ভালো নয় মানে! ছি ছি, এসব কী বলছ কিঙ্কি! ওঁর মতো মানুষ চট করে পাওয়া যাবে না। বাড়িওলারা কেমন হয় তুমি জানো না। এই মানুষটা কোনওদিন ঝামেলা করেননি। তোমার বাবার ঘটনার পর অন্য যে কেউ হলে বলত বাড়ি ছাড়ুন। তা ছাড়া, তা ছাড়া দেখা হলে কী সুন্দর ব্যবহার করেন! বাড়তি একটা কথা পর্যন্ত বলেন না। অন্য যে কোনও পুরুষমানুষ হলে গায়ে পড়ত।
বাঃ, ভালো মানুষ খারাপ হয়ে যায় না? উনি তাই হয়েছেন, খারাপ হয়ে গেছেন।
যামিনী বলল, এ বিষয়ে আমি তোমার সঙ্গে তর্ক করতে চাই না। নিশ্চয় তুমি কিছু ভুল বুঝেছ।
আমি এতদিন যাচ্ছি, হঠাৎ ভুল বুঝব কেন মা? আমি ভুল বুঝিনি। ঠান্ডা গলায় কিশোরী কিঙ্কিনি প্রতিবাদ করে।
যামিনী এবার বিচলিত হয়। ভুরু কুঁচকে বলল, কী হয়েছে?
আমি বলতে চাইছি না, তবু তুমি যখন জোরাজুরি করছ তখন বলেই ফেলি, আজ উনি আমার বুকের দিকে ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে ছিলেন।
যামিনী চমকে উঠল, হঠাৎ এটা কীরকম কাজ করলেন জানকীবাবু! তবু হাত নাড়িয়ে সে বলল, ঠিক আছে ঠিক আছে, এটা নিয়ে এত বাড়াবাড়ি করার কিছু নেই। যতই হোক উনি পুরুষমানুষ, বড় হচ্ছ এখন এরকম কিছু কিছু সমস্যা হবে। যেটা ছোট সমস্যা, সেটাকেও বড় বলে মনে হবে। আচ্ছা, তোমাকে আর ওপরে যেতে হবে না, এবার থেকে নীল ভাড়া দিয়ে আসবে।
কিঙ্কিনি বলল, আসলে কী জানো মা, মেয়েদের বুকের দিকে ছেলেরা তাকাবে এটা আমরা জেনে গেছি। এতে অবাক হই না, মাথাও ঘামাই না, কিন্তু যে মানুষটার তাকানোর কথা ছিল না, সে যদি এরকম করে তখন বড় গা ঘিনঘিন করে। তখন মনে হয়, মানুষটা খারাপ, একটু নয়, খুব বেশি খারাপ।
যামিনী উঠে পড়ল। এই বিষয়ে আর সে মেয়ের সঙ্গে কথা বাড়াতে চায় না। কত মানুষই তো যা করার নয়, তাই করে। দেবনাথের কি এভাবে ঘরবাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার কথা ছিল? সতর্ক থাকতে হবে। কিঙ্কিনি একা থাকে। সামান্য ঘটনায় হয়তো বেশি ভাবছে, তবু কিছু তো ঘটেছে। তাই-ই বা হবে কেন?
বহুদিন আর কিছু হল না। বরং দেখা হলে জানকীবাবু বিষণ্ণ মুখে মাথা নামিয়ে পাশ কাটিয়ে চলে গেছেন। যামিনীর মনে হয়েছিল, মানুষটা নিজের ভুল বুঝতে পেরেছেন। তাই লজ্জিত। তারপর একসময় ঘটনাটা ভুলেও গেল।
কাল রাতে বাড়ি ফিরে যামিনী দেখল, গেটের মুখে জানকীবাবু দাঁড়িয়ে আছেন।
আপনি! যামিনী অবাক হল।
আপনার সঙ্গে কথা বলব বলেই অপেক্ষা করছি। জানকীবাবু নীচু গলায় বললেন।
যামিনী বলল, ছি ছি, এখানে কেন? ঘরে আসুন।
না না তার দরকার নেই। একটা কথা বলতে খারাপ লাগছে, কিন্তু না বলেও পারছি না। আপনারা এবার বাড়িটা ছেড়ে দিন যামিনীদেবী।
যামিনী অবাক হয়ে বলল, সে কী! কেন?
