তা ছাড়া, মুন্সী বলে, আমার ধর্মান্ধ পৌত্তলিক আত্মীয়স্বজনের অত্যাচার।
তোমাকে মারপিঠ করে নাকি?
করে না আবার! এই দেখ—বলে পিঠে একটা ক্ষতচিহ্ন দেখায় বসু।
কিছুদিন আগে ফোড়া হয়েছিল, তারই দাগ।
কেরী বলে, তুমি নালিশ কর না কেন?
কি বলছেন পাদ্রীসাহেব! আমার প্রভু কি তাঁর হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে নালিশ করেছিলেন? আমি সেই দিব্য মেষপালকের পদাঙ্ক অনুসরণ করে কেবল বলি—পিতা ওদের ক্ষমা কর, ওরা জানে না ওরা কি করেছে।
নিজেদের হঠকারিতায় কেরী ও টমাস অনুতপ্ত হয়ে বলে, পিতা, আমাদের ক্ষমা কর।
তার পর কেরী শুধাল, এখন তাহলে কর্তব্য কি?
টমাস বলে, কর্তব্য তো প্রভু কর্তৃক নির্দিষ্ট, অন্যরূপ করবার সাধ্য কি আমাদের।
তবে সেই কথাই ঠিক—কলকাতা শহরেই কেন্দ্র করব ধর্মপ্রচারের, আর একটু স্থির হয়ে বসতে পারলেই মুন্সীর কাছে ফারসী ও বাংলা ভাষা শিখতে শুরু করব।
বসু বলে-বাসস্থানের কথাটাও আমি ভেবে দেখেছি। শহরেই মানিকতলা বলে একটা পাড়া আছে। সেখানে নীলু দত্ত নামে আছে আমার এক ব্যবসায়ী বন্ধু। লোকটা ঘোরতর পৌত্তলিকতাবিরোধী, তার উপর আবার আমার মতই প্রায়ই প্রভুর কাছে স্বপ্নাদেশ পেয়ে থাকে। সেদিন আপনার জন্য বাড়ি ঠিক করবার উদ্দেশে তার কাছে গিয়ে শুনলাম যে, সে রাত্রিবেলাতে স্বপ্ন দেখেছে প্রভু যেন বলছেন, ওরে বাছা, মাঠের মধ্যে হারিয়ে ফেলেছি আমার এক অবোধ মেষ-শিশু, শীগগির তাকে খুঁজে বাড়িতে নিয়ে আয়। এই স্বপ্নাদেশের অর্থ সে খুঁজে পাচ্ছিল না, এমন সময় আমি আপনার জন্য বাড়ির প্রসঙ্গ তুললাম, অমনি সে বলে উঠল—এই তো পাওয়া গেছে স্বপ্নের অর্থ। তবে পাদ্রী কেরী সাহেবই হচ্ছে সেই হারানো মেষ-শিশু! অবশ্য নিয়ে আসতে হবে তাকে আমার ঘরে।
তখন নীলু বলল–বলে চলে রাম বসু-মানিকতলায় আমার একটি বাড়ি আছে, সেটিতে নিয়ে এসে রাখ ডাঃ কেরীকে।
ভাড়া?
সর্বনাশ! প্রভু যাকে আদেশ দিয়ে পাঠিয়েছেন, তার কাছ থেকে নেব ভড়া!–এই বলে সে কাটস হিজ টাং–কি না, জিভ কাটে।
কেরী আঁতকে উঠে বলে কাটস হিজ টাং–! কেন? অ্যাঙ অল ফর নথিং!
