হেডমিস্ট্রেসের সামনে যামিনী মাথা নামিয়ে বসে রইল। বিশাখা ঠিক বলছে, বিষয়টা মিটিয়ে ফেলতে হবে। ওই ভাবে মারধর ঠিক হয়নি। নিজের ওপর কন্ট্রোল হারিয়ে যাচ্ছে। মাঝখানে খানিকটা শান্ত ভাব এসেছিল। আবার নতুন করে গোলমাল শুরু হয়েছে। সবথেকে বড় কথা হল চাকরিটা তো বাঁচাতে হবে। হিন্দোলের খবর যদি সত্যি হয় তা হলে আরও বেশি রক্ষা করতে হবে।
খানিকটা ক্ষমা চাওয়ার ঢঙেই যামিনী বলল, আমার মনমেজাজ ঠিক ছিল না ম্যাডাম।
মায়াদি কঠিন গলায় বললেন, আমি জানি, তোমার মেজাজ ঠিক থাকার কথাও নয়, তোমার পারিবারিক সমস্যা আছে। কিন্তু বাইরের লোক তো আর সেটা বুঝবে না। তারা মেয়েকে স্কুলে পড়তে পাঠায়, মার খেতে পাঠায়নি।
ওইভাবে মারাটা আমার ঠিক হয়নি। পরে আমার নিজেরই খুব খারাপ লাগছিল। মেয়েটাকে আমি এইটুকু বয়স থেকে দেখছি।
হেডমিস্ট্রেস ভেবেছিলেন যামিনী তার সঙ্গে ঝগড়াতে যাবে। ঊ্যাক ট্যাক করে কথা বলবে। এই মেয়ের সেদিকে ঝোঁক বাড়ছে। স্বামী নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে সবসময় যেন একটা হীনমন্যতায় ভোগে। সাধারণ কথাতেও আপত্তি তোলে। মাস কয়েক আগেই ঘরে এসে রুটিন নিয়ে ঝামেলা করে গেছে। অন্য কোনও ঘটনা হলে এই মেয়েকে বেশ খানিকটা প্যাঁচে ফেলা যেত। নাকের জলে চোখের জলে করে তবে ছাড়া যেত। কিন্তু এক্ষেত্রে খুব একটা কিছু করা যাবে না। ছাত্রছাত্রীকে মারধোরের ব্যাপারে আজকাল আইনকানুন খুব শক্ত হয়েছে। ঘটনাটা নিয়ে যামিনীর বিরুদ্ধে বেশি প্যাঁচ কষতে গেলে জল অনেকদুর গড়াবে। পত্রপত্রিকা এসে যেতে পারে। তখন হেডমিস্ট্রেসও ছাড় পাবে না। পাশাপাশি অন্য টিচাররাও জল ঘোলা করতে শুরু করবে। এরা একবার জল ঘোলা করতে পারলে আর কিছু চায় না। সুতরাং যত দ্রুত সম্ভব জিনিসটা মিটিয়ে ফেলতে হবে। তবে একেবারে ছেড়ে দেওয়াও যায় না। যামিনী চট্টোপাধ্যায়কে একটা শিক্ষা দেওয়া দরকার। যাতে ভবিষ্যতে বেশি টা-ফুঁ না করে। ও সারেন্ডার করেছে। তার মানে ভয় পেয়েছে। এটাই সময়।
শুধু নিজের খারাপ লাগলে তো হবে না যামিনী, একটা কিছু করতে হবে।
যামিনী মুখ তুলে বলল, কী করব বলুন।
মায়াদি খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, একটা কাজ করলে কেমন হয়, আজ সন্ধেবেলা আমরা কয়েকজন টিচার যদি ওই মেয়ের বাড়ি যাই? তুমিও যাবে।
তারপর?
মায়াদি কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললেন, তারপর আর কী, তুমি বলবে তুমি অনুতপ্ত। তোমারও খারাপ লাগছে। এই যেমন আমাকে বললে আর কী।
যামিনী মুখ তুলে শান্ত গলায় বলল, ছাত্রীর পা ধরে ক্ষমা চাইতে বলছেন?
