দ্বিতীয় গোলমালটা যামিনীদের বাড়ি সংক্রান্ত।
এই শহরে দেবনাথ মোট তিনবার বাড়ি বদল করেছে। শেষ পর্যন্ত এই বাড়িতেই থিতু হয়। বাড়িটা সবদিক থেকে সুবিধের। দোতলা, কিন্তু ছড়ানো। একতলায় মোট তিনটে ঘর। বসা খাওয়ার জায়গা আলাদা। দক্ষিণে মাঝারি একটা বারান্দাও আছে। দোতলায় থাকেন বাড়িওলা জানকীবাবু। বিপত্নীক, ছেলেপুলেও নেই। একাই থাকেন। বাড়ি নেওয়ার সময়েই ভদ্রলোকের বয়স ছিল পঞ্চান্নছাপ্পান্ন। এখন আরও পাঁচটা বছর বেড়ে গেছে। ভাড়া নেওয়ার সময় দেবনাথ খোঁজখবর নিয়েছিল। ছোট ছেলেমেয়ে নিয়ে অনেকটা সময় একলা থাকবে যামিনী। পাড়ার সবাই এককথায় বলল, বাড়িওলা খুব ভালো মানুষ। অল্পদিনেই বোঝা গিয়েছিল, সত্যি তাই। মানুষটা ভদ্রলোক। আর পাঁচটা খিটখিটে বাড়িওলার মতো নয়। কোনও ঝামেলা করেননি কখনও। একটার বেশি দুটো কথা বলতে চাইতেন না। মুখোমুখি হলে শুধু মৃদু হেসে, মাথা নাড়তেন। দেবনাথের ঘটনার পর হাসিটাও বন্ধ করে দিলেন। যামিনীর সঙ্গে দেখা হলে মাথা নামিয়ে নিতেন। নীচু গলায় বলতেন, কোনও দরকার হলে আমাকে বলবেন। আমার এক শালা পুলিশে কাজ করে, যদি মনে করেন…। আমি জানি আপনারা সব ব্যবস্থাই করছেন…তবু যদি..। বলার মধ্যেও কুণ্ঠা, যেন অনধিকারচর্চা না হয়। কখনওই অতিরিক্ত কৌতূহল দেখাননি ভদ্রলোক। দুটো সহানুভূতির কথা বলতে নেমে আসেননি একতলায়। হঠাৎ শুনলে মনে হবে, এ কেমন মানুষ! বাড়ির নীচেই এতবড় একটা ঘটনা ঘটছে, কোনও তাপ উত্তাপ নেই! কিন্তু যামিনীরা খুশি হয়েছিল। একজনের কাছ থেকে অন্তত রেহাই পাওয়া গেছে। সহানুভূতি, করুণা, পরামর্শের ধাক্কায় তারা বিপর্যস্ত। একদিন দুদিন নয়, বছরের পর বছর চেনা অচেনা মানুষ প্রশ্নে প্রশ্নে অতিষ্ঠ করে তুলেছে
কী হয়েছিল? বাড়িতে ঝগড়া? ব্যাগ সুটকেস সঙ্গে নিয়েছে? নাকি ঝাড়া হাত-পায়ে গেল? শুনলাম মোবাইল ফোনটা নাকি ফেলে গেছে? সত্যি নাকি? আত্মীয়দের বাড়িতে খোঁজ নিয়েছ? বাইরে কোথাও রাগারাগি ছিল না তো? গোপনে ব্যবসাট্যাবসা করত কিছু? পার্টনার ছিল? দিনকাল খুব খারাপ। কাগজে কত কী পড়ি। সামান্য রাগ থেকে বন্ধুতে বন্ধুতে খুনোখুনি পর্যন্ত হচ্ছে। আচ্ছা, ধার-দেনা করেনি তো? অনেকে আবার ওতে ঘাবড়ে যায়। ভয়ে গা-ঢাকা দিয়ে থাকে।
জানকীবাবু বোধহয় একমাত্র মানুষ যিনি কোনও প্রশ্ন করতেন না। একটা সময় পর্যন্ত বাড়ি ভাড়া নিজের হাতে দিয়ে আসত যামিনী। জানকীবাবু ব্যস্ত হয়ে বলতেন, অসুবিধে থাকলে পরে না হয় দিতে।
যামিনী বলত, অসুবিধে নিয়েই তো আছি দাদা। তবু চলতে তো হবে। আপনি টাকা রাখুন।
