হাওড়া স্টেশনে পৌঁছে সেই কাগজ খুলেছিল নীলাদ্রি। কাগজে দ্রুত হাতে লেখা–
একটা অচেনা মেয়ের দিকে অমন করে তাকিয়ে থাকতে হয়? ছিঃ। আমি খুব রাগ করেছি। আপনি কে? আমি শ্রীময়ী। আমার মোবাইল নম্বর নীচে লিখে দিলাম। আপনি কাল বিকেলে ফোন করে ক্ষমা চাইবেন। আমি অপেক্ষা করব।
নীলাদ্রি পরদিন সকালেই ফোন করেছিল। সেদিন তার অফিসে কাজ ছিল। যাওয়ার পথেই করে। বিকেলে ছুটির পর দেখা করে শ্রীময়ী।
শ্রীময়ী একদিন জিগ্যেস করেছিল, শুধু কি আমার হাসিও সুন্দর, আমি সুন্দর নই?
নীলাদ্রি বলল, হাসি কান্না সুন্দর হলে তবেই মানুষ সুন্দর হয়।
তোমার হাসিও সুন্দর নীল।
নীলাদ্রি মুখ ফিরিয়ে বলেছিল, মনে হয় না।
শ্রীময়ী হেসে বলে, তুমি কী করে বুঝবে? তুমি কি কখনও আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের হাসি দেখেছ? আজই বাড়ি ফিরে দেখবে।
নীলাদ্রি ম্লান হেসে বলল, আমাদের বাড়িতে বহুদিন হাসি বন্ধ শ্রীময়ী। হাসতে ইচ্ছে করলেও আমি বা আমার বোন হাসতে পারি না। কেন পারি না জানো? পাছে লোকে কিছু বলে, বলে এদের বাবা এদের ছেড়ে চলে গেছে তবু এরা হাসে কী করে! এদের লজ্জা করে না!
শ্রীময়ী ঘন হয়ে আসে। নীলাদ্রির পিঠে হাত রেখে বলে, সব ঠিক হয়ে যাবে।
হবে না শ্রীময়ী। মানুষ মারা গেলে একদিন সব ঠিক হয়ে যায়। হারিয়ে গেলে হয় না। মাঝেমধ্যে বড় অপমানিত লাগে।
শ্রীময়ী থামিয়ে দেয়। নীলাদ্রির হাত ধরে বলল, ওসব কথা রাখো। এখন আমার দিকে তাকাও তো, অ্যাই তাকাও বলছি। একটা কবিতা লিখেছি শুনবে?
নীলাদ্রি মুখ ফিরিয়ে হেসে ফেলে। বলে, আমাকে কবিতা শোনাবে! খেয়েছে, আমি কবিতার কী বুঝব?
শ্রীময়ী হেসে বলল, কেন তুমি কি শুধু হাসি বোঝ? হাসিবিশারদবাবু? এবার থেকে তোমাকে কবিতাও বুঝতে হবে। কবিতা রাগ দুঃখ অপমান সব মুছে দিতে পারে।
চায়ের কাপ মুখে তুলতে গিয়ে নীলাদ্রি হাত সরিয়ে নেয়। একটু আগে দেখে আসা মুখটা আবার মনে পড়ল। কী ভয়ঙ্কর! গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করলে মানুষের মুখ এত ভয়াবহ হয়ে যায়! এত বীভৎস। জিভ ঝুলে পড়েছে, চোখ বেরিয়ে এসেছে ঠিকরে। যেন শেষ মুহূর্তে সবটা দেখে নিতে চেয়েছিল! একটা জীবনে যতটা দেখা যায়, যতটা বাকি রয়ে গেল– সব। ভাগ্যিস মানুষটা তার বাবা ছিল না। মা এই দৃশ্য সহ্য করতে পারত না।
আবার গা গুলিয়ে উঠল নীলাদ্রির। সে ভরা চায়ের কাপ রেখে দাম মিটিয়ে বেরিয়ে এল। ফোন করে আজ আসতে বারণ করে দেবে শ্রীময়ীকে? বাড়ি ফিরে যাবে? না থাক, শ্রীময়ীর সঙ্গে থাকলে মনটা ভালো হয়।
