সেদিন হাসাহাসি করলেও আজ মারাত্মক অন্যায় করেছে কিঙ্কি। কোনওভাবেই তাকে ক্ষমা করা যায় না। এত রাত করা তার উচিত হয়নি। মোবাইল ফোনটাও বন্ধ রেখেছিল! হায়ার সেকেন্ডারি কেন চাকরি করলেও কোনও মেয়ে এই কাজ করতে পারে না। না বলে এত রাত পর্যন্ত বাড়ির বাইরে! বাবা থাকলে, ও এই সাহস পেত? কিঙ্কি কেন? ছেলে হয়ে সে নিজেও একাজ করতে পারত না। নীলাদ্রি ঠিক করেছিল, বাড়ি ফিরেই কিঙ্কিনিকে বকাঝকা করবে। সে সুযোগ পায়নি। কিঙ্কিনি দরজা আটকে শুয়ে পড়েছিল। সেই দরজা সকালেও খোলেনি। মা বাড়ি থাকা পর্যন্ত সে খুলবে না তা-ও বোঝা যাচ্ছিল।
ফোনটা বেজেই যাচ্ছিল। নীলাদ্রি নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়ে ধরল। ভবানীভবন শুনে বিরক্ত গলায় বলল, বলুন কী ব্যাপার।
একটা সুইসাইড কেস হয়েছে। মিডল এজেড মেইল। দুবছর হল বাড়ি ভাড়া নিয়ে থাকত। বাড়ি মানে একতলার একটা ঘর। কাল বিকেলে গলায় দড়ি দিয়েছে। পুলিশ গিয়ে জানতে পেরেছে, লোকটা বাড়িওলার কাছে নাম ঠিকানা সবই মিথ্যে দিয়েছিল। সুটকেসের একপাশে শুধু লেখা আছে ডি. চট্টোপাধ্যায়।
নীলাদ্রি বলল, ডি মানেই দেবনাথ হবে এমনটা ভাবলেন কেন? ডি দিয়ে অনেক নাম হতে পারে।
ওপাশ থেকে লোকটি বলল, আমরা কিছুই ভাবিনি। আপনাদের জানানোটা ডিউটি তাই জানালাম। নইলে আপনারাই তো বলবেন পুলিশ কিছু করে না। এখন বুঝতে পারছেন, পুলিশ করে। পাঁচ বছরের পুরোনো কেসও আমরা তামাদি করিনি।
নীলাদ্রি চাপা গলায় বলল, লাভ তো কিছু হচ্ছে না, অকারণ ছোটাছুটি করছি।
আর দুটো বছর কষ্ট করুন।
তারপর কী? নীলাদ্রি অবাক হল।
সাত বছর হয়ে গেলে গভর্মেন্ট থেকেই ডেথ ডিক্লেয়ার করে দেয় বলে শুনেছি। সার্টিফিকেট পেয়ে যাবেন।
নীলাদ্রি মুখ দিয়ে আওয়াজ করে বলল, জানি, কিন্তু তারপর কি আর ডেডবডি দেখতে হবে না?
লোকটা ব্যঙ্গের গলায় বলল, না দেখলেও চলবে। এত বিরক্ত হতে হবে না।
নীলাদ্রি লজ্জা পেল। বিরক্ত ভাবটা বেশি দেখানো হয়েছে। সত্যি তো পুলিশ কী করবে? তারা যে আজও খবর দিচ্ছে, এটাই অনেক।
যামিনী কোনও উৎসাহ দেখাল না। নীলাদ্রি আত্মহত্যার কথাটা গোপন রেখে বলল, সুটকেসের গায়ে না কোথায় ডি চট্টোপাধ্যায় লেখা পেয়েছে। কী করব? যাব?
তুমি যদি চাও যাবে।
নীলাদ্রি খবরের কাগজ টেনে নিয়ে বলল, যা চাই তা কি করা যায়? পাঁচ বছরে পেরেছি?
যামিনী খানিকটা নিজের মনেই বলল, গিয়ে কোনও লাভ হবে না।
জানি, তবু যেতে হবে। নীলাদ্রি কাগজে মন দেওয়ার চেষ্টা করল।
যামিনী বলল, যদি যাও সঙ্গে কাউকে নিয়ে যেও, একা যেও না।
নীলাদ্রি মুখ তুলে বলল, না, যাওয়ার হলে এবার থেকে আমি একাই যাব। কাউকে বলতে অপমান লাগে। মনে আছে, গতবার প্রণবকে বলেছিলাম, কেমন অ্যাভয়েড করে গেল। বলল ছেলেকে নিয়ে ব্যস্ত আছি। আর নয়।
যামিনী খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, কাল ওখানে গিয়েছিলি না?
