, কায়েৎ দা, এবারে তোমার রকম-সকম কিছু ভিন্ন রকম দেখছি।
কি রকম দেখছিস বল্ না!
কথাবার্তা আর আগের মত নয়।
রাম বসু বলে, না রে, আর কথাবার্তায় ফুল ফোঁটানো নয়, এবারে ভিতরের দিকে শিকড় চালিয়ে দিচ্ছি।
সেখানে রস যোগাচ্ছে কে, গৌতমী নাকি? শুধায় টুশকি।
রাম বসু হেসে বলে, কে, ওই ছোট্ট মেয়েটা? তার সাধ্যি কি!
রেশমী বলেছিল, কায়েৎ দা, আমার নামটা আর গাঁয়ের নামটা প্রকাশ কর না। মুখ পুড়িয়েছি, কে কোথায় চিনে ফেলবে।
রাম বস বলে, তা ছাড়া চণ্ডী বক্সীর ভয়টাও আছে।
রেশমীকে গৌতমী বলে উল্লেখ করে ন্যাড়া আর রাম বসু। টুশকি শুধায়, মেয়েটাকে একদিন নিয়ে এসে না। খুব দেখতে ইচ্ছে করে।
তাকে আনা সহজ নয় রে, সে এখন সাহেব বাড়ির দাসী, মেমসাহেবরা খুব ভালবাসে।
তবে একদিন আমাকেই কেন নিয়ে চল না সেখানে?
কি বলে পরিচয় দেব?
বলবে, ওর দিদি।
আচ্ছা দেখি, আজকাল আমিই দেখা করবার সুযোগ পাই কম।
টুশকি বলল, কায়েৎ দা, অনেকদিন পরে এলে, আজ রাতটা এখানে থাক না।
রাম বসু একটু ভেবে বলল, না, আজকে থাক।
কেন, কায়েৎ বউদির ভয়ে বুঝি? কেমন আছে বউদি?
সে তোর ঐ চরখাটার মত, যত সুতো কাটে তার বেশি জড়ায়, ঘ্যানর ঘ্যানর করে তার চেয়ে বেশি।
টুশকি বলে, আহা কি সুখের তোমার জীবন!
রাম বসু কিছু বলে না, একটা দীর্ঘনিশ্বাস চাপে।
টুশকির কাছে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে পড়ে রাম বসু, চলতে থাকে উদ্দেশ্যহীন ভাবে এপথ সেপথ ধরে।
পাহাড়ের চূড়ায় সজ্জিত ছিল স্তরবিন্যস্ত শুষ্ক ইন্ধন, সে জানত একদিন না একদিন নামবে বিদ্যুদগ্নিশিখা, প্রজ্বলিত দাবানলে সার্থক হবে তার নিষ্প্রভ জীবন। সহসা নামল বহুপ্রতীক্ষিত শিখা; ইন্ধনবহ্নি উদ্বোধিত করযুগলে বলে উঠল, ধন্য হল আমার প্রতীক্ষা, সার্থক হল আমার জীবন, যত দাহ সার্থকতা তত অধিক।
রাম বসুর মন পর্বতচূড়াস্থ ইন্ধনপ, রেশমী বিহ্নিশিখা।
মধ্যযুগের জীবন-মানদণ্ড ছিল পাপ আর পূণ্য। নব্যযুগ বদলে ফেলল পুরাতন মানদণ্ড, তার বদলে গ্রহণ করল নুতন মানদণ্ড-সুন্দর আর কুৎসিত। নব্যযুগের চোখে যা সুন্দর তা-ই পুণ্য, যা কুৎসিত তা-ই পাপ। মধ্যযুগ শিল্পী, মধ্যযুগ সাধক। নব্যযুগের প্রথম মানুষ রাম বসুর চোখে সৌন্দর্যের অরুণাভা উদঘাটিত হল রেশমীর দিব্য সৌন্দর্যে। রাম বসু প্রচ্ছন্ন কবি।
রাম বসুর যখন সম্বিৎ হল সে দেখলে রাসেল সাহেবের বাড়ির কাছে এসে পৌঁছেছে—ভাবল একবার দেখা করেই যাই না কেন! বাগানের খিড়কি দরজায় এসে সে ডাক দিল, রেশমী, রেশমী!
.
৩.০৪ বকলমে প্রেম
রাম বসু শুধালে, হাঁরে রেশমী, তার পর, কেমন লাগছে বল?
রেশমী বলল, আমার ভাগ্যে এমন সুখ হবে ভাবি নি। রোজি দিদি খুব ভালবাসে। আর কর্তা গিন্নী?
তাদের সঙ্গে দেখা হয় না। আর দেখা হলেই কি কাছে যাই? দূর থেকে সেলাম করে সরে পডি। তাদের আলাদা মহল।
আর কে কে আসে?
একজনকে তো চেন। জন সাহেব।
আর একজন কে?
মহাজন সাহেব!
মহাজন আবার কে রে?
যেমন মোটা তেমনি লম্বা, কুমোরের চাকার মত বেড় পেটের, মহাজন ছাড়া আর কি বলব?
আর কেউ আসে না?
এই দুইজনের উপরে আরও দরকার? বিশেষ, মহাজন সাহেব একাই একশ।
কেমন? ঘরের মধ্যে যখন কথা বলে, ছাদের কড়িবরগা কাঁপে।
তুই কাঁপিস না?
আমি কাঁপি কিনা জানি নে তবে জন সাহেব কাঁপে।
কেন?
