সর্বনাশ কেন?
সেই ইডেন উদ্যান, সেই আদম ও ইভ, এখন বাকিটুকু না মিলে যায়!
কি আর বাকি থাকল?
সর্পরূপী শয়তান।
বাঃ, তা না থাকলে আর মজা কিসের?
বল কি, মজা? আদম আর ইভকে যে ইডেন উদ্যান পরিত্যাগ করে পৃথিবীতে আসতে হয়েছিল!
সেই জন্যেই তো পৃথিবীতে তোমার মত সুন্দরী ভগ্নী পাওয়া গেল।
‘সুন্দরী ভগ্নী’ কথাটা সত্য, কিন্তু সেটা কেবল মিসেস কেরীর ভগ্নী সম্বন্ধেই প্রযোজ্য, অন্তত এক্ষেত্রে—বলে এলিজাবেথ।
কৃত্রিম কোপে তর্জন করে জন বলল, লিজা, তুমি বড় মুখরা। কিন্তু আমিও মুক নই, তবে এখন সময় অল্প, আমি চললাম, কেটি বাইরে অপেক্ষা করছে।
কেটির অপ্রত্যাশিত সৌভাগ্যে লিজার বুকে দীর্ঘশ্বাস ফুলে ফুলে উঠল, কিন্তু সহোদরের সৌভাগ্য বলে তা পুঞ্জীভূতরূপে বাইরে না এসে মনের মধ্যেই যেত বিলীন হয়ে; সে বলত, যাও, কিন্তু সাবধানে যাতায়াত কর।
ভয়টা কিসের? শয়তানরূপী সাপের?
শুধু সাপটাই বা কি কম ভয়ঙ্কর?
এইসব হাস্যপরিহাসের সময়ে কেউ জানত না যে, লিজার ঠাট্টা মর্মান্তিক বাস্তব রূপ গ্রহণ করবে। সুন্দরবন ইডেন উদ্যান না হতে পারে-তাই বলে এখানে শয়তানরূপী সর্গ থাকবে না এমন কোন কথা নেই।
জন ও কেটি বনের মধ্যে দূর-দূরান্তে চলে যায়—বড় বড় গাছ, কালো কালো ছায়া, সরু সঁড়িপথ—দুজনের ঘোড়া যথেচ্ছ চলে; ওরা পথ দেখে না, গল্পে তন্ময় হয়ে থাকে। ভ্রমণ যেখানে উপলক্ষ্য, লক্ষ্য স্থির রাখবার সেখানে কি প্রয়োজন? যখন বেলা বাড়ে, খিদে পায়, ঘোড়া বেঁধে রেখে দুজনে ঘাসের উপর বসে, এক পাত্র থেকে খাদ্য ভাগ করে নিয়ে খায়, একটু বিশ্রাম করে, সারাদিন বনে বনে কাটিয়ে সন্ধ্যায় ফিরে আসে।
লিজা শুধায়—জন, তোমাদের ক্লান্তি বোধ হয় না?
ক্লান্তি বলে একটা শব্দ অভিধানে থাকলেও প্রেমিকের অভিজ্ঞতায় একবারেই নেই। তাই ঐ শব্দটা শুনে জন চমকে উঠল যেন শব্দটা প্রথম শুনল, কিছু বলতে হয় তাই বলল, কই না তো!
