.
কলোনির পথটা আরও অপরিসর এবং নোংরা হয়ে একটা পুকুরের কাছে এসে পৌঁছল। পুকুর না বলে ডোবা বলাই ভালো। রিকশাচালক ঠিক বলেছে। ডোবাটাকে ঘিরে দুপাশে দুটো রাস্তা। বিশ্রী গন্ধটা বেড়ে নাকে এসে জোরে ধাক্কা মারল যামিনীর। গা পাক মেরে উঠল। শাড়ির আঁচল তুলে নাকে চেপে ধরল জোরে। ডোবার একপাশে আবর্জনার স্তূপ। প্রায় ছোটখাটো একটা টিবি হয়ে আছে। এঁটো শালপাতা, কাপড়ের টুকরো থেকে মদের শিশি। গন্ধ সেখান থেকেই আসছে। যামিনী থমকে দাঁড়াল। দুটো পথের কোনদিকে যাবে? আরও কিছুটা এগোতে যামিনী দেখতে পেল, ডোবার গায়ে ঘাটের মতো খানিকটা জায়গা সিমেন্ট দিয়ে বাঁধানো। বেশ কিছু মহিলা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। কেউ কাপড় কাঁচছে, কেউ স্নান করছে, কেউ পা ছড়িয়ে বসে শুধু উঁচু গলায় কথাই বলে চলেছে। আড়াল আবডালের কোনও ব্যাপার নেই। একঝলক তাকিয়ে যামিনী বুঝল, আব্রু নিয়ে এরা চিন্তিত নয়। অনেকেই হাঁটুর ওপর কাপড় তুলে রেখেছে, এমনকী থাই পর্যন্ত। বুকের কাপড় আলুথালু। বেশির ভাগেরই জামা নেই। জলে পা ডুবিয়ে খালি গায়ে সাবান ঘষছে। গামছার যেটুকু আড়াল বানিয়েছে সেটা না থাকারই মতো। আশপাশ দিয়ে যে দু-চারজন পুরুষ হেঁটে যাচ্ছে তারা মুখ ফিরিয়ে দেখছেও না। বোঝাই যাচ্ছে, এই দৃশ্যে তারা অভ্যস্ত। যামিনী কী করবে বুঝতে পারছে না। এই পরিবেশ সে কখনও দেখেনি। এই পরিবেশে কী করা উচিত সে জানে না। এটা কি মর্গের থেকেও খারাপ কোনও জায়গা? এক মহিলা চিৎকার করে বলল, ওই মাগিকে একদিন দেখে নেব আমি। ঠিক দেখে নেব। কতদিন বাবু দেখিয়ে ফুটানি করবে? খানকি পাড়ায় বেইমানি করার শাস্তি হাড়ে হাড়ে টের পাবে। নেংটা হয়ে জুতো মুখে এই পুকুরপাড়ে ঘুরতে হবে শালিকে, নইলে তোরা মালতীর নামে কুকুর পুষিস, এই বলে রাখলাম, হ্যাঁ।
যামিনীর ইচ্ছে করল কানে হাত চাপা দিতে। দ্রুত নিজেকে সামলালো। কীসের সঙ্কোচ? জেনেশুনেই তো সে এখানে এসেছে। যামিনী মন শক্ত করে এগিয়ে গেল।
ভাই, সাতাশ বাই তিন নম্বরটা কোনদিকে বলতে পারেন?
অচেনা গলা পেয়ে মহিলাদের কয়েকজন মুখ তুলে তাকাল।
০৮. একটা রিভলভার
০৮.
আমাকে একটা রিভলভার জোগাড় করে দিবি?
কেন?
আমি একজনকে খুন করব।
ওরে বাবা, কাকে খুন করবি?
বলব না।
আমাকে নয় তো?