কেন কি, রাগে হিংসায় এককোণে বসে কাঁপতে কাঁপতে অবশেষে উঠে বেরিয়ে যায়।
কেন রে?
কেন রে? তুমি এত বোঝ আর এইটে বুঝতে পারছ না? দুইজনেই ভালবাসে রোজি দিদিকে। কিন্তু মহাজনের সঙ্গে পারবে কেন জন?
তোর রোজি দিদি কাকে আমল দেয়?
মহাজন কি সেই পাত্র যে তাকে আমল দিতে হবে। পুরনো জামাই-এর মত নিশ্চিন্তভাবে প্রবেশ করে সে।
আর জন সাহেব?
মুখটি শুকিয়ে বেরিয়ে চলে যায়।
আহা, বেচারার তবে বড় কষ্ট।
কষ্ট তো আসে কেন? ওরকম মেয়েলী পুরুষকে পছন্দ করে কোন্ মেয়ে! কথাগুলো ঝাঁঝের সঙ্গে বলে রেশমী।
তুই-ও দেখছি মহাজনের দিকে।
না হয়ে উপায় কি! হাঁ, একটা পুরুষ বটে।
হয় তাই হল। তা কতদিন আর দ্রৌপদী হয়ে সৈরিঞ্জী বেশে থাকবি?
যতদিন না কীচক-বধ সম্পন্ন হয়।
কীচক আবার হতে গেল কে?
কেন, চণ্ডী খুড়ো! কোন সন্ধান পেলে তার?
কখনও তো চোখে পড়ে নি, বোধ করি সব ভুলে গিয়েছে।
পাগল হয়েছ তুমি! ভীমরুল সাত হাত জলের তলে গিয়ে কামড়ায়—চণ্ডীখুড়ো যায় সাতান্ন হাত জলের তলে!
তাহলে খুব নিরাপদ স্থানে আছিস।
তা আছি বই কি। আর যদি এদিকে ভুলে আসেই, তবে ভীমসেন তো ঘরেই আছে।
কে?
কেন, মহাজন সাহেব! রেশমী হেসে ওঠে।
এবার তবে যাই।
মাঝে মাঝে এসো, একদিন ন্যাড়াকে এনো সঙ্গে।
আচ্ছা দেখব, বলে বিদায় নেয় রাম বসু।
রাতে একা ঘরে শুয়ে রোজ এলমার, জন কর্নেল রিকেটের নিত্যকার জীবনলীলার কথা চিন্তা করে রৈশমী।
কতক ফল আছে যার পাক ধরে বাইরে থেকে শেষে একদিন ভিতরে গিয়ে পৌঁছয় পরিণতি। আর এক জাতের ফল আছে যাদের পরিণতি শুরু হয় ভিতরে, বাইরে থেকে হঠাৎ দেখলে মনে হয় বেশ কাঁচা, তার পরে বাইরে যখন রঙ ধরে বুঝতে হবে যে কোথাও এতটুকু অপরিণত নেই। রেশমী সেই শেষ জাতের ফল। ফুলকি তাকে জ্ঞান বৃক্ষের সন্ধান দিয়েছিল, তার পরে একদিন রাতে রাম বসু তার হাতে তুলে দিয়ে গেল জ্ঞানবৃক্ষের পরমরমণীয় ফলটি। রেশমী না পারল ফেলতে, না পারল গিলতে, কিংকর্তব্য স্থির করতে না পেরে বেঁধে রাখল আঁচলে। জ্ঞানবৃক্ষের স্বাদ গ্রহণ না করলেই যে তার প্রভাব নিষ্ক্রিয় থাকে তা নয়। তার সৌগন্ধে ঘরের বায়ু আমোদিত হয়ে মনকে উতলা করে, তার সৌন্দর্যে মন রঙীন হয়ে ওঠে, তার মধুর উত্তাপে মনটি তাপিত হতে থাকে। বেচারা রেশমী জানত না, কেউ বলে দিলেও স্বীকার করত না যে তার ভিতরে পাক ধরেছে। রাম বসুকে সে বলেছিল যে চিতার আগুনে সব পুড়ে গিয়েছে। কিন্তু সব কিছু কি পোড়ে? সোনা ও বাসনা কি অগ্নিদাহ্য? তবে বাসনার তাড়নায় অশরীরী প্রেত ঘুরে বেড়ায় কেন মৃত্যুর পরেও? না, তা নয়। চিতার আগুনে রেশমীর পুড়েছিল হিন্দুনারীর সংস্কার, পোড়ে নি রমণী-হৃদয়। পুড়েছিল বাঁধন, পোড়ে নি বাসনা; হয়তো সে বাসনা নিস্তেজ হয়ে থাকত তার জীবনে, কিন্তু এখন এমন এক পরিবেশে এসে পড়েছে সে, যেখানে সমস্তই বাসনার অনুকূল। পরিচিত আচার বিচার শাস্ত্র সংসার কতদুরে গিয়ে পড়েছে। তার উপরে রোজ এলমারকে নিয়ে প্রেমের যে লীলা চলেছে সম্মুখে, তার তাপে সমস্ত দেহমন উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। ওদের সুরার ছিটেফোঁটা এসে লাগে ওর গায়ে, তার তীব্র মদির গন্ধ নাসারন্ধ্রে প্রবেশ করে—ওকে ভিতরে মাতিয়ে তোলে, তাতিয়ে দেয়। সে রোজ এলমারের বকলমে প্রেমানিভিনয় করেকার সঙ্গে?
