রেডিয়োতে গান শোনা লোকটা কাছে ছিল। পাশে রাখা একটা মগ তুলে এগিয়ে দিল হাত বাড়িয়ে। নীলাদ্রি অবাক হয়েই মগটা ধরল। খানিকটা জল রয়েছে। লোকটা গানের তালে মাথা নাড়তে নাড়তেই ইঙ্গিত করল। চোখে মুখে জল ছিটিয়ে নেওয়ার ইঙ্গিত। নীলাদ্রি তাই করল। মগ ফেরত দিয়ে বলল, থ্যাঙ্কিউ। লোকটা গা করল না। মগটা পাশে রেখে ফের মন দিয়ে গান শুনতে লাগল। যেন ঘটনাটা কিছুই না।
মর্গের দরজার মুখে একটা লোক এসে চিৎকার করছে—
নেক্সট, নেক্সট…পরের জন কে আছেন? কৌন হ্যায়… তাড়াতাড়ি আসুন। জলদি জলদি…।
বাইরে অপেক্ষা করা কয়েকজন ছুটে গেল দরজার দিকে। দরজায় দাঁড়ানো লোকটা বাংলা হিন্দি মিলিয়ে ধমক দিয়ে বলল, আরে আরে, এ কেয়া করতা হ্যায়! এক এক করকে আইয়ে। এ ডেডবডি আছে, ভাগ নেহি সকতা। ঠেলাঠেলি করবেন না। ঝামেলা পাকালে দরজা বন্ধ করে দেব।
ধমক শুনে ছুটে যাওয়া মানুষগুলো থমকে দাঁড়াল। ভাবটা এমন যেন, সত্যি তারা ভুলে গিয়েছিল, তারা মৃতদেহ দেখতে যাচ্ছে। ধীরেসুস্থে গেলেও কোনও সমস্যা নেই। তারা একই। ভাবে শুয়ে থাকবে।
পকেট থেকে রুমাল বের করে মুখ মুছল নীলাদ্রি। হাঁটতে শুরু করল। জায়গাটা ছেড়ে যত তাড়াতাড়ি সরে যাওয়া যায় তত ভালো। মুখটা তেতো লাগছে। থুতু কাটছে। মোবাইল বের করে সময় দেখল। শ্রীময়ীর আসতে এখনও একঘণ্টা দেরি। নন্দনের গেটে ঠিক ছটায় দাঁড়াবে। নীলাদ্রি ঠিক করে হাঁটবে। নন্দন পর্যন্ত না পারুক, যতটা পারে ততটা হাঁটবে। তারপর বাসে উঠবে। তার আগে ভালো করে মুখ ধোয়া দরকার। মোবাইল বেজে উঠল। নীলাদ্রি তুলে দেখল পরদায় মা ফুটে উঠেছে।
বল।
গিয়েছিলি?
হ্যাঁ।
যামিনী চুপ করে রইল। নীলাদ্রির সংক্ষিপ্ত উত্তরেই বোঝা যাচ্ছে, কোনও লাভ হয়নি। তবু তার রাগ হল। লাভ হোক বা না হোক ছেলেটা ফোন তো করবে।
আমাকে ফোন করলি না তো!
কিছু হলে করতাম।
যামিনী আবার চুপ করে রইল মুহূর্তখানেক। তারপর বলল, বাঃ আমাকে একবার জানাবি না?
বলছি তো কিছু হলে সঙ্গে-সঙ্গে তোমাকে জানাতাম। একই কথা কী বলব?
যামিনী বলল, কী আর বলবি, মা ওকে পেয়েছি?
নীলাদ্রি বুঝতে পারল কাজটা ভুল হয়েছে। একবার ফোন করা উচিত ছিল। সে বলল, উফ তুমি শান্ত হও তো মা। সবসময় হাইপার হয়ে থাক কেন। এই কারণে কিঙ্কির সঙ্গে তোমার এত লাগে। একটু বাদেই তোমাকে ফোন করতাম। আসলে দিনের পর দিন কী একই কথা বলব? সকালে তুমিই তো বললে গিয়ে কোনও লাভ হবে না। বলনি? এখন আবার রাগারাগি করছ!
যামিনী কথাটা যেন শুনতে পেল না। বলল, আমি জানি, তোরা আমাকে গুরুত্ব দিস না। একটা মানুষ যে অপেক্ষা করে বসে আছে সেটুকুও পর্যন্ত মাথায় থাকে না। যাক, আমি ফোন রাখছি, আমার আজ বাড়ি ফিরতে দেরি হবে।
কোথায় যাবে?
