সুধা সুনীতি আর বিনু একধারে বসে খাচ্ছিল। বিনু শুনতে পেল, চাপা গলায় সুনীতি সুধাকে বলছে, দাদু তোর দিকে কেমন করে যেন তাকাচ্ছে।
মুখ নিচু করে সুধা বলল, তাকাগ গে।
সেই বাঁদরটা কোথায় গেছে জানিস?
ঠোঁট উলটে সুধা বলল, জানতে বয়ে গেছে।
মুখ টিপে, সুর টেনে টেনে সুনীতি বলল, তাই নাকি?
হ্যাঁ হ্যাঁ, তাই।
এই সময় স্নেহলতা বলে উঠলেন, সত্যিই তো, ছেলেটা গেল কোথায়? রোজ দু’বেলা হাজিরা দিচ্ছিল। হঠাৎ হল কী? বলতে বলতে গলা চড়িয়ে ডাকতে লাগলেন, যুগল, যুগল–
আশেপাশে কোথাও ছিল যুগল। ছুটতে ছুটতে সামনে এসে দাঁড়াল, কী ক’ন ঠাউরমা?
হিরণদের বাড়ি একবার যা, ওকে সঙ্গে করে নিয়ে আসবি।
যুগল তক্ষুনি ছুটল।
এরপর সুজনগঞ্জের হাটের কথা উঠল, লালমোরের কথা হল, কালকের সেই মজার ঢেঁড়াটার কথা নিয়ে অনেক হাসাহাসি চলল। এ সবের ফাঁকে হেমনাথ টুক করে একবার বললেন, ভাবছি, আমিও একটা ঢেঁড়া দেব কিনা।
হাসতে হাসতে থমকে গেলেন স্নেহলতা। কিছু একটা আন্দাজ করেছেন তিনি। তীক্ষ্ণ দ্রুকুটিতে স্বামীকে বিদ্ধ করতে করতে বললেন, তুমি আবার কিসের ঢেঁড়া দেবে?
এখনই শুনবে?
এখনই শুনব।
নির্ভয়ে বলি?
খালি প্যাকনা (ন্যাকামো)।
হেমনাথ বললেন, ঢেঁড়াটা হবে এইরকম। জেলা ঢাকা, থানা মুন্সিগঞ্জ, শহর রাজদিয়ার শ্ৰীহেমনাথ মিত্রের বড় বিপদ। কী বিপদ? না চল্লিশ বছর ঘর করার পরও সে তার বউর মন পায় নি। আপনারা জেনে রাখুন–মিঞা ভাইরা, হিন্দু ভাইরা–হেমকর্তার ধর্মপত্নীর মন অন্য পুরুষে মজেছে।
কথাটা শেষ হতে না হতেই হাসির ধুম পড়ে গেল। অবনীমোহন আর সুরমা অবশ্য মুখ টিপে হাসছেন, ভেতরের উচ্ছ্বসিত কৌতুকটাকে বেরিয়ে আসতে দিচ্ছেন না। সুধা সুনীতি কিন্তু হেসে একেবারে গড়িয়ে পড়ছে। বিনু প্রায় কিছুই না বুঝে আর সবার দেখাদেখি বিজ্ঞের মতো হাসছে।
আড়ে আড়ে সুধা সুনীতির দিকে একবার তাকিয়ে হেমনাথ বললেন, ঢেঁড়ার কথা কিন্তু শেষ হয় নি, আরও একটু আছে।
হাসতে হাসতেই সুধা সুনীতি বলল, আরও কী?
হেমনাথ বলতে লাগলেন, মিঞা ভাইরা, হিন্দু ভাইরা–সাকিন রাজদিয়ার হেমকর্তা এই বিপদে তো চুপ করে বসে থাকতে পারে না। তাই সে ঠিক করেছে পুরনো বউকে তালাক দিয়ে আগামী অঘ্রাণ মাসে একজোড়া তরুণী ভার্যা ঘরে তুলবে। তাদের একজনের নাম সুধামুখি, আরেক জনের। নাম সুনীতিলতা।
স্নেহলতা মধুর কৌতুকময় হেসে বললেন, ঢেঁড়াতে আমার আপত্তি নেই।
হেমনাথ বললেন, প্রস্তাবটা তা হলে অনুমোদন করছ?
