হিন্দোল উৎসাহের সঙ্গে বলল, কেন যাবে না? আসানসোলে থাকে। যেদিন ইচ্ছে ফোনে কথা বলতে পারেন। সেরকম হলে একদিন দেখা করতে বলি?
বিশাখা বলল, এটা কী বলছ? যামিনীদি এই বিষয়টা নিয়ে বাইরের কারও সঙ্গে কথা বলতে পারি নাকি! ছিঃ!
যামিনী ঠোঁটের ফাঁকে ব্যঙ্গের হেসে বলল, লজ্জার আর বাকি কী আছে বিশাখা? লুকিয়ে কী লাভ? ভাবছি কিঙ্কি আর নীলকেও বলে রাখব। মনের দিক থেকে ওরা তৈরি হয়ে থাকুক।
বিশাখা হাত নেড়ে বলল, না না একেবারেই নয়, কে কী উড়ো খবর দিল সেটা বিশ্বাস করে বসে থাকতে হবে নাকি?
যামিনী সোফায় হেলান দিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বলল, এরকম একটা উড়ো খবর শুনতে হচ্ছে এটাই তো অপমানের। আমি কোনওদিন কল্পনাও করতে পারিনি, দেবনাথের নামে একথা শুনতে হবে।
হিন্দোল মাথা নামিয়ে বলল, সরি যামিনীদি, ভেরি সরি। আমি সেই জন্যই বিশাখাকে বলেছিলাম, এই ধরনের খবর হান্ড্রেড পার্সেন্ট সিওর না হয়ে বলা উচিত নয়। কিন্তু পরে কী ভাবলাম জানেন, ভাবলাম যতই হোক আপনাকে গোপন করাটা উচিত নয়। আপনার স্বামী…।
সেদিন বীণাপাণি মিষ্টান্ন ভাণ্ডারে বসে একই কথা বলেছিল বিশাখা।
আমিই হিন্দোলকে বললাম সত্যি হোক মিথ্যে হোক কথাটা যামিনীদিকে জানানো দরকার। হিন্দোল বলেছিল, একবার নিজে গিয়ে দেখে আসবে কিনা। আমি বললাম, তোমাকে না জানিয়ে সেটা করা যায় না।
যামিনী বিশাখার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, খারাপ খবরটা কী?
বিশাখা একটু এগিয়ে এল। নীচু গলায় বলতে শুরু করল–
হিন্দোলের কোম্পানিতে যাদব নামে একটা ছেলে কাজ করে। আসানসোলে পোস্টেড। সেখানকার ফ্যাক্টরিতে মেশিন চালায়। একসময় খুব নেশা ভাঙ করত, বাজে সঙ্গে মিশত। আন্ডারওয়ার্ল্ড কানেকশনও ছিল। ওইসব দিকে এরকম হয়। ওর বাবা হিন্দোলকে খুব করে ধরেছিল। একটা কাজ পেলে হয়তো ছেলেটা বদলে যাবে। এসব ছেলেকে কাজে ঢোকানো মুশকিল। ঝুঁকি থাকে। তবে হিন্দোল ঝুঁকি নিল। কাজ দিল ছেলেটাকে। ফরচুনেটলি ছেলেটা ভালোও হয়ে গেছে। হিন্দোলকে খুব ভক্তি শ্রদ্ধা করে। রেগুলার যোগাযোগ রাখে। অফিসের কাজের বাইরেও রাখে। হিন্দোল ওকে নানা কথার মধ্যে দেবনাথদার কথাও বলেছিল একদিন। ও দেবনাথদার একটা ফটো চায়। হিন্দোল বলেছিল, ফটো নিয়ে তুই কী করবি? যাদব বলেছিল, দাও না। যদি কোনওদিন খবর পাই। চার বছর পর সেই খবর পাঠিয়েছে।
যামিনী শাড়ির আঁচল দিয়ে কপাল, ঘাড় মুছল। চোয়াল শক্ত করে বলল, কী খবর?
বিশাখা দুপাশে তাকাল। দোকানের এদিকটা ফাঁকা। দিদিমণিরা থাকলে কেউ এপাশে আসে না। মাঝেমধ্যে শুধু জিগ্যেস করে যায়, কিছু লাগবে কিনা। বিশাখা মাথা নামিয়ে অপরাধীর মতো বলল, দেবনাথদা মনে হয় আর একটা সংসার করেছে।
যামিনী সোজা হয়ে বসে। বলে, কী বললি! কী করেছে?
