তোর নেশা হয়ে গেছে কিনি। তুই আর খাস না। শেষে সেদিনকার মতো কাণ্ড করবি।
কিঙ্কিনি বুঝতে পারল বৈদর্ভী ঠিকই বলছে। তার নেশা হয়ে গেছে। বেশ লাগছে। কেমন যেন নিজেকে হালকা মনে হচ্ছে।
বুঝলি বৈদর্ভী, একটা বয়স পর্যন্ত খুনের জন্য অনেকগুলো নাম মাথায় ঘুরত। কখনও মনে হত, হাতের কাছে পেলে আমার আমেরিকা প্রবাসী মামাকে খুন করব। তার দিদির এতবড় একটা শোকের সময়ে সে একবারও আসেনি। শুনেছিলাম, মাকে নাকি বলেছিল, জামাইবাবু যখন চলে গেছেন তখন তাকে যেতে দাও। লেট হিম গো। এটা নিয়ে বেশি সময় নষ্ট কোরো না। ধরে নাও হি ইজ ডেড। ধরে নাও ইটস আ কেস অব ডিভোর্স। বরং আমি তোমাদের কিছু ডলার পাঠাচ্ছি ফর আ নিউ বিগিনিং। দেবনাথ চট্টোপাধ্যায়কে ভুলে নতুন করে শুরু কর। তারপর থেকেই মামাকে ঠিক কপালের মাঝখানে গুলি করে মারার স্বপ্ন দেখতে শুরু করলাম।
বৈদর্ভী মেঝে থেকে উঠে পাশের সোফাটায় বসল। চোখ বড় করে বলল, মামাকে খুন করবি! বলিস কীরে কিঙ্কি!
কিঙ্কিনি হাসল। বলল, কিছুদিনের মধ্যেই মামাকে ক্ষমা করে দিলাম। দেখলাম আরও বড় ক্রিমিনাল আছে। তারা হল আমার জেঠা আর জেঠিমা। খুন যদি করতে হয় এদের করাই উচিত। ওরা বলে বেড়াত বাবার হারিয়ে যাওয়ার জন্য আমরাই নাকি দায়ী। দাদা একদিন জেঠুকে ফোন করেছিল। প্রচণ্ড ধমক দিয়ে ফোন কেটে দিয়েছিলেন জেঠিমা। ভেবে দেখ বৈদর্ভী, ওইরকম ভয়ঙ্কর সময়ে…যাক এরাও আমার লিস্ট থেকে বাদ পড়ে গেল। এলেন অর্ধেন্দু দত্ত।
অর্ধেন্দু দত্ত! সেটা আবার কে?
বৈদর্ভী সবটা যে বুঝতে পারছে এমন নয়। কিন্তু না শুনে পারছেও না। বাবার নিখোঁজ হওয়া নিয়ে কিঙ্কিনি কখনওই বন্ধুদের কাছে কিছু বলে না। যে পাঁচ-ছজন কাছাকাছির বন্ধু তারা এই প্রসঙ্গ তুলতে চায় না। কম্পিউটার ক্লাসে ভরতি হওয়ার পর অনীক একবার বলেছিল, কিঙ্কিনি, একটা কথা বলব কিছু মনে করবি না তো? অনীকের সঙ্গে সৌগত, সৌম্য শুভমও ছিল।
কিঙ্কিনি হেসে বলেছিল, তোরা যদি কিছু মনে না করিস আমি করব কেন?
সৌগত বললে, শুনলাম তোর বাবা নাকি…।
কিঙ্কিনি সাইকেলে উঠতে উঠতে সহজভাবে বলেছিল, ঠিকই শুনেছিস। বাবা আমাদের ছেড়ে চলে গেছে।
সৌম্য ফট করে বলে বসল, কেন?
