বিশাখার কাছ থেকে খবর শোনার পর কটা দিন একেবারে চুপ করে গেল যামিনী। শান্ত হয়ে গেল যেন। কিঙ্কিনি মদ খেয়ে বাড়ি ফেরার পরও কিছু বলেনি। এর মধ্যে একদিন মোবাইলে দেবনাথের অফিসের নম্বর ভেসে উঠল। ফোন তুলতেই ওপাশ থেকে অর্ধেন্দু দত্তর গলা।
আপনি! অবাক হল যামিনী।
ফোনটা কেটে দেবে নাকি? যদি চাও দিতে পারো।
কী ব্যাপার বলুন। বুক কেঁপে উঠলেও যতটা সম্ভব উত্তাপহীন গলায় বলল যামিনী।
ছেলে কিছু বলেনি?
কী বিষয়?
অর্ধেন্দু দত্ত হেসে বললেন, বাঃ বেশ ডিপ্লোমেটিক কায়দায় কথা বলা ধরেছ দেখছি। গুড। এমন ভান করছ যেন কিছু জানো না।
এই কবছরে মানুষটা গলার স্বরে একটা ভাঙা ভাব এসেছে, আর কিছু বদলায়নি। যামিনী বুঝতে পারছিল না কী করবে। ফোনটা কি রেখে দেবে? অস্ফুটে বলল, নীল আমাকে কিছু বলেনি।
ঠিক আছে কষ্ট করে আর মিথ্যে বলতে হবে না, ইটস ওকে, আমি সব বুঝেছি। আমি তোমাকে একটা কথা বলতে ফোন করেছি, আমার নিজের পক্ষ থেকে নয়, অন বিহাফ অফ মাই অফিস ইউনিয়ন তোমায় ফোন করেছি। তুমি নিশ্চয় জানো নীলাদ্রিকে চাকরির ব্যাপারে আমরা ডেকেছিলাম। অনেকটা কমপেনসেটরি গ্রাউন্ডের মতো। আমাদের অফিসের ভ্যাকেন্সির সঙ্গে ওর কোয়ালিফিকেশন যেরকম ম্যাচ করেছিল, সেই অনুযায়ী কাজের অফার দেওয়া হয় ওকে। কাজটা ছিল পার্মানেন্ট। সেই কাজ তোমার ছেলের সম্ভবত পছন্দ হয়নি। এটা হতেই পারে। কিন্তু আমরা আশা করেছিলাম, ও একটা উত্তর দেবে। ও যে কাজটা করবে না সেটা তো অন্তত জানাবে। বাট হি ডিডন্ট গিভ এনি রিপ্লাই। আমরা ইউনিয়ন থেকে ম্যানেজমেন্টের সঙ্গে কথা বলে কাজটা ধরে রেখেছিলাম, তোমার বা তোমার ছেলের নাম করে নয়, দেবনাথের নাম করে। আমাদের লস অব ফেস হল।
যামিনী অবাক হয়। নীল তাকে এসব কিছুই বলেনি! সে আমতা আমতা করে বলল, আমি ঠিক বুঝতে পারছি না।
অর্ধেন্দু দত্ত একটু থামলেন। তারপর চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন, মিসেস চ্যাটার্জি কথাটা শুনতে আপনার খারাপ লাগবে, কিন্তু সরি তা-ও আমাকে বলতে হচ্ছে, আজ অফিসে অনেকেই দুঃখ করে বলছিল, দেবনাথবাবু একজন ভদ্রলোক হিসেবে পরিচিত ছিলেন, তাঁর ফ্যামিলি এরকম হবে আশা করা যায় না।
যামিনী কাতর গলায়, বিশ্বাস করুন আমি কিছুই জানি না।
অর্ধেন্দু দত্ত ফোনেই যেন একটা হাই তুললেন। অবিশ্বাসের হাই। তারপর মুচকি হেসে চাপা গলায় বললেন, এত কী ব্যস্ত থাক যামিনী যে ছেলেমেয়েদের খবর জানতে পারো না? আমার অবশ্য বোঝা উচিত ছিল, বিছানায় তুমি যা পটু তাতে বাড়তি দুটো পয়সা রোজগার করা তোমার পক্ষে কিছুই নয়। ছেলের চাকরিবাকরি নিয়ে তুমি অত চিন্তিত নও। শুনেছি দেবনাথবাবুর বাড়ি ছাড়ার পিছনে নাকি এটাই কারণ। তোমার ঘন ঘন বিছানা বদল। সত্যি নাকি? আই ডোন্ট বিলিভ।
