তার পরে চীকে কাছে ডেকে জিজ্ঞাসা করে, মেয়েটাকে নিয়ে কি করবে ভাবছ?
হুজুর, শাস্ত্রে আছে, চিতা থেকে যে পালিয়েছে তাকে চিতায় সমর্পণ করতে হয়।
মোতি রায় বলে, শাস্ত্রে যা খুশি থাকে থাকুক, মেয়েটাকে আমাকে দিতে হবে।
তার পরে একটু থেমে বলে, তোমার কথা শুনে মনে হয়েছে, মেয়েটা খুবসুরত।
তার পরে আবার একটু থেমে বলে, চণ্ডী, শাস্ত্রের মর্যাদা রাখবার জন্যে কেউ এত কষ্ট স্বীকার করে না। তোমার উদ্দেশ্য তুমি জান, আমার উদ্দেশ্যে তোমাকে বললাম। আমার কাশীপুরের বাগানবাড়িটা খালি পড়ে আছে, মেয়েটা সেখানে দিব্যি থাকবে।
হুজুরের কথার উপরে কি কথা বলতে পারি–তাই হবে।
তার পর মৃত্যুঞ্জয়ের দিকে তাকিয়ে বলে, কি বল মিত্যুঞ্জয়, মেয়েটার একটা হিল্লে হয়ে গেল।
কলকাতার বাবুসমাজের সঙ্গে মৃত্যুঞ্জয়ের হালে পরিচয়, সে কি বলবে ভেবে পেল না।
মোতি রায় বলে, যাও চণ্ডী, মেয়েটাকে নিয়ে এসে একেবারে বাগবাজারের ঘাটে নামাবে।
চণ্ডীরা পরদিন ভোরে ছিপযোগে শ্রীরামপুরে রওনা হয়ে যায়, সঙ্গে মোক্ষদা বুড়িকে নিতে ভোলে না; বলে, চল মাসি, এবারে বাড়ি ফেরা যাক।
.২১-২২ রেশমী ও রাম বসু
রেশমী, কি করতে যাচ্ছিস ভাল করে ভেবে দেখ।
কায়েৎ দা, ভাল করে না ভেবে কি এ-পথে পা বাড়িয়েছি?
না, তুই সব দিক চিন্তা করবার অবকাশ পাস নি। পৈতৃকধর্ম ত্যাগ করা তো কেবল ব্যক্তিগত ব্যাপার নয়, এক মুহূর্তে তোর আত্মীয়স্বজন ধর্ম দেশ সব পর হয়ে যাবে।
আমি পর মনে না করলে পর হবে কেন?
পাগল, সংসারের তুই কতটুকু বুঝিস? সংসারে সম্বন্ধ যে দু পক্ষকে নিয়ে, অপর পক্ষ যদি আপন মনে না করে তবে তুই ওর হলি বইকি!
কেন, আমি ঘরে বসে তাদের আপন ভাবব।
পাগল! কথা শোন একবার বলে হাসে রাম বসু, তার পর আবার বলে, দশটা ঘর মিলে যে সমাজ। তুই যদি একঘরে হয়ে রইলি তবে তোর সমাজ রইল কোথায়?
যাদের ঘরে যাচ্ছি তারাই হবে তখন সমাজ। জব চার্নকের কি ব্রাহ্মণী পত্নী ছিল না?
কথাটা শুনেছিল সে জনের কাছে।
সেই ব্রাহ্মণী পত্নীকে তাদের সমাজ কি স্বীকার করেছিল? করে নি। দেখ, এদেশের লোকের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আমি মিশেছি সাহেব সমাজে। ওরা কখনও আমাদের আপন মনে করতে পারবে না।
বিয়ে করলেও নয়?
