মা আর পারছি না। রোজ রোজ মরা মানুষের মুখ দেখে আমার শরীর খারাপ হয়ে যাচ্ছে।
কী করবি বল? যামিনী ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে বলত।
আমি আর যাব না।
যামিনী দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলত, ঠিক আছে আমি যাব। আমিই তো যেতে চাই, পুলিশ বলে বাড়িতে পুরুষমানুষ কেউ থাকলে তাকে পাঠাবেন।
নীলাদ্রি বলল, পুলিশকে বলে দেবে, আমরা কেউ যাব না। তুমি আমি কেউ নয়; দয়া করে তারা আমাদের যেন আর খবর না দেয়। অনেক হয়েছে। এনাফ ইজ এনাফ।
যামিনী চুপ করে থেকে বলে, আচ্ছা, তাই বলে দেব।
কদিন পরেই থানা থেকে আবার ফোন আসে–
বাগনানের কাছে রেললাইনের পাশে একটা বডি পাওয়া গেছে ম্যাডাম। অবস্থা খুব খারাপ। মুখ প্রায় বোঝাই যাচ্ছে না। রেলেকাটা যেমন হয় আর কী। একবার যদি চান কাল মর্গে গিয়ে দেখে আসতে পারেন।
আমরা আর ডেডবডি দেখব না বলতে গিয়েও থমকে যায় যামিনী। বুঝতে পারে একথা বলার ক্ষমতা তাদের নেই। ক্লান্ত গলায় বলে, ঠিক আছে আমি যাব।
আপনি!
কেন আমি হলে অসুবিধে?
ওপাশের লোকটা সামান্য হাসল। বলল, আমাদের আর সুবিধে-অসুবিধে কী বলুন। ম্যাডাম? আমাদের কিছু নয়, আমরা বলি, মেয়েমানুষের ওসব সিন না দেখাই ভালো।
মেয়েমানুষ শুনে যামিনী বিরক্ত হয়। কঠিন গলায় বলে, যাদের ঘরে পুরুষমানুষ নেই তারা কী করে?
সে না থাকলে আর কী করা যাবে? আপনি যদি যেতে চান তো যাবেন।
যামিনী খানিকটা আপনমনে বলল, হ্যাঁ, এবার থেকে আমিই যাব।
যামিনীর নাকে-মুখে আঁচল। মর্গের থলথলে চেহারার ডোম প্রথমে ভুরু কুঁচকে যামিনীকে। দেখেছিল। তারপর খানিকটা দ্বিধা নিয়েই মৃতদেহের মুখ থেকে কাপড় সরিয়ে দিল। মুখ নয়, একটা খোবলানো মাংস পিণ্ড! মাথা ঘুরে সেখানেই পড়ে যায় যামিনী। মর্গের কর্মীরা বাইরে ছুটে আসে। খোঁজ নেয়, জ্ঞান হারানো মহিলার সঙ্গে কেউ এসেছে কিনা। না, কেউ আসেনি।
সবাই খুব বকাবকি করেছিল সেবার। বিশাখা বলেছিল, এটা তোমার খুব অন্যায় হয়েছে যামিনীদি। অন্তত নীলকে সঙ্গে নিয়ে যাওয়া উচিত ছিল।
যামিনী বিষণ্ণগলায় বলেছিল, নীল আর পারছে না। আমার কিছু হত না, আসলে ডেডবডিটা খুব খারাপ ছিল। রেল অ্যাক্সিডেন্ট। মুখটা একেবারে বিকৃত হয়ে গেছে। মনে পড়তে শিউরে উঠল যামিনী।
হিন্দোলকে বলতে পারতে।
কত বলব? ছেলেটা তো সবই করছে। অনেকবার মর্গেও তো গেছে। ডেডবডি ঘাঁটার জন্য মানুষকে রোজ রোজ বলতে লজ্জা লাগে। তোদের দেবনাথদা তার বউ, ছেলের জন্য চমৎকার ব্যবস্থা করে দিয়ে গেছে। ডেডবডি দেখার ব্যবস্থা। খুব ভাগ্য করলে সংসার এমন মানুষ পায়।
বিশাখা বলে, এমন করে বলছ কেন যামিনীদি? এমন করে বোলো না।
যামিনী আর পারল না। ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে বলল, এর থেকে যদি দুটো লাইন চিঠি লিখে বলত, আমি ভালো আছি, তোমরা চিন্তা করো না। আমি আর বাড়ি ফিরব না। তা হলে এই খুঁজে বেড়ানোর যন্ত্রণা থেকে আমরা মুক্তি পেতাম।
তারপর থেকে আর কখনও মর্গে যায় না যামিনী। নীলাদ্রিই আবার শুরু করেছে। তবে যত দিন যাচ্ছে, ডাক কমে আসছে। প্রায় এক বছর পরে ভবানীভবন থেকে আজ সকালে ফোন এল। বসার ঘরে ফোনটা বেজে যাচ্ছিল, যামিনী ধরছিল না। কাউকে ধরতে বলছিলও না। স্কুলে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছিল। কাল রাতের পর থেকে কথাবার্তা প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে। কিঙ্কিনি ফেরার পর নীলাদ্রিকে মোবাইলে ফোন করেছিল।
ফিরে এসো।
কিঙ্কি ফিরেছে?
