আমাকে বলল, চলুন—
হরিশ বলল, কী হল!
বোরিং লাগছে। আচ্ছা চলি। বাই-শমিতা হাত নাড়ল।
লিফটে করে নীচে এসে আমরা গাড়িতে উঠলাম। এতক্ষণে সন্ধে নেমে গেছে। রাস্তার দুধারে কর্পোরেশনের টিউবলাইটগুলো জ্বলে উঠেছে।
মসৃণ গতিতে গাড়িটা ড্রাইভ করে নিয়ে যাচ্ছিল শমিতা। দুধার থেকে বাড়ি-ঘর দোকানপাটের, নানা দৃশ্যপট মুহূর্তে মুহূর্তে সরে যাচ্ছিল। আমি কিন্তু সে-সব, দেখছিলাম না। অন্যমনস্কর মতো শমিতার কথাই ভাবছিলাম। সেই বিকেলে থেকে ঘণ্টা দুয়েক তার সঙ্গে সঙ্গে আছি। এর মধ্যে দুজায়গায় গেছে সে। কিন্তু কোথাও বেশিক্ষণ থাকেনি। আসলে কোথায় যেন তার মধ্যে দারুণ একটা অস্থিরতা রয়েছে।
গাড়িটা সুর্কালার রোডে এলে শমিতা হঠাৎ বলল, কী ভাবছেন?
চমকে উঠলাম। চমকটা থিতিয়ে গেলে বললাম, কিছু না তো।
শমিতা হাসল, নিশ্চয়ই ভাবছিলেন। ভাবছিলেন আচ্ছা পাল্লায় পড়া গেছে।
আমি হাসলাম, কোনও উত্তর দিলাম না।
শমিতা এবার বলল, যাক গে, এখন কোথায় যাবেন বলুন—
কোথায় বলতে?
দুটো হোটেলে আমি ধারে ড্রিংক করতে পারি। আপনি যেখানে বলবেন নিয়ে যাব। বলেই হোটেল দুটোর নাম করল। দুটোই ফাইভ স্টার হোটেল। বললাম, আমার কোনও চয়েস নাই। যেখানে নিয়ে যাবেন সেখানেই যাব।
একটু ভেবে শমিতা বলল, কালকের হোটেলটাতেই চলুন
কিছুক্ষণের মধ্যে আমরা চৌরঙ্গীর সেই বিশাল মাল্টি-স্টোরিড হোটেলটায় চলে এলাম। তারপর সেভেন্থ ফ্লোরের বল রুম-কাম-বার-এ।
চারদিকে লোক গিজ গিজ করছিল। ওধারে ফ্লোর ডান্স চলছে। শমিতাকে দেখে সব টেবল থেকেই একজন দুজন করে জড়ানা গলায় চেঁচিয়ে উঠল, হোয়-য়–অন ডার্লিং
শমিতা হাত নাড়ল। অর্থাৎ কারো টেবলেই যাবে না। আমাকে নিয়ে এক কোণে একটা ফাঁকা টেবলে গিয়ে বসল। আমরা বসতে না বসতেই একটা ওয়েটার দৌড়ে এল। শমিতা বলল, দো হুইস্কি
ওয়েটার চলে গেল। আমি আন্দাজ করে নিলাম, শমিতা এখন সমানে হুইস্কি টেনে যাবে। যতক্ষণ না সে আউট হয়ে মদ্যপানটা চলবেই।
কাল এবং আজ এই দুদিন শমিতাকে দেখছি। লক্ষ্য করেছি দুটো ব্যাপারে তার দারুণ অ্যাডিকশান। এক নম্বর হল ড্রিংক, দুনম্বর জুয়া। আরো কত ব্যাপারে সে জড়িয়ে আছে, কে জানে। মনোবীণা সান্যল আমাকে যে দায়িত্ব দিয়েছেন সেটা পালন করতে হলে গ্যাম্বলিং এবং ড্রিংক থেকে শমিতাকে ফিরিয়ে আনতে হবে, কিন্তু সেটা দু-একদিনের কাজ নয়। হে মহান জনগণ, এই সব অ্যাডিকশন শমিতার রক্তের ভিতর ঢুকে গেছে। একটা কথা মনে হতে হঠাৎ উঠে দাঁড়ালাম। শমিতা অবাক হয়ে বলল, কী হল? বললাম, একটু বসুন, আমি আসছি।
আমি সোজা বার-এর কাউন্টারে চলে এলাম। বার-বয়রা এখন থেকেই খদ্দেরদের জন্যে ড্রিংক-ট্রিংক নিয়ে যাচ্ছে। এক ধারে গাবদা-গোবদা চেহারার বার-ম্যানেজার দাঁড়িয়ে ছিল; সে কাছে এগিয়ে এল, ইয়েস স্যার
