এক পলক ঝিনুককে দেখে নিয়ে আবার চোখ বুজে সামনের দিকে তাকাল বিনু, এবং হেমনাথের সঙ্গে সূর্যস্তব আবৃত্তি করতে লাগল। আর পেছনে ঝিনুকের গলার সেই ডাকটা একটানা শোনা যেতে লাগল।
সূর্যবন্দনা শেষ হতে হতে আলোর আভা ফুটে গেল। সারারাত সূর্যটা কোথায় ছিল, কে জানে। দিগন্তের তলা থেকে সোনার গোল ঘটের মতো হঠাৎ লাফ দিয়ে উঠে এল। তার উদ্দেশে প্রণাম জানিয়ে হেমনাথ ঘুরে দাঁড়ালেন। বললেন, কি রে, অত ডাকাডাকি কেন?
ভারী গলায় ঝিনুক বলল, তোমার সঙ্গে আমি কথা বলব না। কক্ষনো না, কিছুতেই না।
কেন? কী হয়েছে?
না না, কথা বলব না। বলেই দুপদাপ পা ফেলে ঘরের দিকে চলল ঝিনুক। বোঝা গেল, খুব রাগ করেছে সে।
হেমনাথের দেখাদেখি সূর্যপ্রণাম করে বিনুও ঘুরে দাঁড়িয়েছিল। এই সকালবেলায় ঝিনুকের এত রাগের কারণ সে বুঝতে পারল না। অবাক চোখে তাকিয়ে থাকল বিনু।
লম্বা পায়ে ছুটে গিয়ে ঝিনুককে ধরে ফেললেন হেমনাথ, তারপর টপ করে একেবারে কোলে তুলে নিলেন।
ঝিনুক সমানে হাত-পা ছুঁড়তে লাগল, ছেড়ে দাও, আমায় ছেড়ে দাও বলছি। তোমার কোলে আমি উঠব না, তোমার সঙ্গে কথা বলব না।
হেমনাথ ছাড়লেন না। বরং কোলের ভেতর ঝিনুককে চেপেচুপে রেখে হেসে হেসে ছড়া কাটতে লাগলেন :
রাগ করছেন রাগুনি,
রাঙা মাথায় চিরুনি,
বর আসবে এক্ষুনি
নিয়ে যাবে তক্ষুনি।
ঝিনুকের দাপাদাপি আর হাত-পা ছোঁড়া আরও বেড়ে গেল। অনেক কষ্টে বুঝিয়ে সুঝিয়ে গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে তাকে শান্ত করলেন হেমনাথ। বললেন, সকালবেলায় ঝিনুক দিদির এত রাগ কেন, এবার বল দিকি?
ঝিনুক বলল, তুমি আমায় ডেকে তোল নি কেন?
কখন রে?
একটু আগে।
তখন তুই ঘুমোচ্ছিলি যে—
কোঁকড়ানো চুল আঁকিয়ে ঝিনুক বলল, উঁহু-উঁহু–
হেমনাথ সবিস্ময়ে বললেন, ঘুমোচ্ছিলি না!
না। ঝিনুক বিনুকে দেখিয়ে বলতে লাগল, তুমি ওকে ডাকলে, আমাকে ডাকলে না।
ওকে ডেকেছি, তুই জানিস?
হ্যাঁ, জানি। একশ’ বার জানি।
জানিস যদি, উঠে পড়লি না কেন?
উঠব না, কিছুতেই না। ঝিনুক বলতে লাগল, ওকে ডেকে তুলবে আর আমাকে ডাকবে! না ডাকলে উঠব কেন?
এবার ব্যাপারটা খানিক আন্দাজ করতে পারলেন হেমনাথ। চোখ বড় বড় করে সকৌতুকে বললেন, বিনু দাদাকে ডাকলে তোকেও ডাকতে হবে, এই তো?
হ্যাঁ।
বেশ, কাল থেকে ভোরবেলা উঠবি। ডাকামাত্র উঠে পড়তে হবে।
আচ্ছা।
একটু নীরবতা। তারপর ঝিনুকের চিবুক আঙুল দিয়ে ঠেলে তুলে হেমনাথ বললেন, পেট বোঝাই তোমার হিংসে।
দেখতে দেখতে রোদ উঠে গেল। খানিক আগেও আমবাগান, পুকুর, ধানবন, সুদূর আকাশ সব কিছু ঝাঁপসা হয়ে ছিল। সারাটা বর্ষার জলে ধুয়ে ধুয়ে এই আশ্বিনে আকাশখানি বড় উজ্জ্বল, বড় ঝকমকে। এক দিগন্ত থেকে আরেক দিগন্ত পর্যন্ত নীল চাদোয়া টাঙানো রয়েছে।
.