টমাস বুঝিয়ে দেয় বাংলা ইডিয়মের অর্থ, বলে, ওর মধ্যে কাটাকাটি রক্তপাত কিছুই নেই।
কেরী আশ্বস্ত হয়, বলে—তবে সেই কথাই ভাল, একদিন ভক্ত নীলুকে নিয়ে এস, বাড়ির ব্যাপারটা শীঘ্র স্থির করে ফেলা যাক—কারণ তোমাদের যখন সকলের ইচ্ছা টমাস মনে করিয়ে দেয়—আর প্রভুরও যখন আদেশ–
কেরী বাক্য শেষ করে কলকাতা শহরেই ধর্মপ্রচারের কেন্দ্র স্থাপন করা যাক।
রাম বসু বলে ওঠে, প্রভু, তোমার কৃপায় এখানে নতুন জেরুজালেম প্রতিষ্ঠিত হবে।
মনে মনে বলে, মা কালী, তোমার আশীর্বাদে ওদের খ্রীষ্ট আর খৃষ্টানির নিকুচি করে ছাড়ব! তুমি একটু সবুর করে দেখ না মা, কি হেনস্তা ওদের করে ছাড়ি।
কলকাতায় প্রচারকেন্দ্র করবার আরও কত সুবিধা যখন সে বোঝাতে উদ্যত হবে, তখন হঠাৎ ফেলিক্স ছুটে এসে বলল, বাবা, শীগগির এস, মা মূৰ্ছা গিয়েছে।
মূর্ছা গিয়েছে! তিনজনে চমকে উঠে দাঁড়ায়।
কেরী ও টমাস ব্যস্তসমস্ত হয়ে বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করে।
রাম বসু ভিতরে গেল না, বাগানের মধ্যেই পায়চারি করতে করতে মনে মনে বলতে লাগল, মা, বেটীর মূৰ্ছা আর ভাঙিও না মা, ঐ বেটীই যত ‘কু’-এর গোড়া, ওরই টানে কেরীর মন কলকাতা ছাড়বার জন্যে উসখুস করছে। দোহাই মা, মৃছা পর্যন্ত যখন নিয়েছ, আর একটু টেনে নিয়ে যাও, সকল ল্যাঠা সমূলে চুকে যাক।
এমনি কত কি বলতে বলতে সে একাকী পায়চারি করতে লাগল।
.
১.১৫ কেটির কি হল?
কেরী ও টমাস ঘরে ঢুকে দেখল যে, ডরোথি কৌচের উপর মৃর্ভূিত হয়ে পড়ে আছে, লিজা তার নাকের কাছে ধরে রয়েছে স্মেলিং সল্ট-এর শিশি, আয়া প্রকাণ্ড একখানা পাখা দিয়ে মাথায় বাতাস করছে। আর জন অদূরে চেয়ারের উপর মাথায় হাত দিয়ে বিষণ্ণ মুখে উপবিষ্ট। বুড়ো জর্জ স্মিথ হতবুদ্ধি হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, কেরীকে দেখবামাত্র দৌড়ে এসে বলল, ডাঃ কেরী, আমি নিতান্ত দুঃখিত যে এমন অঘটন ঘটল।
কেরী বলল, আপনি দুঃখিত হবেন না, ডরোথির মাঝে মাঝে এমন হয়ে থাকে, এখনই সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু কেটিকে দেখছি না কেন? তার উচিত ছিল এসে সেবা করা, সে জানে এ রকম সময়ে কি করতে হয়।
কেটির নাম শুনে জন উঠে নীরবে কক্ষ পরিত্যাগ করে বেরিয়ে গেল। জর্জ স্মিথ বলল, তারই জন্যে এ বিপদটি ঘটেছে। আপনি পাশের ঘরে আসুন, সব বলছি।
বিস্মিত কেরী ও টমাস জর্জকে অনুসরণ করে পাশের ঘরে গেল। কেরী বলল আমি খুব বিস্মিত ও উদ্বিগ্ন, কি হয়েছে খুলে বলুন।
কেটি ও জন চাঁদপাল ঘাটেই পরস্পরকে আপনার বলে চিহ্নিত করে নিয়েছিল আর তার পর থেকে দিবারাত্রির অনেকটা সময় একত্র যাপন করত। ঘাট থেকে ঘরে আসবার পথে জন প্রতিশতি দিয়েছিল যে, কেটিকে নিয়ে সুন্দরবনে বেড়াতে যাবে আর সুন্দরী গাছের বনের অনুবাদ করে জন তাকে শুনিয়েছিল যে ফরেস্ট অব বিউটিফুল উইমেন’। জন প্রতিশ্রুতি ভোলে নি। প্রত্যহ সকালে ব্রেকফাস্টের পরে দুজনে ঘোড়ায় চেপে বনের ভিতরে ঢুকে পড়ত, ফিরত সন্ধ্যার আগে, সঙ্গে নিত ডিনারের জন্য কিছু খাদ্য আর আত্মরক্ষার জন্য বন্দুক।
লিজা বলত, কি জন, বনটা কেমন লাগছে? জন বলত, প্রায় ইডেন উদ্যানের মত। কৃত্রিম বিস্ময়ে লিজা বলে উঠল, কি সর্বনাশ।
