তার পরে আন্তরিকতার সঙ্গে বলে লিজা, না জন, শীঘ্র বিয়ে কর। বাবা গত হবার পর থেকে বাড়িটা খাঁ খাঁ করছে। তাছাড়া একবার মিস এলমারের কথাটাও ভেবে দেখা উচিত, সে খুব নিঃসঙ্গ।
আপাতত একটি সঙ্গিনী জুটিয়ে দিয়েছি।
দেখেছি মেয়েটিকে, এদেশী মেয়েদের মধ্যে অমনটি সচরাচর দেখা যায় না। প্রথম দিন দেখে হঠাৎ ইউরেশিয়ান মেয়ে বলে মনে হয়েছিল।
হাঁ, ইংরেজি বলতে কইতে শিখতে বেশ মজবুত।
এই বলে রেশমীর পূর্ব ইতিহাস শোনায় জন লিজাকে।
.
৩.০৩ এক নদীতে দুইবার স্নান সম্ভবে না
দার্শনিকেরা বলেন এক নদীতে দুবার স্নান করা সম্ভব নয়। মানুষ সম্বন্ধে একথা আরও সত্য। নিয়ত সঞ্চরমাণ চৈতন্যপ্রবাহ মানুষকে অবলম্বন করে চলেছে, এই মুহূর্তের মানুষ পরমূহুর্তে থাকে না। এক মানুষের সঙ্গে দুবার কথা বলা সম্ভব নয়। জলপ্রবাহ নিয়ত পরিবর্তনশীল, নদী অপরিবর্তিত। চৈতন্যপ্রবাহ পরিবর্তনশীল, মনুষ্যরূপী সংস্কার অপরিবর্তিত। কিন্তু তলিয়ে বিচার করলে দেখা যাবে নদী ও মানুষ দুই-ই চঞ্চল। সব নদীতে স্রোতোবেগ সমান নয়, সব মানুষে চৈতন্যপ্রবাহ সমান গতিশীল নয়। মহানদীতে ও মহাপুরুষে পরিবর্তন দ্রুততর।
যে রাম বসু মালদ গিয়েছিল আর যে রাম বসু মালদ থেকে ফিরল কেবল তত্ত্ববিচারে তারা ভিন্ন নয়—ব্যবহারিক বিচারেও তাদের ভেদ প্রকট হয়ে উঠল।
বিনা নোটিশে রাম বসুকে ফিরতে দেখে পত্নী অন্নদা ঝকার দিয়ে উঠল-কথা নেই বার্তা নেই অমনি এসে পড়লেই হল!
উত্তম বীণা-যন্ত্রের ও সাধী পত্নীর বিনা কারণে ঝকৃত হয়ে ওঠা স্বভাব।
আগে হলে রাম বসু উত্তর দিত, হয়তো বলত, নিজের বাড়িতে আসব তার আবার এত্তালা কি; হয়তো বলত, যখন শালাদের বাড়িতে যাব তোমাকে দিয়ে আগে এত্তালা পাঠাব। ঐ উপলক্ষে স্বামী-স্ত্রীতে এক পশলা ঝগড়া হয়ে যেত। কিন্তু এখন তেমন উদ্যম করল না, শুধু একবার হেসে বলল, ভাল লাগল না, চলে এলাম। তাছাড়া অনেকদিন তোমাদের দেখি নি।
মরি মরি, কত সোহাগ রে, বলে অন্নদা বলয়বক্তৃত হাতখানা তার মুখের কাছে বার-কতক নেড়ে দিল।
নরোত্তম বা নেরু ন্যাড়াদাকে পেয়ে খুশি হল, তার সঙ্গে জুটে গেল।
অন্নদা লক্ষ্য করল যে রাম বস এবারে কেমন যেন নীরব, সর্বদা মনমরা হয়ে থাকে, নয়তো বাইরে বাইরে ঘুরে বেড়ায়।
রাম বসু বার হতে যাচ্ছে দেখে জিজ্ঞাসা করে, কোন ভাগাড়ে যাচ্ছ?
একটা চাকুরি ছেড়ে এলাম, আর একটা খুঁজে বার করতে হবে তো? চলবে কি করে?
কেন, ধিঙ্গিপনা করে! যাও খিরিস্তানগুলোর সঙ্গে গিয়ে ঘোর গে! দিলে তো ঝাঁটা মেরে বিদেয় করে!