যামিনী থমথমে গলায় বলল, হ্যাঁ, ফিরেছে।
নীলাদ্রি উদবিগ্ন হয়ে বলল, কী হয়েছিল?
জানি না। জানতে চাইও না। মদ খেয়ে ফিরেছে।
নীলাদ্রি একটু চুপ করে থেকে বলে, কী আজেবাজে কথা বলছ মা!
যামিনী বলল, ঠিকই বলছি। তোমার বোন শুধু মদ খায়নি, বাড়িতে ঢুকে মাতালের। মতো আচরণ করছে। তুমি চলে এসো।
হতভম্ব নীলাদ্রি দ্রুত সাইকেল চালিয়ে ফিরেছে। সন্ধের ঝড়-বৃষ্টিতে চারপাশ ঠান্ডা হয়ে গেছে। তার ওপর অনেক রাত। কিঙ্কি মদ খেয়েছে! হতেই পারে না। মা নিশ্চয় বানিয়ে বলছে। মেয়েটার ওপর মায়ের খুব রাগ। বানিয়ে বানিয়ে দোষ খোঁজে। তবে যতই রাগ থাকুক মেয়ে সম্পর্কে এমন বিশ্রী কথা বানিয়ে বলাও ঠিক নয়। কিঙ্কি শুনলে কী হবে? মায়ের সঙ্গে সম্পর্ক আরও তেতো হবে। এর একটা শেষ দরকার। তবে কিঙ্কিটা যেন কেমন হয়ে যাচ্ছে। পাড়ার দু-একজন পুরোনো বন্ধু তাকে বলেছে। বদ্র একদিন বলেছিল, একটা কথা বলব নীল? কিছু মনে করবি না তো?
কী হয়েছে?
বদ্রু একটু দ্বিধা করেই বলল, তোর বোন বলেই বলছি।
কিঙ্কি! কী করেছে কিঙ্কি!
বদ্রু একটা হাত নীলাদ্রির কাঁধে রেখে বলল, তোর বোন তো আমাদেরই বোনের মতো, সেদিন দেখলাম ঠা ঠা দুপুরে রেল গেটের কাছ দিয়ে যাচ্ছে।
নীলাদ্রি বিড়বিড় করে বলল, হয়তো কাজে যাচ্ছিল, পড়তৌড়তে যায়।
পড়তে যাচ্ছিল না, ওকে দেখেই বুঝতে পেরেছি। জায়গাটা তো ভালো নয়। রেলগেটের ভাঙা শিবমন্দিরে একটা বাজে আখড়া আছে, জানিসই তো। মদ-গাঁজা খাওয়া হয়।
নীলাদ্রি বোনকে ডেকে বলেছিল। ভালোভাবেই বলেছিল, রাগারাগি করেনি।
জায়গাটা বাজে, ওদিকে যাসনি।
কিঙ্কিনি উড়িয়ে দিয়ে বলেছিল, কত বাজে? আমার বাড়ির থেকে বাজে তো নয়। আমি আজকাল বাজে জায়গাই পছন্দ করছি দাদা। ভাবছি একদিন ওই ভাঙা মন্দিরে যাব। তুই যদি চাস, চল না।
