পরদিন খুব স্বাভাবিক কারণেই যা ঘটবার তাই হল। সকাল থেকে স্কুলে তুলকালাম কাণ্ড। স্কুল শুরুর আগেই মেয়েটির বাবা-মা এসে হইচই শুরু করল। মেয়ের বাবা হেডমিস্ট্রেসকে হুমকি দিয়ে গেল, চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে যামিনী চট্টোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে তারা পুলিশের কাছে যাবে। মেয়ের মা স্কুলের বারান্দায় দাঁড়িয়ে গলা ফাটিয়ে বলতে লাগল, যে মহিলা নিজের স্বামীকে ভালোবেসে ধরে রাখতে পারেনি, সে আবার স্টুডেন্টদের ভালোবাসবে কী করে? আরে, তুই নিজের বরকে শাসন কর, তারপর পরের মেয়ের গায়ে হাত দিবি।
তখনও যামিনী স্কুলে আসেনি। একে একে টিচাররা আসছে। নিমেষে স্টাফরুমে দুটো দল তৈরি হয়ে গেল। যামিনীর বিরুদ্ধে দল অনেক ভারী। তারা বলতে লাগল, খুব অন্যায় কাজ হয়েছে। ছি ছি। স্কুলের সুনাম নষ্ট হল। একটু আধটু বকাঝকা ঠিক আছে, তাবলে ওরকম চোরের মার মারবে?
বিশাখা মৃদু স্বরে বলে, তোমরা ওর দিকটাও বিচার করো। কতবড় টেনশনের মধ্যে দিয়ে কাটাচ্ছে যামিনীদি।
কয়েকজন তেড়ে এল প্রায়।
তুমি চুপ করো। বাড়ির টেনশন বাড়িতে রেখে কাজে আসতে হয়। আমাদের বুঝি টেনশন নেই, চিন্তা নেই? পাঁচ বছর ধরেই তো আহারে উঁহুরে শুনছি। ওকে কিছু বলা যাবে না, ওকে বেশি ক্লাস দেওয়া যাবে না, খাতা দেওয়া যাবে না, উনি চাপ নিতে পারবেন না। কী ব্যাপার না বর পালিয়েছে। মনে হয় আমাদের বর হারালে ভালো হত! সন্তানের মতো মেয়েগুলোর ওপর এখন রাগ ফলাচ্ছে।
আরতিদি এতক্ষণ চুপ করে শুনছিলেন। এবার হাত তুলে বললেন, থাম দেখি, অত বড় বড় কথা বোলো না। মারধোর আমিও সমর্থন করছি না, তাবলে তোমাদের কথাও মানব না। সত্যি যদি ছাত্রীদের নিজের মেয়ের মতো দেখতাম তা হলে টিউশনগুলোর কী হত? একেকটা ব্যাচে পঁচিশজন করে তো বসাচ্ছে সবাই।
আপনিও বাদ যান না আরতিদি। টিউশন আপনিও করেন।
করি তো, করি বলেই তোমাদের মতো কান্নাকাটির আদিখ্যেতা দেখাচ্ছি না।
ইতিহাসের টিচার দেবলীনা একবছর হল জয়েন করেছে। মূলত চুপ করেই থাকে। সে বলল, শুধু টিউশন নয়, টিউশনের জন্য মেয়েদের চাপ দেওয়ার দুর্নামও তো আমাদের নামে রয়েছে।
তুমি মাত্র কদিন জয়েন করেই এত জেনে গেলে! ভূগোলের পর্ণা ব্যঙ্গ করে বলে।
বিশাখা বলল, সত্যি ঘটনা জানতে সময় লাগে না। ইচ্ছে লাগে।
রাজলক্ষ্মী ইংরেজির টিচার। অনেক বছর হয়ে গেল। মাঝেমধ্যে গাড়ি করে স্কুলে আসেন। মুখে বলেন, স্বামীর টাকায় কেনা, কিন্তু সকলেই জানে টিউশনের জন্যই এই রমরমা। কথাবার্তায় মহিলা অতি মার্জিত। দেবলীনার দিকে তাকিয়ে বললেন, একটা অভিযোগ ছুঁড়ে দিলেই হয় না দেবলীনা, স্পেসিফিক প্রমাণ দিতে হয়। মনে রেখো এখানে আমরা যারা আছি তারা সকলেই লেখাপড়া করে এসেছি। পড়ানোর মতো একটা পবিত্র পেশায় আমরা যুক্ত। তাদের সম্পর্কে কিছু বলতে গেলে তিনবার ভাবতে হয়।
পূর্ণিমা চোখের চশমাটা নাকের ওপর নামিয়ে বললেন, সব অপরাধের কি প্রমাণ হয় রাজলক্ষ্মী? ধর, কেউ স্কুলে ইংরেজি পড়ায়। দেখা গেল, তার কাছে যারা টিউশন নেয় তারা সব গ্রামারে ফুল মার্কস পাচ্ছে, বাকিরা বেশিরভাগই তিন চার। খুব বেশি হলে পাঁচ।
কথাটা বলে একটু হাসলেন পূর্ণিমা। সকলেই ইঙ্গিতটা বুঝতে পারল। রাজলক্ষ্মী হাত উলটে বললেন, এ কথার মানে কী! কোনও টিচার যদি প্রাইভেট টিউশনে ভালো করে পড়ায় সেটা তো অন্যায় নয়। বাবা-মায়েরাই বা টিউটরের কাছে পাঠাচ্ছে কেন? আমরা তো হাতে পায়ে ধরে আনছি না!
