কপাল কুঁচকি কিঙ্কিনি বলল, শিবুটা আবার কে? একে কোথা থেকে জোটালি?
বৈদর্ভী মুখ দিয়ে বিদ্রুপের আওয়াজ করে বলল, আমি কি তোদের মতো শুধু গুডবয় আর গুডগার্লদের সঙ্গে থাকি? ব্যাডদের সঙ্গেও আমার দোস্তি রয়েছে। রেলগেটের ঠেকে যাতায়াত আছে শিবুর। আমি তো আর দোকানে ঢুকে মদ কিনতে পারব না। ওই-ই এনে দেবে।
শিবু মদ আনেনি। সে বৈদর্ভীকে দিয়ে গেছে কতগুলো গাঁজাভরা সিগারেট। বলেছে, বাড়িতে মদ খেলে ঝামেলায় পড়ে যাবে দিদিভাই। মাসিমা, মেসোমশাই এসে ঠিক গন্ধ পাবে। তার থেকে এই জিনিস নাও। কোন ঝুট ঝামেলা নেই, টানার পর অ্যাসট্রে ঝেড়ে ফেলে দেবে। অথচ নেশা ডবল।
সবে একটা করে সিগারেট খাওয়া হয়েছে। প্রথম কটা টানে কাশি হয়েছে বেশি। আদ্দেক ধোঁয়াই নাক-মুখ দিয়ে ফসকে গেছে। পরের দিকে বৈদর্ভী, কিঙ্কিনি দুজনেই ম্যানেজ করেছে। নেশা ডবল না হাফ বোঝা না গেলেও, বেশ একটা ঝিম ভাব এসেছে।
বৈদর্ভীর সামনে টিভি চলছে। তবে কোনও চ্যানেলই কয়েক সেকেন্ডের বেশি স্থির নয়। কারণ বৈদর্ভী ক্রমাগত রিমোট সার্ফ করে যাচ্ছে। একটা চ্যানেলে বৈদর্ভী থমকে গেল। হিন্দি সিনেমার নাচ গান। টিভির ভলুম কম থাকায় গান তেমন করে শোনা যাচ্ছে না। ফিসফিসানির মতো লাগছে। সেদিকে তাকিয়ে বৈদর্ভী বলল, তোর হঠাৎ খুনের ইচ্ছে মাথায় চাপল কেন কিনি?
হঠাৎ কেন চাপবে? অনেকদিন ধরেই প্ল্যান করছি। সেই ছোটবেলা থেকে। আজ তোকে বলে ফেললাম।
রিভলভার দিয়েই খুন করতে হবে? অন্য কিছু দিয়ে হবে না? এই ধর ছুরি বা বিষ?
কিঙ্কিনি বাঁ হাতের কড়ে আঙুলের নখ ঘষতে ঘষতে বলল, জানি না। এমনভাবে বলছিস যেন আগেও আমি খুন করেছি আর খুনের ওয়েপন বিষয়ে আমার বিরাট এক্সপিরিয়েন্স আছে। রিভলভার দিয়ে মারলে একটা প্রেস্টিজ হয় তাই রিভলভার বললাম। বিষটি কেমন হেঁদো ব্যাপার। পুলিশ যখন আমাকে ধরে নিয়ে যাবে কাগজে ফটো বেরোবে, আমার হাতে রিভলভার। হি হি।
চ্যানেল বদলাতে লাগল বৈদর্ভী। খবরের চ্যানেলে এসে আটকে গেল। কোথাও গোলমাল হয়েছে। পরদায় ছবি দেখাচ্ছে। বাসে আগুন জ্বলছে। ছেলেমেয়েরা ছোটাছুটি করছে। কোথায় গোলমাল? নিশ্চয়ই কলকাতার কোনও কলেজে। কলেজগুলোতে আজকাল রোজ গোলমাল হয়। ভাগ্যিস সে কলকাতায় থাকে না। গোলমালে পড়তে হত। পা দুটো সামনের দিকে মেলে দিল বৈদর্ভী। মাথাটা হালকা টাল খেল। না, শিবু ব্যবস্থাটা ভালোই করেছে। জল, গেলাস, পাতিলেবুর রস কিছুই দরকার হল না। মদ খেলে সত্যি ঝুঁকি নেওয়া হয়ে যেত। এতে সে সমস্যা নেই। একটু পরে জানলা দরজা খুলে ফুল স্পিডে ফ্যান চালিয়ে দিলেই হবে। রুম স্প্রে, ধূপ তো আছেই। ঘরটা অন্ধকার করায় ঝিম ভাবটা বেশি লাগছে।
কাকে খুন করবি সে তো বলবি না, কিন্তু কেন করবি সেটা কি জানতে পারি?
