লারমোর কোথায় থাকেন, বিনুর একবার ইচ্ছে হল জিজ্ঞেস করে জেনে নেয়। কী ভেবে আর করল না।
লারমোর এবার হেমনাথের দিকে ফিরলেন, সেই কথাটা কিন্তু ভুলে যেও না হেম।
হেমনাথ জিজ্ঞাসু চোখে তাকালেন, কোনটা বল তো?
ওই যে তখন বললাম, ওষুধ টোষুধ সব ফুরিয়ে এসেছে। দু’চারদিনের ভেতর কিছু যদি আনিয়ে না দাও খুব মুশকিল হবে। বাসাইলের চন্দ্র ভূঁইমালী, সিরাজদীঘার ফণী শেখ, হাসাড়ার মানিক মিঞা, রসুনিয়ার গোঁসাইদাস সা, আরও কতজনের নাম বলব? সবারই কঠিন অসুখ। ঠিকমতো ওষুধ না পড়লে তোকগুলো মরে যাবে।
হেমনাথ বললেন, ওষুধের একটা লিস্ট করে দিও। পরশু হিরণকে দিয়ে আনিয়ে দেব। কি রে হিরণ, পরশু একবার ঢাকায় যেতে পারবি না?
হিরণ কাছেই ছিল। বলল, পারব।
তাহলে এখন চলি।
বিনুরা যেখানে দাঁড়িয়ে আছে সেটা ভেতর-বাড়ির উঠোন। পুবদুয়ারী ঘরটার ওধারে যে মস্ত উঠোনটা তার একধারে অন্ধকারে সেই ফিটনটা দাঁড়িয়ে আছে। লারমোর সেদিকে চলতে লাগলেন।
হেমনাথ যুগলকে ডেকে বললেন, একটা হেরিকেন নিয়ে আয়।
হেরিকেন এলে সবাই ওধারের উঠোনের দিকে গেল। পেছনে রান্নাঘরের বারান্দা থেকে স্নেহলতা চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বললেন, কাল থেকে কিন্তু এ বাড়িতে খাচ্ছেন।
ঘাড় ফিরিয়ে হাসতে হাসতে লারমোর বললেন, নিশ্চয়ই।
রান্নাবান্না করে ভাত-তরকারি যদি আবার ফেলতে হয় তা হলে কিন্তু কপালে দুঃখ আছে সাহেব।
আমি শিরচ্ছেদের জন্য প্রস্তুত সম্রাজ্ঞী।
এধারের উঠোনে এসে দেখা গেল, ফিটনের তলায় বুড়ো দুর্বল ঘোড়াটা নির্জীবের মতো দাঁড়িয়ে আছে। লারমোর ডাকলেন, গোপাল–এই গোপাল–
ঘোড়াটা কান খাড়া করল।
লারমোর বললেন, একটু কষ্ট করে চল দাদা। একেবারে বাড়ি গিয়েই ঘুমোস।
ঘোড়াটা আস্তে আস্তে চোখ মেলে।
বিনু অবাক চোখে তাকিয়ে ছিল। ঘোড়ার যে আবার নাম থাকতে পারে, তার সঙ্গে কেউ যে। কথা বলে, বিনুর কাছে এসব পরম বিস্ময়কর অভিজ্ঞতা। সে বলল, তোমার কথা ঘোড়াটা বুঝতে। পারে লালমোহন দাদু?