দেবলীনা বলল, এটাই তো কথা রাজলক্ষ্মীদি। বাবা-মায়েরা কেন টিউশনে পাঠাচ্ছে। বাধ্য হচ্ছে না তো?
কীসের বাধ্য।
পূর্ণিমা বাংলার টিচার। সোজাসাপটা কথা বলে স্টাফরুমে জনপ্রিয়তা হারিয়েছেন অনেকদিন। বললেন, আহা, এই সহজ কথাটা বুঝলে না রাজলক্ষ্মী? টিউশন ছাড়া গ্রামারে ফুলমার্কস আসবে কী করে? কোয়েশ্চনটাই তো জানা হবে না।
আপনি কী বলতে চাইছেন? আমি টিউশনে কোয়েশ্চন বলে দিই? আই স্ট্রংলি প্রোটেস্ট। আমি হেডমিস্ট্রেসকে কমপ্লেইন করব।
কমপ্লেইনের কথা শুনে পূর্ণিমা বিন্দুমাত্র ভয় পেলেন না। বললেন, মন্দ হয় না। ইংরেজি প্রশ্নটা একবার হাত বদল করে পরীক্ষা করা যেতে পারে। সত্যি সত্যি টিউশন মেয়েরা ভালো না, অন্যরা?
আপনার বাংলাটা তা হলে করতে হবে।
দেবলীনা মুচকি হেসে বলল, নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করে লাভ কী? স্কুলে মারধর বন্ধ করে ঠিক হয়েছে। লেখাপড়া করতে আসা ছেলেমেয়েদের কান্না বন্ধ করাটা জরুরি। কিন্তু টিউশনের অত্যাচার বন্ধ করতে তাদের বাবা-মায়ের কান্না বন্ধ করাটাও কম জরুরি নয়। যে কান্না দেখা যায় সেটা নিয়ে আমরা লাফালাফি করছি, যেটা দেখা যায় না সেটার ব্যাপারে চুপ করে থাকাটাও সমর্থনযোগ্য নয়।
রাজলক্ষ্মী বললেন, লেকচার তো অনেক হল, আসল কালপ্রিট কোথায়? শ্রীমতী যামিনী চট্টোপাধ্যায়?
স্কুলে ঢুকতেই হেডমিস্ট্রেস যামিনীকে ঘরে ডেকে নিলেন। তার আগেই মোবাইলে ধরে ঘটনা জানিয়ে দিয়েছে বিশাখা।
বিষয়টা খুব সিরিয়াস জায়গায় চলে গেছে। প্লিজ যামিনীদি, বড়দির সঙ্গে একদম রাগারাগি করবে না। ওই মেয়ের বাবা-মা এসে শাসিয়ে গেছে। যে করেই হোক একটা মিটমাট করতে হবে। ছোটখাটো গোলমালে জড়িয়ে পড়লে এখন মুশকিল, মনে রেখো তোমার সামনে অনেক বড় সমস্যা। বড়দি কিন্তু চাইবে ব্যাপারটা নিয়ে ঘোঁট পাকাতে।