মন ভালো হল না নীলাদ্রির। মর্গের কথা শুনে শ্রীময়ীও মুষড়ে পড়ল।
নীলাদ্রি বলল, সরি, তোমাকে বলা ঠিক হয়নি।
শ্রীময়ী ফিসফিস করে বলল, না, তুমি সবই বলবে। সব।
নীলাদ্রি বিষণ্ণ হেসে বলল, একটা সুন্দর হাসির মেয়ে কেমন দুঃখের মধ্যে জড়িয়ে পড়ল বল দেখি।
একশোবার পড়ব। তুমি কিছু লুকোবে না, তোমার সব কষ্ট আমাকে জানাবে। নীলাদ্রি আবার হাসল। সব জানাবে কী করে? সব কি জানানো যায়? সব কি সে নিজেও জানে? জানে না। কেন কিঙ্কির ওপর মায়ের এত রাগ, এত ঘৃণা? কেন অর্ধেন্দু দত্ত তাকে ডেকে নিয়ে গিয়ে বাবার অফিসে পিওনের কাজ দিতে চায়? কীসের প্রতিশোধে সে এই অপমান করে? কেন কিঙ্কির মতো চমৎকার মেয়ে মদ খেয়ে বাড়ি ফেরে? তার থেকেও বড় কথা পাঁচ পাঁচটা বছর পার হয়ে গেল, আজও জানা হল না, সেই মানুষটা কেন সব ছেড়ে চলে গেল? সবাইকে ছেড়ে?
০৭. রাস্তাটা কেমন অন্ধকার
০৭.
এই দুপুরেও রাস্তাটা কেমন অন্ধকার আর স্যাঁতসেঁতে। পথ ভুল হয়নি তো?
পথ ভুল হওয়ার কথা নয়। যামিনী নিজে চিনে আসেনি, রিকশাওলা নিয়ে এসেছে। সে এখানকার লোক। তার ভুল হবে কী করে? বাস স্টপে নেমে হাতের কাছে প্রথম যে রিকশা দেখতে পেয়েছিল তার দিকেই যামিনী এগিয়ে যায়।
শহিদ বলরাম কলোনিতে যাব।
রিকশাওলা সিটে বসে দাঁত খুঁটছিল। জায়গার নাম শুনে লোকটা ভুরু কুঁচকে তাকাল। যামিনীকে আপাদমস্তক দেখল ভালো করে। যেন জায়গার নামের সঙ্গে যামিনীকে মানায় না।
কলোনির মুখে নামবেন তো?
না ভেতরে যাব। সাতাশ বাই তিন নম্বর শহিদ বলরাম কলোনি।
রিকশাওলা জিভ দিয়ে মুখে চকাস ধরনের আওয়াজ করে বলল, ভিতরে যাব না। মুখে নামিয়ে দিতে পারি।
কেন? ভেতরে যাওয়া যায় না? যামিনী অবাক হল।
না যায় না, রাস্তা খারাপ আছে, রিকশা যাবে না।
যামিনী বলল, ঠিক আছে এক্সট্রা পয়সা দেব, চল।
রিকশাওলা গায়ের জালি গেঞ্জি তুলে পেট চুলকোতে চুলকোতে বলল, বেশি দিলেও যাব না, আপনি অন্য গাড়ি দেখুন দিদি। তবে মনে হয় না কেউ ভিতরে ঢুকবে। কলোনির মুখে নামিয়ে দেবে।
ঠিক আছে তাই চল, মুখেই নামিয়ে দেবে। যামিনী বুঝতে পারল কথা বাড়িয়ে লাভ হবে না। নিশ্চয় জায়গাটায় কোনও গোলমাল আছে। সে রিকশাতে উঠে বসল।
যামিনী আজ স্কুলে যাব বলে বেরিয়েও স্কুলে যায়নি। স্টেশনে এসে বর্ধমানের গাড়ি ধরে। সেখান থেকে বাস। হিন্দোল যেমন বলেছিল।
বাস থেকে নেমে কীভাবে যেতে হবে আমি বলতে পারব না। মনে হয় হেঁটেই যাওয়া যায়।
যামিনী শান্ত গলায় বলল, তোমার ওই যাদব লোকটার সঙ্গে একবার কথা বলা যায় না হিন্দোল?