না, বিয়ে করলেও নয়। ওরা জনকে আপন মনে করবে, তোকে মনে করবে অবান্তর।
মিঃ স্মিথ তো অন্যরকম কথা বলে।
বিয়ের আগে অনেকেই অনেক রকম কথা বলে, সে-সব কথার বিশেষ অর্থ নেই।
রেশমী চুপ করে থাকে।
রাম বসুর সংশয় ও প্রশ্ন তার মনের মধ্যেও এ কয়দিনে উঠেছে, মীমাংসা খুঁজে পায় নি। এ কয়দিনে তার মনের অনেকগুলি সূক্ষ্ম প্রচ্ছন্ন শিকড়ে টান পড়ে সমস্ত সত্তা চড় চড় করে উঠেছে। তার অনতিদীর্ঘ অতীত জীবন মোহময় করুণাময় অশ্রু ও সৌন্দর্যময় মূর্তি ধরে বারংবার সম্মুখে এসে দাঁড়িয়েছে। জোড়ামউ পল্লীর সমস্ত দৃশ্য অপূর্ব সৌন্দর্যে ভূষিত হয়ে দেখা দিয়েছে, দেখা দিয়েছে বাল্য-সঙ্গিনীর দল, দেখা দিয়েছে বুড়ি দিদিমা, এমন কি এক-আধবারের জন্য মালচন্দনে সজ্জিত টোপর-পরা একটি কঙ্কালসার মুখও উদিত হয়েছে তার মনের মধ্যে। যখন মনটা বিচলিত হওয়ার মুখে, তখনই মনে পড়ে গিয়েছে লিজার লাঞ্ছনা, ছদ্মবিনয়ের ভৎসনা, এ বিবাহ কিছুতেই হতে দেবে না বলে তার প্রতিজ্ঞা, সেই সঙ্গে মনে পড়েছে, জনের করুণাসুন্দর আর্ত তৃষিত অসহায় মুখ। তখনই সে জোর করে মনকে জপিয়েছে, না না, জন আমার বর, জনের ঘর আমার ঘর।
রেশমীকে নীরব দেখে রাম বসু বলে, না হয় আর দিন দুই সময় নে ভাল করে ভেবে দেখবার জন্যে, কাল না হয় ধর্মান্তর-গ্রহণ স্থগিত থাক।
রেশমী দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বলে, না কায়েৎ দা, আর বাধা দিও না, যা হওয়ার শীগগির ঘটে যাক।
শীগগির ঘটে যাওয়াটাই কি সব সময়ে কাম্য? শাস্ত্রে বলে, অশুভস্য কালহরণম্।
কিন্তু এটা কেন অশুভ তা এখনও বুঝতে পারলাম না তো!
সেইজন্যেই তো বলছি, রেশমী, আর দুটো দিন সময় নে।
রেশমী জানে তা অসম্ভব। প্রথম, জন রাজী হবে না। তার পরে অতিরিক্ত দুটো দিন প্রতিহিংসাপরায়ণ লিজার হাতে এগিয়ে দেওয়া কিছু নয়, অনেক কিছু করে ফেলতে পারে সে কিছু এসব কথা রাম বসু বুঝবে না, তাই সে চুপ করে থাকে।
জন ও রেশমী এসে পৌঁছামাত্র সাহেবের দল এমনভাবে তাদের হেঁকে ধরল যে একটুখানি নিরিবিলি পায় নি রেশমীকে রাম বসু। অবশেষে কেরীর কৃপাতে জুটল সেই অবসর। কেরী বলল, মুন্সী, তুমি সরল বাংলায় রেশমীকে বুঝিয়ে দাও খ্রীষ্টধর্মের মহিমা।
রাম বসু বলল, সকাল থেকে তো সেইজন্যেই ওকে একলা পাওয়ার চেষ্টা করছি।
তবে আর বিলম্ব কর না, ওকে নিয়ে একলা বস তোমার ঘরে, কাল দীক্ষা, আজ ওকে তৈরি করে তোল।
রাম বসু রেশমীকে নিজের ঘরে নিয়ে এসে তৈরি করে তুলছিল।
এমন সময়ে এক ব্যক্তি এসে উপস্থিত হল। রেশমী দাঁড়িয়ে উঠে বলল, এ কি মৃত্যুঞ্জয় দাদা, তুমি?
হাঁ রে রেশমী, আমি।
হঠাৎ এখানে?
তোর বুড়ি দিদিমা কি স্থির হয়ে থাকতে দেয়, মুখে এক বুলি, নিয়ে চল আমাকে রেশমীর কাছে। কেঁদে কেঁদে বুড়ি দুই চোখ অন্ধ করে ফেলল। বুডির তাড়ায় ঠিক থাকতে না পেরে এলাম কলকাতায়, সেখানে এসে অনেক খোঁজাখুঁজি করে জানলাম তুই শ্রীরামপুরে এসেছিস, এলাম বুড়িকে নিয়ে, ভাগ্যে তোর দেখা পেলাম, নইলে আবার…