একদিন জন ও কেটি উপস্থিত হল দুর্গাপুর বলে ছোট এক গ্রামে। সেখানে পরিচয় ঘটল মশিয়ে দুবোয়া বলে এক ফরাসী ভদ্রলোকের সঙ্গে। লোকটা সভ্যতার প্রান্তে বনের মধ্যে অনেককাল বাসা বেঁধেছে। সুন্দরবনের মোম, মধু, হরিণের চামড়া প্রভৃতি পণ্য কেনে, শহরে চালান দেয়—ঐ তার ব্যবসা।
দুবোয়া তাদের দুজনকে সাদরে অভ্যর্থনা করল, দুপুরবেলা ডিনারে ভুরিভোজন করাল আর পুনরায় আসবে প্রতিশ্রুতি আদায় করে নিল তাদের কাছে। দুবোয়া অবিবাহিত।
জনের সাংসারিক ভূয়োদর্শিতা যথোচিত হলে এমন লোকের বাড়িতে কেটিকে নিয়ে দ্বিতীয়বার পদার্পণ করত না। কিন্তু জন অভিজ্ঞতায় কিশোর, বয়সে তরুণ, প্রেমে যুবক, তাই অন্ধ। তার বোঝা উচিত ছিল দুবোয়া-ও তার মতই নারীদুর্ভিক্ষ-জগতের মানুষ; দিব্যদৃষ্টি থাকলে বুঝতে বিলম্ব হত না যে, ইংরেজ যুবকের জন্য মাঝবয়সী ফরাসীর আকস্মিক আকর্ষণের কারণ তৃতীয় কোন বস্তুতে নিহিত, সেটি দুর্ভিক্ষের অন্নপিণ্ড। আর ‘বুভুক্ষিতঃ কিং ন করোতি পাপম।’
এমন পর পর তিনদিন দুবোয়ার আতিথ্য গ্রহণ চলল। জন অবশ্য প্রসঙ্গত লিজাকে দুবোয়ার আতিথ্যের কথা জানিয়েছিল, কিন্তু সেটা এমনি অবান্তরভাবে বলেছিল যে, বিষয়ের গুরুত্ব লিজার মনে ওঠে নি। তাছাড়া, কেটিকে প্রশ্ন করেও কিছু জানতে পারে নি, জন যদিবা দু-চার কথা বলল, কেটি ও প্রসঙ্গে একেবারেই নীরব। তাই লিজা মনের মধ্যে দুবোয়া-প্রসঙ্গকে মোটেই আমল দেয় নি।
চতুর্থদিন দুপুরবেলা দুবোয়ার গৃহে ডিনার যথাবিধি সমাপ্ত হল, পাশের ঘরে কেটি গেল বিশ্রাম করতে, জন ও দুবোয়া ড্রইংরুমে বসে পান ও গল্পগুজব করতে থাকল। তার পর বিকেলবেলা ফেরবার সময় হলে জন বলল, মশিয়ে দুবোয়া, এবারে কেটিকে খবর দাও, এখনই বেরুতে হবে, আর বিলম্ব হলে ফিরতে অন্ধকার হয়ে যাবে, আজ চাঁদ উঠবে অনেক রাতে।
দুবোয়া বলল, তুমি অপেক্ষা কর, আমি খবর পাঠাচ্ছি–
এই বলে সে ভিতরে গেল, জন গেল বাইরে যেখানে ঘোড়া দুটি অপেক্ষা করছিল।
কিছুক্ষণ পরে দুবোয়া একাকী বেরিয়ে এল।
জন শুধাল, কেটি কোথায়?
দুবোয়া বলল, মিস প্ল্যাকেট বলে পাঠাল যে, সে তোমার সঙ্গে যাবে না, এখানেই থাকবে।
বিস্মিত জন বললে, মশিয়ে দুবোয়া, এ পরিহাস আদৌ সময়োচিত নয়।
দুবোয়া বলল, এটা সময়োচিত, এবং আদৌ পরিহাস নয়।
তার মানে?
সর্পবৎ মসৃণ, শয়তানবৎ স্মিতমুখ দুবোয়া বলল—তার মানে মিস প্ল্যাকেট স্থির করেছে যে আমার ঘরণী হয়ে আমাকে কৃতার্থ করবে।
জন গর্জন করে উঠল—মিথ্যা কথা! তুমি তাকে গুম করেছ, আমি ভিতরে যাব।
সে ভিতরে প্রবেশ করতে উদ্যত হলে দুবোয়া দ্বার রোধ করে দাঁড়াল, বলল, নিতান্ত দুঃখিত, যে, অতিথিকে বাধা দিতে হল।
নিরুপায় জন বলে উঠল, মশিয়ে দুবোয়া, আই ডিমাণ্ড স্যাটিসফ্যাকশন।
ওর অলঙ্কারচ্যুত অর্থ–জন দুবোয়ার সঙ্গে দুএল লড়তে চায়।
দুবোয়া মৃদু হেসে বলল, আবার দুঃখিত মিঃ জন, আমি তোমাকে কৃতজ্ঞতাপাশে বদ্ধ করতে পারলাম না।
কেন, শুনতে পারি কি?
অবশ্যই, মশিয়ে ভলতেয়ার বলেছেন, ডুএল ছেলেমানুষী ব্যাপার।
তোমার মশিয়ে ভলতেয়ার চুলোয় যাক।
কেউ কেউ সন্দেহ করে যে, তার চেয়েও অনেক বেশি তপ্ত জায়গায় মশিয়ে ভলতেয়ার গিয়েছে।