কিঙ্কিনি সাইকেলের ঘন্টিটা দুবার বাজিয়ে বলল, মানুষ কেন সংসার ছেড়ে চলে যায়। সে কি কেউ বলতে পারে রে? গৌতম বুদ্ধর কথাই ধর না, তিনিও তো স্ত্রী পুত্র রেখে বেরিয়ে পড়েছিলেন। কেন কেউ কি জানে? ভাবছি আর কটা দিন অপেক্ষা করব, তারপর বাবার নামে গাছের তলায় একটা বেদি বানাব। বলব, আমাদের পিতা সংসার ত্যাগ করিয়াছিলেন এবং এই স্থানে আসিয়া মোক্ষ লাভের হেতু ধ্যান করিয়াছিলেন। তোরা মাঝেমাঝে বেদির কাছে গিয়ে হাতজোড় করে দাঁড়াবি। পারবি না? হি হি।
এরপর অনীকরা আর কখনও কিঙ্কিনির বাবা সম্পর্কিত কোনও প্রশ্নের মধ্যে যায়নি। কিঙ্কিনিও বলেনি। আজ বহুদিন পরে সে অনেক কথা বলছে।
অর্ধেন্দু দত্ত আমার হারিয়ে যাওয়া বাবার অফিসের কলিগ। ইউনিয়নের নেতা। অসহায় পরিবারকে সাহায্য এবং সহযোগিতা করার জন্য হাত বাড়িয়ে দিলেন এবং মায়ের হাতটা খপ করে চেপে ধরলেন। চেপে ধরারই কথা। সেই সময় মায়ের হাত সুন্দর ছিল। বহুদিন পর্যন্ত উনি স্বাস্থ্য ধরে রেখেছিলেন। যাই হোক, সেই অর্ধেন্দু দত্ত বাড়িতে আসতে লাগলেন, গভীর রাতে ফোন করলেন, মা সেজেগুজে বেরোতে লাগল। বেশ লাটুস পুটুস চলতে লাগল। আমি সিওর, কেসটা আরও দূর পর্যন্ত গড়িয়েছিল। আমি তো ভেবেছিলাম, একটা বাবা গেছে আর একটা বাবা এসে গেল। হি হি। ঠিক করলাম মা বিয়ে করলেই নতুন বাবাকে পেটে গুলি করে। মারব। যাক, সেও গেল। মায়ের সঙ্গে সম্পর্ক কাটল। ও এর মধ্যে আরও একজনকেও মারবার। প্ল্যান করেছিলাম রে।
বৈদর্ভী বলল, সত্যি তোর মাথাটা আজ গেছে।
বৈদর্ভী হাত বাড়িয়ে শেষ সিগারেটটা ধরিয়ে ফেলল। টান দিয়ে এগিয়ে গেল কিঙ্কিনির দিকে। কিঙ্কিনি নখের পরিচর্যা বন্ধ করেছে। মাথা যেভাবে টলটল করছে তাতে বকবকানি ছাড়া আর কিছু করা অসম্ভব।
একবার আমাদের বাড়িওলা লোকটা আমার সঙ্গে খুব খারাপ একটা কাজ করল।
কে? জানকীকাকু? সে কী! উনি তো ভালোমানুষ বলেই জানি। বৈদর্ভী অবাক হল।
মুখ ভরতি ধোঁয়া নিয়েই কিঙ্কিনি হাসল। বলল, আমরাও তাই জানতাম। ভালোমানুষ। হি হি। পছন্দও করতাম। একদিন মা আমাকে ভাড়া দিতে ওপরে পাঠাল। আগেও বহুবার গেছি। উনি বেশি কথা বলতেন না। বাবার কথা তো একেবারেই না। সেই কারণেই ভালো লাগত। সেদিন দরজা খোলার পর আমি ভেতরে ঢুকে খামটা দিতেই উনি ফট করে হাত বাড়িয়ে আমার বুকটা ধরলেন। ধরেই রাখলেন। ঘটনাটা আমার কাছে এত আকস্মিক ছিল যে আমি চিৎকার করতে পারিনি। ছুটে নেমে এসেছিলাম একতলায়। বাড়িতে কেউ ছিল না। দরজা আটকে থরথর করে কেঁপেছিলাম। কাঁদতে কাঁদতে ভেবেছিলাম মাকে বলে দেব। পরে দেখলাম, একটা ভয়ঙ্কর। সমস্যার মধ্যে দুমড়েমুচড়ে পড়ে থাকা মাকে আরও একটা বিপদে ফেলা হবে। কোথায় বাড়ি খুঁজতে যাবে তখন? স্বামী-পালানো মহিলাকে কে-ই বা বাড়ি দেবে? তাই শুধু বলেছিলাম, উনি আমার বুকের দিকে তাকিয়েছেন। ঠিক করেছিলাম, কোনওদিন সুযোগ পেলে ওই লোকটাকে খুন করব। ওখানে গুলি করব। কোমরের নীচে। পরে সেটাও বদলে গেল। ঠিক করলাম, এই সব ছোটখাটো রাগ পুষে লাভ নেই। তার থেকে বরং মাকেই ফিনিশ করে দিই। দে শেষ টানটা আমি দিই।