ফোন হাতে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে পাশে রাখা টুলে বসে পড়েছিল যামিনী। বিড়বিড় করে বলেছিল, স্কাউনড্রেল।
আওয়াজ করে হেসে উঠেলেন অর্ধেন্দু দত্ত। বলেছিলেন, ডোন্ট বি সো এক্সাইটেড যামিনী। অত উত্তেজনার কী আছে? তুমি যদি সেদিন টাকা চাইতে আমি কি দিতাম না? অবশ্যই দিতাম। রাজনীতি করি মানে এই নয় প্রফেশনালদের অপছন্দ করি। যাক, যা হবার হয়ে গেছে, পরে কোনওদিন যোগাযোগ হলে রেট বোলো, গুড বাই।
বিপর্যস্ত যামিনী ভেবেছিল পরদিনই দেবনাথের অফিসে চলে যাবে। সবার সামনে অর্ধেন্দু দত্তকে চড় মেরে আসবে। পারেনি। চুপ করে গিয়েছিল। বার বার মনে পড়েছে, দেবনাথের আর একটা সংসারের কথা। তার কাছে সব মান অপমান তুচ্ছ মনে হয়েছে। যখন চোখে জল এসেছে তখনই ভেবেছে, কাঁদবে না। ঘটনা যদি সত্যি হয় তা হলে সে কান্না নিজের কাছে বড় লজ্জার হবে। অর্ধেন্দু দত্ত বেশ্যা বলার থেকেও বেশি লজ্জার। নিজেকে কঠোর করেছে যামিনী। কান্না পেলেও কাঁদেনি, চোখ খুলে রাত জেগেছে। নিজেকে বলেছে শান্ত থাকতে হবে। আরও কটাদিন শান্ত থাকতে হবে। হিন্দোল ফিরলে দেবনাথের নতুন সংসারের ঠিকানা জেনে সে নিজে যাবে।
এই কটা দিন মূলত শান্তই ছিল যামিনী। তবু দুটো গোলমাল করে বসল। তার মধ্যে প্রথমটা ছিল বেশি ঝামেলার।
স্কুলে ক্লাস নিতে গিয়ে একদিন মেজাজ হারাল যামিনী। মেজাজ অনেকদিনই হারাচ্ছিল। একসময়ের হাসিখুশি, মিষ্টি মিস গত কয়েকবছরে খিটখিটে হয়ে উঠেছে ক্রমশ। যে টিচারের কাছে মেয়েদের দোষ এতদিন প্রায় সাত খুন মাপ-এর মতো ছিল, সে-ই অল্পেতেই ধমকধামক দেয়, চাপড় মারে। উঁচু ক্লাসের মেয়েরা বলাবলি করত, বর চলে যাওয়ার পর থেকেই যামিনী মিস বিগড়ে গেছে। আড়ালে তার নাম দিয়েছিল, বিপি মিস, বর পালানো মিস। যামিনী রাগারাগি করলে তারা আড়ালে নিজেদের মধ্যে বলত, এই রে, বিপি মিস খেপেছে।
সেদিন মেজাজ হারানোর ঘটনা বেশি মাত্রায় হয়ে গেল। ক্লাসে বন্ধুর সঙ্গে কথা বলার মতো অতি সামান্য অপরাধে ক্লাস নাইনের এক মেয়েকে বেধড়ক মারল যামিনী। মারতে মারতে বেঞ্চ থেকে টেনে বের করে আনল। মেয়েটি এতই বিস্মিত হয় যে কাঁদতেও ভুলে যায়। কান্না না দেখে আরও রেগে যায় যামিনী। উন্মত্তের মতো হয়ে যায়। এবার হাতের ডাস্টার দিয়ে মারতে থাকে মেয়েটির পিঠে। মেয়েটি যন্ত্রণায় কাতরাতে থাকে।