কিঙ্কিনি বলল, আসলে কী জানিস বৈদর্ভী, যাকে খুন করব ভাবি তার নাম রোজই বদলে বদলে যাচ্ছে।
বৈদর্ভী হেসে ফেলল। বলল, মানে? খুনি ঠিক আছে কিন্তু টার্গেট পালটাচ্ছে?
অনেকটা তাই, এই ধর আজ তোকে খুন করতে ইচ্ছে, কাল মনে হচ্ছে, তোকে নয়, শিবুটাকে মারলে ঠিক হবে। হারামজাদাটা আমাদের একটা বাজে নেশা ধরিয়ে দিতে চাইছে। দেখবি ওই ছেলে নিজে গাঁজার পুরিয়া বেচে। তবে জিনিসটা কাজ করছে ভালো।
আর আমাকে? আমাকে কেন খুন করতে ইচ্ছে করবে?
কিঙ্কিনি উঠে বসল। মনে হচ্ছে এবার সে পায়ের নখ নিয়ে পড়বে।
তুই খুব বিশ্রী একটা কাজে আমাকে জড়িয়ে ফেলেছিস। যদিও পুরো দোষটা তোর নয়। আমি ইচ্ছে করে খারাপ হব ভেবে ঝাঁপ দিয়েছিলাম, তারপর দেখলাম ব্যাপারটা মন্দ নয়। জীবনে ছেলেদের যত কম লাগে তত ভালো। এখন থেকেই জানা রইল।
বৈদর্ভী চ্যানেল বদলাল। হারমোনিয়াম বাজিয়ে একটা ধুমসো চেহারার পুরুষ মানুষ গান। করছে। জঘন্য। টিভি বন্ধ করে দিল বৈদর্ভী। ঘরটা আরও অন্ধকার হয়ে গেল। পাশে সেন্টার। টেবিলে সিগারেটগুলো সাজানো হয়েছে। একটা নিয়ে দেশলাই জ্বালালো বৈদর্ভী। লম্বা টান দিল চোখ বুজে। কাশি একটু হল বটে, তবে আগের তুলনায় কম। কিঙ্কিনি না খেলেও, আগে বেশ কয়েকবার সিগারেট খেয়েছে বৈদর্ভী। সিগারেটের ধোঁয়ায় তার অসুবিধে হওয়ার কথা নয়। এই ধোঁয়াটায় একটা জ্বালা ভাব আছে। কিঙ্কিনি ঝুঁকে পড়ে বৈদর্ভীর হাত থেকে সিগারেটটা নিল। পরপর দুটো টান দিল চৌখস কায়দায়। নাক মুখ দিয়ে ঘন ধোঁয়া ছাড়ল গল গল করে।
বৈদর্ভী বলল, বাঃ ওস্তাদ হয়ে গেছিস!
দেখছি খারাপ জিনিসগুলো রপ্ত করতে বেশি সময় লাগছে না। ঘূর্ণীর পারফরমেন্স নিশ্চয়ই তোর মনে আছে।
আজ দেখব ইমপ্রুভ করেছিস কিনা। চোখ নাচিয়ে বলল বৈদর্ভী।
মনে হয় করব। সহজ গলায় বলল কিঙ্কিনি।
বৈদর্ভী সিগারেটে শেষ টান দিয়ে অ্যাশট্রের মধ্যে গুঁজে দিল। হেসে বলল, তা হলে আর দেরি করে লাভ কী? তুই যেভাবে মার্ডারের প্ল্যান করছিস তাতে কখন গলা টিপে ধরবি তার ঠিক নেই।
কিঙ্কিনি সত্যি সত্যি এবার পায়ের নখ নিয়ে পড়ল। মাথাটা ঘুরছে। মাথা একবার ঝাঁকিয়ে নিয়ে বলল, তুই তো বাদ পড়ে গেছিস। বললাম না? আমার একজন যায় একজন। আসে। অথবা বলতে পারিস আমি নিজেই কনফিউজড হয়ে পড়ি। বুঝতে পারি না কাকে মারলে ঠিক হবে।