এ বাড়িতে এখন আর কেউ ঘুমিয়ে নেই। অবনীমোহন সুরমা সুধা সুনীতি, সবাই উঠে পড়েছে।
পুবের ঘরের বারান্দায় সিঁড়ি পেতে বসে এই মুহূর্তে সকালবেলার খাওয়ার পর্ব চলছে।
খেতে খেতে হেমনাথ বললেন, কাল রাত্তিরে ঝিনুকের কথা কী যেন বলছিলে, ঠিক খেয়াল
করিতে খেতে হেমনাথ লড়ি পেতে বসে এই মুন্ত সুরমা সুধা সুনীতি,
স্নেহলতা বললেন, ও এখন কিছুদিন এখানে থাকবে।
বেশ তো।
ঝিনুক বাড়ি থাকলে ভবতোষ কোথাও বেরুতে টেরুতে পারে না। বেরুলেও সঙ্গে সঙ্গে নিয়ে ঘুরতে হয়। ছেলেটা ভারি মুশকিলে পড়ে গেছে।
একটু চুপ করে থেকে হেমনাথ বললেন, কাল কখন ঝিনুককে দিয়ে গেছে?
স্নেহলতা বললেন, তোমরাও হাটে বেরিয়েছ, ওরাও এসেছে।
ভবতোষ আর কী বললে?
কী ব্যাপারে?
বৌমার কোনও খবর আছে?
না। ও মেয়ে সংসার করবার মেয়ে নয়। চলে যে গেছে, সে একরকম ভালই হয়েছে।
খানিক গাঢ় বিষাদ আশ্বিনের এই ঝলমলে সকালটাকে যেন নিমেষে মলিন করে দিল।
কিছুক্ষণ নীরবতা। তারপর একেবারে ভিন্ন প্রসঙ্গে চলে গেলেন হেমনাথ। সুরমার দিকে ফিরে বললেন, কদিন যেন এখানে এসেছিস–
সুরমা বললেন, তিন চার দিন।
বলতে নেই, এই ক’দিনে তোকে বেশ ভাল দেখাচ্ছে। সেই ফ্যাকাসে রুগ্ণ ভাবটা নেই। স্টিমার থেকে যখন নামলি মুখখানা এই এতটুকু। গায়ে রক্ত নেই, হাঁটতে গিয়ে হাঁপিয়ে পড়ছিলি।
স্নেহলতা এই সময় ঝংকার দিয়ে উঠলেন, বলতে নেই বলতে নেই করে তো সবই বলে ফেললে। ভাল ভাল বলে রোগা মেয়েটার দিকে নজর দিতে হবে না।
হেমনাথ হেসে ফেললেন, বেশ, আর বলব না। নজরও দেব না।
সুরমা বললেন, কেন বলবে না, নিশ্চয়ই বলবে। ভাল হলে ভাল বলবে না? সত্যি, আগের চাইতে কিছুটা সুস্থ লাগছে।
হেমনাথ বাড়িয়ে কিছু বলেন নি। সামান্য কয়েক দিনে সুরমার চেহারায় সোনার কাঠির ছোঁয়া লেগে গেছে যেন। তাকে রীতিমত উজ্জ্বল আর সজীব দেখাচ্ছে। পরিবর্তনটা চোখে পড়ে।
অবনীমোহন এতক্ষণ চুপ করে খেয়ে যাচ্ছিলেন। এবার বললেন, রাজদিয়া সত্যি সত্যি টনিকের কাজ করতে শুরু করেছে।
আসবার সময় স্টিমারে টনিকের কথা অবনীমোহন বলেছিলেন। সুরমা হাসলেন, কিছু বললেন না।
হঠাৎ হেমনাথের কী মনে পড়ে যেতে তাড়াতাড়ি বলে উঠলেন, ভাল কথা—
স্নেহলতা জিজ্ঞাসু চোখে তাকালেন, কী?
দু’দিন ধরে সেই বাঁদরটাকে তো দেখছি না। কোথায় গা ঢাকা দিলে সে?
কার কথা বলছ?
কার আবার, আমার প্রতিদ্বন্দ্বী সেই হিরণ ছোঁড়ার। বলে আড়ে আড়ে সুধার দিকে একপলক তাকিয়ে নিলেন।