আমার আসার উদ্দেশ্যটা তাকে জানিয়ে দিলাম। বললাম, এখন থেকে শমিতাকে যে ড্রিংক সার্ভ করা হবে তাতে যেন অর্ধেক জল মেশানো থাকে।
বার-ম্যানেজার বলল, কিন্তু স্যার, এটা তো ডিজ-অনেস্টি জানাজানি হলে আমাদের রেপুটেশন নষ্ট হবে।
জানাজানি হবে না। আসলে কথাটা কী জানেন, শমিতার লিভারটাকে বাঁচানো দরকার। এ ব্যাপারে প্লিজ আমার সঙ্গে একটু কো-অপারেট করুন। আমিও আপনার সঙ্গে কো-অপারেট করব। ম্যানেজারকে শমিতার লিভারের কথা বললাম। কিন্তু আদতে আমি যে ধীরে ধীরে তাকে অ্যাডিকশান থেকে সরিয়ে নেবার প্ল্যান করেছি তা বলা গেল না। কারণ সেটা বলার রিস্ক আছে। শমিতার মতো ক্লায়েন্ট চলে গেলে বিজনেসের ক্ষতি। কে আর জেনেশুনে ক্ষতিটা চায়।
ম্যানেজার বলল, আপনার কে-অপারেশনের ব্যাপারটা তো বুঝলাম না।
হাফ জল মেশালেও বিলটা আপনি ফুলই পাবেন।
থ্যাঙ্ক ইউ। কিন্তু আপনাকে আগে আর কখনও দেখেছি বলে মনে পড়ছে না। মিস শমিতা বসু আপনার কেউ হন নাকি?
দুসেকেন্ড চুপ করে থেকে বললাম, তা বলতে পারেন। আচ্ছা চলি। ড্রিংকে জল দেবার কথা মনে রাখবেন।
শমিতার কাছে ফিরে আসার কিছুক্ষণ পরেই হুইস্কি এসে গেল। এলোমেলো কথা বলতে বলতে খেতে লাগলাম। এর মধ্যে যে সব নতুন নতুন কাস্টমার আসছে তারা সবাই শমিতার দিকে হাত তুলে বলে যাচ্ছে, হ্যালো–
শমিতাও হাত তুলছে, হ্যালো
দশ পেগ হয়ে যাবার পর হঠাৎ যেন খেয়াল হল শমিতার। বলল, এটা কী হল বলুন তো?
কোনটা? আমি সোজা শমিতার চোখের দিকে তাকালাম।
দশ পেগ খাওয়া হয়ে গেল কিন্তু একটুও টিপসি লাগছে না! কী হুইস্কি সার্ভ করছে! একটুও কিক নেই! আপনি কোনও কিক পাচ্ছেন?
হে মহান জনগণ, দশ পেগ মদ্যপান করলেও আসলে শমিতা খেয়েছে পাঁচ পেগ; বাকিটা টালা ট্যাঙ্কের বিশুদ্ধ ফিলটারড় ওয়াটার। সে যা মাতাল তাতে পাঁচ পেগে কী করে কিক পাবে?
শালা ম্যানেজার মওকা বুঝে আমার হুইস্কিতেও জল মিশিয়ে দিয়েছে। আমিও মাছের জল খাওয়ার মতো ড্রিংক করতে পারি। পাঁচ পেগ হুইস্কি আমার পেটে কিঞ্চিৎ নিম্নচাপ সৃষ্টি ছাড়া আর কিছুই করতে পারেনি। কিন্তু সে কথা তো শমিতাকে বলা যাবে না। বললাম, হ্যাঁ, দারুণ কিক পাচ্ছি
এক পলক আমার দিকে তাকিয়ে হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল শমিতা, ওয়েটার–
ওয়েটার দৌড়ে এল। আমার ভয় হল, হুইস্কির ব্যাপার নিয়ে শমিতা চেঁচামেচি করবে। কিন্তু কিছুই করল না সে। শুধু বলল, জলদি বিল লাও–বিলে সই করে পাঁচ মিনিটের মধ্যে আমাকে নিয়ে হোটেলের পার্কিং জোনে চলে এল শমিতা। তাই সেই ফিয়েট গাড়িটায় আমাকে তুলে নিজে উঠল। তারপর বাইরে বেরিয়ে বলল, হোটেলে বোরিং লাগছিল। চলুন, আপনাকে একটু ওপের এয়ারে ড্রিংক করাব।