হেডমিস্ট্রেস স্থির চোখে তাকিয়ে থেকে বললেন, দরকার হলে তাই চাইতে হবে যামিনী। এখন স্টুডেন্টদের গায়ে হাত তুললে কী হয় তুমি বোধহয় জানো না। ওরা যদি থানায় নালিশ করে আগে পুলিশ ধরে নিয়ে যাবে। অবশ্য তুমি যদি মনে করো, মিটমাট না করে লকআপে রাত কাটাবে সে তোমার ব্যাপার। স্কুল বোর্ড তো সঙ্গে সঙ্গে আমাকে সাসপেনশন অর্ডার ধরাতে বলবে। আমি একদিন, খুব বেশি হলে দুদিন ঠেকাতে পারব, তার বেশি তো নয়। এনকোয়ারি শেষ না হওয়া পর্যন্ত মাইনেটাও আটকে যাবে। দীর্ঘ প্রক্রিয়া। যদি চাও সেই প্রক্রিয়ায় যেতে পারো। তা ছাড়া আরও আছে। ঠোঁটের ফাঁকে নিষ্ঠুর হাসলেন মায়াদি। তারপর গলা নামিয়ে বললেন, তোমার কলিগরাই পত্রিকাওলাদের খবর দেবে। যে সময় পুলিশ তোমায় অ্যারেস্ট করতে তোমার বাড়িতে যাবে সেইসময় ক্যামেরা হাতে ফটোগ্রাফার পৌঁছে যাবে। পরদিন কাগজে ফটো উঠবে তুমি পুলিশের জিপে উঠছ। আমি জাস্ট কী কী ঘটতে পারে অনুমান করে বললাম। পরে বলতে পারবে না, আমি সতর্ক করে দিইনি। আমি আমার ডিউটি করলাম, আমার টিচারদের মান-সম্মান রক্ষার দায়িত্ব আমার।
যামিনীর চোখ ফেটে জল আসছে। ঠোঁট কামড়ে বলল, আমি ওই মেয়ের বাড়ি যাব। আপনাকে যেতে হবে না, আমি একাই যাব।
মায়াদি চেয়ারে হেলান দিয়ে জয়ের হাসি হাসলেন। বললেন, গুড, কিন্তু একা যাওয়াটা ঠিক হবে না, ওরা ভীষণ উত্তেজিত হয়ে আছে। আমাকেও রেসপনসিবিলিটি নিতে হবে। তুমি ওই মেয়েটির কাছে ক্ষমা চাওয়া পর, আমি ওর বাবা মায়ের কাছে দুঃখপ্রকাশ করব।
যামিনী বলল, আসলে আপনি চাইছেন আমি যেন আরও পাঁচজন টিচারের সামনে মেয়েটির হাতে-পায়ে ধরি তাই তো? আমার অপমানটা ওরাও দেখে আসুক, পরে যেন সবাইকে রসিয়ে গল্প করতে পারে। ঠিক আছে, তাই হবে। একটা ভুল যখন করে ফেলেছি, শাস্তি তো পেতেই হবে। চলুন, কাকে কাকে নেবেন ঠিক করে নিন।
ঘটনার মিটমাট হল খুব আশ্চর্য ভাবে। একেবারে নাটকের মতো!
ক্ষমা চাইতে হল না যামিনীকে। দরজা খুলে যামিনীকে দেখে হতভম্ব হয়ে গেল ছাত্রী।
মিস আপনি!
যামিনী তার কাঁধে হাত রেখে বলল, তোর কাছে এসেছি।
খুব বেশি হলে মুহূর্তখানেক সময় লাগল। মেয়েটি হাউ হাউ করে কেঁদে জড়িয়ে ধরল যামিনীকে। এই দৃশ্যের জন্য কেউই প্রস্তুত ছিল না। না যামিনী, না হেডমিস্ট্রেসের সঙ্গে আসা আরও তিন টিচার। যামিনীও চোখের জল মুছে মেয়েটির গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগল পরম স্নেহে। ক্ষমা চাইল মেয়ের মা। বলল, রাগের মাথায় আপনার নামে খারাপ কথা বলে এসেছি, আপনি কিছু মনে করবেন না দিদি।