হতে পারে। ঠিক বুঝতে পারছি না।
কিঙ্কিনি সোফার ওপর টানটান হয়ে শুয়ে আছে। সে পরে আছে জিনস আর টপ। টপটা উঠে গিয়ে কিঙ্কিনির পেটের অনেকটা দেখা যাচ্ছে। কিঙ্কিনির সেদিকে মন নেই। তার পা দুটো সোফার হাতলের ওপর তোলা। হাতে একটা নেল কাটার। আঙুল ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সে নখের পরিচর্যা করছে।
একই সোফার গায়ে হেলান দিতে মেঝেতে বসে আছে বৈদর্ভী। হাঁটু দুটো ভাজ করে বুকের কাছে রেখেছে। হাফ প্যান্ট আর টি শার্টে তাকে আজ যেন বেশি ছিপছিপে লাগছে। বৈদর্ভীর এই ঘরে দুটো জানলা। দুটোতেই পরদা টানা। আলোও জ্বলছে না। ফলে এই কড়া রোদের দুপুরেও ঘর বেশ অন্ধকার। এই অন্ধকারেও কিঙ্কিনি কী করে যে নখ পরিচর্যা করছে। সেটা একটা বিস্ময়। ঘর শুধু অন্ধকার নয়। ঘরে প্রচুর ধোঁয়া আর কটু গন্ধ। গন্ধটা গাঁজার। একটু আগেই কিঙ্কিনি আর বৈদর্ভী একটা গাঁজা ভরা সিগারেট ভাগ করে খেয়েছে। সকালে বৈদর্ভী কিঙ্কিনিকে ফোন করে বলল, কিঙ্কিনি, আজ আমাদের বাড়িতে দুপুরে চলে আয়। বাবা মা কেউ থাকছে না। ওরা কলকাতায় যাবে, ফিরতে রাত।
কিঙ্কিনি তখনও বিছানায় ছিল। জড়ানো গলায় বলল, গিয়ে কী হবে?
সবাই মিলে জমিয়ে আড্ডা দেব। কম্পিউটারে ভালো ভালো জিনিস দেখব। একটা সাইটে হলিউডের হিরো হিরোইনদের নেংটুপুঁংটো ফটো আছে। বাবা-মা থাকলে তো দরজা আটকেও দেখতে পারি না। সন্দেহ করে। আজ প্রাণ খুলে দেখব।
কিঙ্কিনি পাশ বালিশ জড়িয়ে বলল, দুর হলিউড দেখতে তোর বাড়িতে কষ্ট করে যাব কেন? আমারই তো নেট আছে।
বৈদর্ভী কাতর গলায় বলল, কেন আয় না বাবা, সবাই মিলে হইচই হবে।
কিঙ্কিনি হাই তুলে বলল, আমাকে ছাড়া হইচই কর। আজ আমি দুপুরে বাড়ি থেকে বেরোব না। হায়ার সেকেন্ডারির পর বিছানা থেকে না নামবার প্রতিজ্ঞা করেছিলাম। অথচ দেখ একদিনও ভালো করে শুতে পারছি না।
বৈদর্ভী এবার প্রায় কেঁদে ফেলার ভঙ্গি করে বলল, তুই না এলে প্রোগ্রাম ক্যানসেল। কাউকে ডাকব না।
কিঙ্কিনি তড়াক করে লাফ দিয়ে বসল। চাপা গলায় বলল, সেটাই ভালো। কাউকে ডাকতে হবে না। শুধু তুই আর আমি।
বৈদর্ভী একটু চুপ করে থেকে গাঢ় গলায় বলল, মিথ্যে বলছিস না তো কিনি?
না, সত্যি বলছি। কিন্তু ওয়ান কন্ডিশন। একটা জিনিস খাওয়াতে হবে।
কী? বৈদর্ভী উগ্রীব হয়ে বলল, কী খাবি?
কিঙ্কিনি মুখ ফিরিয়ে বন্ধ দরজার দিকে তাকিয়ে বলল, মদ খাওয়াতে হবে, ভদকা। পাতি লেবুর রস দিয়ে খাব; দোয়েল সেদিন বলল না, ওর বাবা খায়। ওরকমভাবে খাব। খাওয়াবি কিনা বল।
বাপরে তুই তো দেখছিস বিরাট মদখোর হয়ে গেছিস! একদিন খেয়েই নেশায় পড়ে গেলি?
ইয়ার্কি না, তুই অ্যারেঞ্জ করতে পারবি কিনা বল। কিঙ্কিনির গলায় উত্তেজনা। বলল, মদ খাওয়ার পর…।
বৈদর্ভী বলল, খাওয়ার পর কী?
কিঙ্কিনি হেসে বলল, জানো না কী। ন্যাকা?
বৈদর্ভী হেসে বলল, তোর দেখছি একদিনেই ভালো সবকটা জিনিসে নেশা ধরেছে। যাক তুই চলে আয়, আমি শিবুকে দিয়ে ব্যবস্থা করে রাখছি।