না, এমনি কিছু হয়নি।
যামিনী একটু এগিয়ে এসে বলল, নিশ্চয় কিছু হয়েছে, কী হয়েছে? ভাড়া বাড়াবেন?
জানকীবাবু মাথা নামিয়ে বললেন, সেদিন আপনার মেয়ে ড্রাঙ্ক হয়ে বাড়ি ফিরেছে। রিকশা থেকে নামার সময় টলছিল। রাত বেশি হলেও পাড়ার কেউ কেউ দেখেছে।
যামিনীর মাথায় দপ করে আগুন জ্বলে উঠল। একটু চুপ করে থেকে বলল, তাতে আপনার কী সমস্যা?
জানকীবাবু মাথা নেড়ে একইরকম নীচু গলায় বললেন, না, তেমন কোনও সমস্যা নয়, কিন্তু বাড়িটা তো আমার, ছোট একটা মেয়ে মদ খেয়ে বাড়িতে ঢুকলে বাড়ির বদনাম হয়।
যামিনীর ইচ্ছে করল বলে, ছোট মেয়ের বুকের দিকে তাকিয়ে থাকতে সমস্যা নেই, সে একদিন মদ খেলেই সমস্যা! চমৎকার তো! কিন্তু সেকথা বলল না।
আমার মেয়ের বিষয়টা আমাকেই বুঝতে দিন। দরকার হলে পাড়ার লোকদেরও কথাটা বলে দেবেন। আর শুনুন হুট বললেই তো বাড়ি ছাড়া যায় না। আমি শুনলাম, যেদিন অলটারনেটিভ ব্যবস্থা করতে পারব নিশ্চয় চলে যাব।
জানকীবাবু দুঃখ পাওয়া গলায় বললেন, ব্যস তা হলেই হবে।
বাড়িওলার কথাটা কাউকেই বলেনি যামিনী। কী বলবে? তা হলে কিঙ্কিনির মদ খাওয়ার কথাটাও বলতে হয়। একটার পর একটা অপমানে সে যেন ক্রমশ অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে।
ট্যুর থেকে ফিরতেই হিন্দোলের সঙ্গে কথা বলল যামিনী। দেবনাথের নতুন সংসারের ঠিকানা নেই। যাদবের সঙ্গে কথা বলে হিন্দোলই জোগাড় করে দিল। সাতাশ বাই তিন নম্বর শহিদ বলরাম কলোনি। বাস স্টপ থেকে রিকশা ধরতে হবে।
যামিনী বলল, মেয়েটার নাম কী?
হিন্দোল বলল, যাদব তো বলেছে মঞ্জু। না-ও হতে পারে, ওই ধরনের মেয়েরা ঘন ঘন নাম পালটায়।
আমরাও যাব। বিশাখা বলে।
যামিনী চোয়াল শক্ত করে বলল, না, এখানে আমি একাই যাব।
বিশাখা হিন্দোল চোখ চাওয়াচাওয়ি করে। বিশাখা বলে, ঠিক আছে, আমরা বাড়িতে ঢুকব না, বাইরে দাঁড়িয়ে থাকব। সঙ্গে পুলিশ নেওয়া যায় না?
হিন্দোল বিরক্ত গলায় বলল, খেপেছ? যাদব তার চোর ডাকাত স্মাগলার বন্ধুদের কাছ থেকে কী খবর এনেছে তার ঠিক নেই, আমরা একেবারে পুলিশ নিয়ে গিয়ে হাজির হব?
যামিনী ঠোঁটের কোনায় ব্যঙ্গের হেসে বলল, পুলিশ নিয়ে গিয়ে কী হবে? কী করবে? গোপনে আর একটা সংসার করেছে বলে, তোদের দেবনাথকে কোমরে দড়ি দিয়ে নিয়ে আসবে? কাউকে লাগবে না। আমি একাই যাব, একদম একা। খবর যদি সত্যি হয়, শুধু জিগ্যেস করব, কেন আমাকে বলে এলে না? আমি কি বারণ করতাম?
মুখে হাত দিয়ে কেঁদে উঠল যামিনী। বিশাখা মুখ ঘুরিয়ে নিল।