নিরুত্তর রাম বসু চাদরখানা কাঁধে ফেলে বেরিয়ে যায়।
ঝগড়ার মুখে নিরুত্তর স্বামী স্ত্রীর পক্ষে অসহ্য। উত্তর-প্রত্যুত্তর দুইজনে ভাগ করে নেবে—এই হল গিয়ে কলহের গার্হস্থ্যবিধি। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে স্ত্রীকে একা পূর্বপক্ষ ও উত্তরপক্ষ করতে হলে যে তাপ উৎপন্ন হয় তার আঁচ পাড়া-প্রতিবেশীর গায়ে গিয়ে লাগে। স্বামীর ভৎসনাকে স্ত্রী প্রেমের বিকার বলে গ্রহণ করে, কিন্তু স্বামীর নীরবতার অর্থ অবহেলা। কোন সাধী স্ত্রী তা সহ্য করবে? রাম বসুর নিরুত্তর অবহেলায় কালবৈশাখীর অতর্কিত কর্কশ মেঘ-গর্জনের মত চীৎকার করে উঠল অন্নদা—এমন পাষাণের হাতেও পড়েছিলাম! এবং মুহূর্তেই কালবৈশাখীর পুল বর্ষণে সংসার-ক্ষেত্র পরিপ্লাবিত করে দিল-হাড় জ্বলে গেল, হাড় জ্বলে গেল, এখন মরণ হলেই বাঁচি!
অভীষ্ট ফলোদয়ে বিলম্ব হল না, পাশের বাড়ির বর্ষীয়সী বামুন-গিন্নী এসে উপস্থিত হল।
কি আবার হল কায়েৎ বউ, এতদিন পরে সোয়ামী ঘরে এল, অমন করে কি কাঁদতে আছে!
সোয়ামী ঘরে এল তো আমার চৌদ্দ পুরুষ স্বর্গে গেল! এখন মরণ হলেই বাঁচি বামুনদিদি।
তবে সত্যি কথা বলি কায়েৎ বউ-বলে ধীরেসুস্থে আসন গ্রহণ করে মধুর উপদেশের সঙ্গে তীব্র বিষ মিশিয়ে দিয়ে তেমন করে মধুতে বিষে মেশাতে কেবল মেয়েরাই পারে—বলল, সত্যি কথা বলি বাছা, পুরুষ মানুষ একটু গায়েগত্তি আশা করে, কেবল নাকে কাঁদলে কি পুরষের মন পাওয়া যায়। তুমি তো বাছা কাঠের পুতুল আমার কথা যদি শোন–
কথা শোনাবার সুযোগ বামুন-গিন্নীর ঘটল না, ছিন্ন-জ্যা ধনুষ্ঠির মত উৎক্ষিপ্ত হয়ে উঠে দাঁড়াল অন্নদা—তোমাকে তো সাতটা বাঘে খেয়ে ফুরোতে পারবে না, তবে বামুন দাদা সারারাত বাইরে বাইরে কাটায় কেন? বলি আমাকে আর ঘাঁটিও না।
এত বড় অপবাদেও বামুন-গিন্নী বিচলিত হল না, আত্মস্থভাবে ধীরেসুস্থে বলল, তোমরা তো আসল কথা জান না—তাই ঐ রকম ভাব, বামুন শ্মশানে গিয়ে শব-সাধনা করে-তান্ত্রিক কিনা।
তবু যদি সব না জানতাম। শ্মশান হচ্ছে গিয়ে সোনাগাছি আর শবটি হল ক্ষান্তমণি।
ভরি-পরিমাণ দোক্তা মুখের মধ্যে নিক্ষেপ করে বেশ চিবিয়ে চিবিয়ে বামুন গিন্নী বলল, এত কথাও জান, তোমার কর্তাটির সঙ্গে দেখা হয়েছিল বুঝি, না তোমার নিজেরই যাওয়া-আসা আছে ওই দিকে?
তবে রে শতেকখোয়ারী মাগী–
তখন অবিচলিত বামুন-গিন্নী উঠে দাঁড়িয়ে ধীরপদে অগ্রসর হতে হতে শেষ বিষটুকু ঝেড়ে বিদায় হল–এখন থেকে রাতের বেলায় বামনুটাকে আর অত দূরে যেতে দেব না–বলব পাশের বাড়িতেই শবের যোগাড় হয়েছে, চণ্ডালের শবের অনুসন্ধান করছিল কিনা লোকটা!