বিয়ে করেছে। একটা মেয়ে আছে।
যামিনী টেবিলে চাপড় মেরে বলল, আমি বিশ্বাস করি না। কিছুতেই বিশ্বাস করি না।
বিশাখা মুখ তুলে তাড়াতাড়ি বলল, আস্তে, যামিনীদি। আমিও বিশ্বাস করি না। তুমি উত্তেজিত হয়ো না। লোকে শুনতে পাবে। এইজন্যই হিন্দোলকে সকালে বলেছিলাম, এসব কথা বাইরে বলা ঠিক নয়। তোমাকে বাড়িতে ডেকে নিই। হিন্দোল বলল, বাড়িতে বাবা-মা আছে, সেখানে আলোচনা না হওয়াই ভালো। তোমার বাড়িতেও তো নীল, কিঙ্কি কেউ না কেউ থাকে। ওদের সামনে অন্য সব কথা বললেও এটা তো বলা যাবে না।
বিশাখার কথা শুনতে পেল না যামিনী। সে কঠিন গলায় বলল, ওই যাদব ছেলেটা কোথা থেকে খবর পেল?
বললাম না ওর আন্ডারওয়ার্ল্ডে যোগাযোগ আছে।
আন্ডারওয়ার্ল্ড! দেবনাথ কি ওই সব করছে!
যামিনীর মনে হচ্ছে তার সারা শরীরে কেউ গলানো সীসে ঢেলে দিচ্ছে। কিন্তু সে কিছু বুঝতে পারছে না। তবে অনুভূতি ভোতা হয়ে গেছে।
বিশাখা বলল, না না তা নয়, আসলে…।
আসলে কী?
থাক, বাকিটা হিন্দোল তোমাকে বলবে। ও আজ অফিস থেকে ট্যুরে বেরিয়ে যাচ্ছে। সোমবার ফিরবে, তারপর ওর কাছে…
তুই যতটুকু জানিস বল আমাকে। প্লিজ বল।
যামিনী অবাক হয়ে দেখল, তার চোখে জল আসছে না! বিশাখা কিন্তু হাতের রুমাল দিয়ে চোখের কোণ মুছল। বলল, আমি জানি খবরটা মিথ্যে। এতগুলো খবর মিথ্যে হয়েছে, আর এটা হবে না?
তুই আমার কাছে কিছু গোপন করিস না বিশাখা। তোরা ছাড়া আমার পাশে আর কেউ নেই।
বিশাখা হাত বাড়িয়ে যামিনীকে ছুঁল।
আগে বল তুমি বিশ্বাস করবে না।
তুই বল।
বিশাখা আমতা আমতা করে বলল, দেবনাথদা যে মহিলার সঙ্গে থাকে সে নাকি…।
যামিনী শ্বাস টেনে বলল, সে কী?
শি ইজ আ প্রস্টিটিউট। দেবনাথদার সঙ্গে আগে থেকেই সম্পর্ক ছিল।
.
রিকশা নামিয়ে দিয়ে চলে যাওয়ার পর যামিনী খানিকটা ইতস্তত করল। যদিও তার কোনও কারণ ছিল না। রিকশাওয়ালা প্রথমে খারাপভাবে কথা বললেও নামার পর হাত দিয়ে কলোনিতে ঢোকার রাস্তাটা দেখিয়ে দিয়েছে।
এটা দিয়ে চলে যান, সোজা যাবেন একদম। কলোনির ভিতর পৌঁছে যাবেন। একটা পুকুর পড়বে। দুদিকে রাস্তা, বাঁদিকটায় ঢুকবেন না।
ঢুকব না? কেন?
রিকশাওলা জিভ দিয়ে আওয়াজ করে বলল, গেলেই বুঝবেন।
যামিনী সোজাই যাচ্ছে। রাস্তা সরু ছিল। যত এগোচ্ছে আরও ছোট হয়ে আসছে। খানিকটা এগিয়ে থমকে দাঁড়াতে হল। রাস্তার ওপর অনেকটা জায়গা জুড়ে জল জমে আছে। নোংরা জল। পাশ কাটিয়ে যাওয়ার উপায় নেই। গলিটাতে ঢুকতেই একটা বিচ্ছিরি গন্ধ নাকে এসেছিল। সেই গন্ধ ক্রমশ বাড়ছে। দুহাতে শাড়ি সামান্য উঁচু করে যামিনী নোংরা জলে তার জুতো পরা পা রাখল। শরীর ঘিন ঘিন করে উঠল। শুধু শরীর নয়, মনও। এখানে এসে থাকে দেবনাথ! অবশ্য তাতে আশ্চর্য হওয়ার কী আছে? নোংরা জীবন কাটাতে হলে নোংরা জায়গাই লাগে।