করছি।
এদিকে সুধা সুনীতির হাসি থেমে গিয়েছিল। তারা ঝংকার দিয়ে উঠল, বুড়োর ভার্যা হতে আমাদের বয়ে গেছে।
করুণ মুখে হেমনাথ বললেন, বুড়ো বলে দাগা দিলে দিদিরা! সত্যিই কিন্তু আমি বুড়ো হই নি। এই দেখ, একটাও দাঁত পড়ে নি, মাড়ি কী মজবুত!
সুধা বলল, বুড়ো তো হন নি, তবে চুল সাদা হল কী করে?
বয়েসের জন্যে না রে দিদি, কুপিত বায়ুর দোষে।
আর চামড়া কোঁচকালো কেন?
হজমের গোলমালে।
গল্পে গল্পে, হাসাহাসি আর লঘু কৌতুকে সকালটা কাটতে লাগল। খাওয়ার পালা যখন শেষ হয়ে এসেছে সেই সময় বাইরে বাগানের দিক থেকে একটা গলা ভেসে এল, জেঠামশায়– জেঠামশায়–
হেমনাথ ঘুরে বসে সাড়া দিলেন, কে রে?
আমি শিশির!
আয় আয়- হেমনাথ ব্যস্ত হয়ে উঠোনে নামলেন।
একটু পর শিশিররা ভেতরে চলে এলেন। দেখা গেল, শিশির একাই নন, তার সঙ্গে স্মৃতিরেখা, রুমা ঝুমা এবং তাদের মামা আনন্দও এসেছে।
শিশির বললেন, আপনার বৌমাদেরও দিয়ে এলাম।
আনবিই তো। আনতেই তো বলেছিলাম। এস, এস সবাই–
এদিকে বারান্দার আরেক কোণে একটা মজার ব্যাপার চলছিল। বিনু দেখতে পেল, আনন্দকে দেখিয়ে সুধা সুনীতিকে বলছে, দিদি, সেই ভদ্রলোক এসেছে। যার দিকে
ভুরু কুঁচকে সুনীতি বলল, যার দিকে কী?
ঠোঁটের ফাঁকে প্রগলভ একটি হাসি টিপে রেখে সুধা বলল, যার দিকে তাকিয়ে সেদিন তুই একেবারে মুগ্ধ–মুগ্ধ–মুগ্ধ—মুগ্ধ–
কথা শেষ হবার আগেই সুধার পিঠে দুম করে কিল পড়ল।
হেমনাথ বললেন, এখানে না। চল ঘরে গিয়ে বসি—
শিশিরদের সঙ্গে নিয়ে সামনের বড় ঘরখানায় গিয়ে ঢুকলেন হেমনাথ। স্নেহলতা সুরমা অবনীমোহনরাও পিছু পিছু এলেন। সুধা সুনীতি ঝিনুক কিংবা বিনু বাইরে বসে থাকল না, তারাও এল।
স্নেহলতা আর শিবানী শিশিরকে চেনেন, স্মৃতিরেখাকে চেনেন, রুমা ঝুমাকে চেনেন। না চিনে যাবেন কোথায়? এই রাজদিয়ারই তো ছেলে শিশির, ছেলেবেলা থেকে তাকে দেখে আসছেন। চাকরির খাতিরেই না হয় ক’বছর দেশছাড়া শিশির।
স্নেহলতা এবং শিবানী আনন্দকে চিনতেন না, হেমনাথ তাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন। সুরমা কাউকেই চেনেন না, তার সঙ্গেও ওর আলাপ করিয়ে দেওয়া হল। আর অবনীমোহনদের সঙ্গে শিশিরদের তো আগেই আলাপ হয়ে গেছে।
এ ঘরে ঢালা তক্তপোশ পাতা। হেমনাথ বললেন, বসো সব, বসো–
সবাই বসলে শিশির স্নেহলতা আর শিবানীর উদ্দেশে বললেন, কেমন আছেন পিসিমা? কেমন আছেন জেঠাইমা?
শিবানী বললেন, ভাল আছি বাবা। তোরা সবাই ভাল তো?
শিশির বললেন, হ্যাঁ।
স্নেহলতা বললেন, আমি কিন্তু ভাল নেই শিশির।
ঈষৎ উদ্বেগের সুরে শিশির শুধোলেন, কেন?
ছেলেরা যদি দেশের বাড়ি ছেড়ে দূরে গিয়ে থাকে, মা-জেঠিরা ভাল থাকতে পারে না।
মুখখানা কাচুমাচু করে শিশির বললেন, কী করব, চাকরি। চাকরির জন্যেই দূরে গিয়ে থাকতে হয়। নইলে আপনাদের ছেড়ে কলকাতায় থাকতে কি আমার ভাল লাগে?