জানকীবাবু বিষণ্ণ গলায় বিড়বিড় করে বলতেন, কী যে হল…হঠাৎ কী যে হল..অমন সুন্দর মানুষটা…। লোকে যাই বলুক, আমি তো জানি কত সুখে ছিলে তোমরা…ফুটফুটে দুটো ছেলেমেয়ে…হইচই শুনতাম, হাসি শুনতাম…মাঝেমধ্যে কী মনে হয় জানো? মনে হয় সংসারের মায়া বড় কঠিন, বড় নির্মম, সেখানে সুখের থেকে দুঃখটাই বেশি।
যামিনী বুঝতে পারে মানুষটা তাঁর স্ত্রীর কথা মনে করছেন। সে নিজেও আবেগতাড়িত হত। ধরা গলায় বলত, আপনি একদিন এসে চা খেয়ে যাবেন।
ছি ছি, তোমাদের বিরক্ত করব! আমি তো কিছুই করতে পারি না। কোনও অসুবিধে হলে বলবে। ছেলেকে পাঠিয়ে দিও।
বছর তিন যামিনী নিশ্চিন্তে ছিল। এরকম একটা সময় ছেলেময়ে নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকাটা খুব জরুরি। দেবনাথের দাদা ঘটনার পর থেকেই নিজেকে সরিয়ে নিয়েছে। দু-চারদিন এসেছিল, বউদি ফোন করেছিল বারকয়েক, ব্যস সেখানেই শেষ। তারপর আত্মীয়স্বজনকে বলে বেড়াতে লাগল, আমরা বুঝেছি আসলে যামিনীরই গোলমাল। ওর জন্যই দেবনাথ ঘর ছেড়েছে। পুলিশ দু-ঘা দিলে সব বেরিয়ে আসবে। পিছনে আর একটা কেউ আছে। শোনা যায়, ওরা পুলিশের কাছে কমপ্লেইনও করতে গিয়েছিল। পুলিশ তাড়িয়ে দেয়। এসব শুনে যামিনী কিছু মনে করেনি, এছাড়া ওদের উপায়টা বা কী ছিল? নইলে গোটা পরিবারটাকে নিজের বাড়িতে নিয়ে তুলতে হত। ভাইয়ের খোঁজে কাজকর্ম শিকেয় তুলে ছোটাছুটি করতে হত সর্বক্ষণ। এই ঝামেলা কাঁধে নেওয়া থেকে দোষ দেখিয়ে সরে যাওয়া অনেক বুদ্ধিমানের। এর ফাঁকে পৈতৃক বাড়িটা যদি বিক্রি করা যায় তা হলে একাই টাকাটা ভোগ করা যাবে। সে করুক। দেবনাথকে খুঁজে বের করা ছাড়া অন্য কিছুই মাথায় রাখেনি যামিনী। শুধু বুঝেছিল নিজেদের আশ্রয় নিজেরাই জোগাড় করতে হবে। সেদিক থেকে এই বাড়িই সবথেকে সুবিধেজনক।
কোনও সমস্যা হয়নি। সমস্যা শুরু হল পরে। জানকীবাবু রিটায়ার করে বাড়িতে বসে যাওয়ার পর। তখন নীলাদ্রি সবে কাজে ঢুকেছে। মাঝেমধ্যেই ভাড়ার টাকা ওপরে দিতে যেত কিঙ্কিনি। যামিনী স্কুলে যাওয়ার সময় মেয়ের হাতে খাম দিয়ে বলত, একসময় ওপরে গিয়ে দিয়ে আসবি।
এক সন্ধেবেলায় যামিনী স্কুল থেকে ফেরার পর কিঙ্কিনি বলল, আর আমাকে পাঠাবে না।
যামিনী অবাক হয়ে বলল, কেন!
এমনি, আমার ভালো লাগে না।
যামিনী ঝাঁঝিয়ে উঠে বলে, ভালো লাগে না মানে, এইটুকু দায়িত্ব নিতে পারবে না? শুধু খাবে দাবে আর ঘুরে বেড়াবে? নীচ থেকে ওপরে যেতেও কষ্ট হয়!
কিঙ্কিনি তার মায়ের দিকে মুখ তুলে বলেছিল, জানকীকাকু লোকটা ভালো নয়।