অন্যমনস্কর মতো লারমোর বললেন, পারে বৈকি। পনের যোল বছর আমার কাছে রয়েছে, দু’টো কথা বুঝতে পারবে না? বলেই আবার ঘোড়াটার দিকে ফিরলেন, তোর নিশ্চয়ই খিদে পেয়ে গেছে। দাঁড়া চাট্টি ছোলা দিই।
ফিটনের ভেতর থেকে ছোলাভর্তি একটা থলে বার করে এনে মুখের সামনে ধরলেন লারমোর। ঘোড়াটা মুখ ফিরিয়ে নিল, অর্থাৎ খাবার ইচ্ছে নেই।
লারমোর বললেন, আমার হাতে তুই তো আবার খাস না। চল কাদেরই তোকে খাওয়াবে’খন। ছোলার থলেটা ফিটনের ভেতর রেখে ঘোড়াটাকে গাড়ির সঙ্গে জুতে চালকের জায়গায় গিয়ে বসলেন তিনি।
হিরণ হঠাৎ বলে উঠল, আমিও তোমার সঙ্গে যাব লালমোহন দাদু। আমাদের বাড়ির সামনে একটু নামিয়ে দিয়ে যেও।
লারমোর ডাকলেন, আয়—
হিরণ গাড়ির মাথায় উঠে লারমোরের পাশে গিয়ে বসল।
হেমনাথ নিচে থেকে বললেন, তোর রেকর্ড টেকর্ড, গ্রামোফোন সব পড়ে রইল যে—
হিরণ বলল, থাক। কাল এসে নিয়ে যাব।
একটু পর ঝুমঝুম ঘুন্টি বাজিয়ে ফিটন চলতে শুরু করল। দেখতে দেখতে বাগানের ঝুপসি অন্ধকারে লারমোররা অদৃশ্য হয়ে গেলেন।
হিরণরা চলে গেলে বাইরের উঠোন থেকে ভেতর-বাড়ির দিকে ফিরে আসছিল সবাই। হঠাৎ ফিসফিসানির মতো একটা আওয়াজ শুনতে পেল বিনু, ছুটোবাবু–দুটোবাবু
চমকে ডান ধারে তাকাতেই বিনু দেখতে পেল, যুগল তার খুব কাছে ঘন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। চোখাচোখি হতে গলা আরও নামিয়ে বলল, কাইল সুজনগুঞ্জের হাটে আপনে আমার নায়ে যাইবেন।
বিনু কিছুটা অবাক হয়ে বলল, তুমি কাল হাটে যাবে নাকি?
নিয্যস। বড়কত্তা হাটে গ্যালে তেনার লগে আমারে যাইতেই হয়। বড়কত্তায় তো লালমোহন সাহেবের নায়ে যাইব। আমি আরেকখান ছোট কোষা নায়ে যামু, আমার লগে আপনে যাইবেন। একটু থেমে কী ভেবে নিয়ে আবার বলল, বড়কত্তার লগে গ্যালে আপনেরে ছইয়ের বাইরে বইতে দিব না। চুপচাপ ভিতরে বইসা থাকতে হইব। আমার লগে গ্যালে মেলা (অনেক) মজা পাইবেন।
‘ছই’ কী, বিনু জানে না। তবু উৎসাহিত হয়ে সে বলল, আমি তোমার সঙ্গেই যাব যুগল।
কথায় কথায় একসময় তারা ভেতর-বাড়িতে ফিরে এল।
এ বাড়িতে ছোটবড় মিলিয়ে মোট আটখানা ঘর। পশ্চিমের ভিটের একখানা ঘরে সেই আশ্রিতা বিধবা দু’জন থাকে। যুগল আর করিম থাকে বাইরের দিকের দু’টো ঘরে। শিবানী থাকেন দক্ষিণের ভিটের একটা ঘরে। স্নেহলতা হেমনাথের জন্য পুবদুয়ারী বড় ঘরখানা নির্দিষ্ট। বাকি ঘরগুলো এতকাল ফাঁকাই পড়ে থাকত। অবনীমোহনরা আসার পর একটা ঘর তাকে আর সুরমাকে দেওয়া হয়েছে, আরেকটা দেওয়া হয়েছে সুধা সুনীতিকে। বিনু অবশ্য আলাদা ঘর পায় নি, হেমনাথ স্নেহলতার ঘরখানাই দখল করে বসেছে, তাদের মাঝ-মধ্যিখানে শুয়ে ঘুমোয় সে।
১.১২ কাল শুতে শুতে অনেক দেরি
কাল শুতে শুতে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল। সকাল হলেই নৌকোয় করে সুজনগঞ্জের হাটে যাবে, সেই উত্তেজনায় বাকি রাতটুকু ভাল করে ঘুমোতে পারেনি বিনু। শিয়রের দিকে একটা জানালা, বার বার তার বাইরে তাকিয়ে দেখেছে–কখন সকাল হয়, কখন সকাল হয়।
সারারাত চোখ টান টান করে থেকে ভোরের দিকে ঘুমিয়ে পড়েছিল বিনু, হেমনাথের ডাকে ধড়মড় করে উঠে বসল।
রগড়ে রগড়ে চোখ থেকে ঘুমের শেষ রেশটুকু মুছে বিনু যখন তাকাল, পুব আকাশে আলো আলো আভা ফুটেছে।