কোথায়? বাবার অফিসে?
কিছু হল? কিছু বলল? যামিনী দাঁড়িয়ে পড়ে ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
কাগজের পাতা উলটোতে উলটোতে নীলাদ্রি এমন ভান করল যেন কথাটা শুনতে পায়নি। যামিনী আবার বলল, কীরে, কী হল বললি না তো?
নীলাদ্রি বলল, না, কিছু হয়নি। কথাটা বলেই বুঝল, মিথ্যেটা সহজভাবে বলা হল না।
যামিনী ভুরু কোঁচকালো, হয়নি মানে!
নীলাদ্রি মুখ নামিয়ে বলল, অর্ধেন্দুকাকুর সঙ্গে দেখা হয়নি।
ও, তুই আর ফোন করেছিলি?
নীলাদ্রি কথা ঘুরিয়ে দিয়ে বলল, না, পরে করব। মা শোনো, কিঙ্কিকে নিয়ে তোমার সঙ্গে আমার কথা আছে।
যামিনী রান্নাঘরে ঢুকে যেতে যেতে বলল, আমার নেই।
সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউর ওপর মিষ্টির দোকান দেখে দাঁড়িয়ে পড়ল নীলাদ্রি। এখানে জল পাওয়া যাবে। চা-ও রয়েছে। চা খেলে কি মুখের তেতো ভাবটা কমবে? চায়ের অর্ডার দিয়ে। ভালো করে মুখ ধুল নীলাদ্রি। দোকানের কিশোর ছেলেটি এগিয়ে বলল, আর কিছু খাবেন?
না।
খান না ভালো শিঙাড়া আছে। গরম।
নীলাদ্রি হেসে হাত নাড়ল। ছেলেটা যদি জানত, খানিকক্ষণ আগে তার খদ্দের মর্গের ভেতর ছিল, তা হলে কি এত সহজে শিঙাড়ার কথা বলতে পারত? শ্রীময়ীকে না বললে সে ও কি বুঝতে পারবে? পরশু যখন অ্যাপয়েন্টমেন্ট করেছিল, তখন অবশ্য মর্গের বিষয়টা ছিল না। ফোনে শ্রীময়ী বলেছিল, ছটার সময় নন্দনের সামনে দাঁড়াই তা হলে?
নীলাদ্রি বলল, আবার সেই নন্দন? তোমাকে বলেছি না, জায়গাটা আমার পছন্দ হয় না।
শ্রীময়ী হেসে বলল, কেন বল তো, তোমার নন্দন নিয়ে এত অ্যালার্জি কীসের?
নন্দন নিয়ে নয়, কবিদের ভিড় নিয়ে। শরীরের ভেতর আমার কেমন যেন করে? ইরিটেশন হয়।
আমিও তো কবিতা লিখি। আমাকে নিয়ে ইরিটেশন হয় না তো? কথাটা বলে সুন্দর করে হাসল শ্রীময়ী।
শ্রীময়ীর এই সুন্দর হাসি নীলাদ্রি প্রথম দেখে ঠিক দু-বছর আগে। কলকাতার কোনও এক বিয়েবাড়িতে। মেয়েটাকে আহামরি কিছু দেখতে নয়, চট করে চোখেও পড়েনি। হঠাৎ নীলাদ্রির নজর কাড়ল হাসি। চমকে উঠেছিল। মেয়েটা হেসে শুধু নিজেই সুন্দর হয়নি, চারপাশটাও বদলে দিয়েছে! ঝলমলিয়ে উঠেছে। মানুষের হাসি এত সুন্দর হয়। সেদিন সেই মেয়ে যতবার হেসেছে লুকিয়ে দেখেছিল নীলাদ্রি। বিয়েবাড়ি থেকে বেরিয়ে আসার সময়, সিঁড়ির কোনায় মেয়েটাই তাকে ধরে। সহজভাবে বলে, খেলেন, অথচ মেনুটা নিয়ে গেলেন না? খাবারের নাম তো সব ভুলেই যাবেন। নিন ধরুন। হাতে একটা কাগজ গুঁজে তরতরিয়ে ওপরে উঠে যায় একইরকম সহজ ভঙ্গিতে।