যাব একটা জায়গায়। বিশাখা থাকবে।
যামিনী ফোন কেটে দেওয়ার পরও মোবাইলের দিকে একটু সময় তাকিয়ে হইল নীলাদ্রি। মা কোথায় যাবে এটা নিয়ে তার মাথাব্যথা নেই। নিশ্চয় কোথাও পুজো দিতে বা মানত করতে। পাঁচ বছরে কম করে পাঁচশো জায়গায় পুজো দেওয়া হয়ে গেছে। যে যেমন বুঝিয়েছে। প্রথম বছর সপ্তাহে একদিন উপোস পর্যন্ত শুরু করেছিল। আশ্চর্যের কথা হল, পাঁচ বছর পরেও মানুষটা বাবার জন্য অপেক্ষা করে আছে! সে আর কিঙ্কিনিও কি অপেক্ষা করে? কিঙ্কিনি করে না। বহুদিন আগে সে বলে দিয়েছে, প্লিজ দাদা, এবার তোরা খোঁজাখুঁজি বন্ধ কর। যে লোকটা নিজেই লুকিয়ে আছে তাকে তুই কোথায় পাবি?
লুকিয়ে আছে বলছিস কেন? অ্যাক্সিডেন্ট হতে পারে।
কী বলছিস তুই, অ্যাক্সিডেন্ট হলে ঠিক জানা যেত। এতগুলো থানায় খবর দেওয়া আছে, ফটো পাঠানো হয়েছে, কাগজে বিজ্ঞাপন বেরিয়েছে।
দুর বোকা, এত বড় দেশ রোজ কোথায় কী ঘটছে জানা যায়। পুলিশ জানতে পারে? দেখিস না রোজ কত মানুষ হারিয়ে যাচ্ছে? তাদের কোনও ট্রেস পাওয়া যায় না। পেপারে পড়িস না? বিদেশেও তো কিছু হতে পারে। ধর বাবা ফরেনে কোথাও গিয়ে…।
কিঙ্কিনি ঠোঁটের ফাঁকে হেসে বলল, তোদের মতো বুদ্ধিমান না হলেও আমি একেবারে বোকাও নই দাদা। বাবা রাতারাতি পাসপোর্ট বানিয়ে ভিসা করে জাপান, আমেরিকা বা আবুধাবি চলে গেছে এ কথা আমাকে বিশ্বাস করতে বলিস? সরি। আর যদি দেশের অন্য কোথাও অঘটন কিছু ঘটে থাকে আমি মনে করি সেটাও একই হল। আমাদের ছেড়ে চলে যেতে চেয়েছে বলেই তো কোথাও গেছে। অতবড় একটা মানুষকে তো ছেলেধরা ধরে পাচার করে দেয়নি। নাকি তোর মনে হয় দিয়েছে?
নীলাদ্রি চুপ করে গিয়েছিল সেদিন। বোনের যুক্তি ভাঙতে পারেনি। আজ বোঝে যতটা না সে তার হারিয়ে যাওয়া বাবার জন্য অপেক্ষা করে আছে তার থেকে অনেক বেশি কর্তব্য করছে। শুধু কি কর্তব্য? নাকি আরও কিছু?
মর্গে মৃতদেহ দেখতে আসা নীলাদ্রির এই প্রথম নয়। গত পাঁচ বছরে তাকে বহুবার আসতে হয়েছে। থানা থেকে আনক্লেইমড ডেডবডির খবর দিলেই দেখে যেতে হত। মৃত্যুর তালিকায় কিছুই বাদ যায়নি। বাসে চাপা, ট্রেনে কাটা, জলে ডোবা, আগুনে পোড়া সব পেয়েছে। নীলাদ্রি যখন আসত সঙ্গে কেউ না কেউ থেকেছে। হিন্দোল বেশ কয়েকবার গেছে। পাড়ার আর কলেজের বন্ধুরাও ছিল। একবার দেবনাথের অফিসের অনেকে এল। সেবার সবাই প্রায় নিশ্চিত ছিল, দেবনাথের মৃতদেহই আছে। পুলিশ সেরকমই বলেছিল। একেবারে প্রথম দিকের ঘটনা। হারিয়ে যাওয়ার মাস তিনেকও হয়নি। বড় ধরনের একটা বাস অ্যাক্সিডেন্ট ছিল সেটা। বাস খালে পড়ে গিয়েছিল। ঘটনার পনেরো দিন পরে জানা গেল, তিনটে মৃতদেহ এখনও আনক্লেইমড, নাম-ঠিকানা নেই, খুঁজতেও আসেনি। তার মধ্যে একজনকে নাকি অবিকল দেবনাথ চট্টোপাধ্যায়ের মতো দেখতে। গায়ের জামা, হাতের আংটি, কপালে কাটা দাগ–সব মিলে যাচ্ছে। সবাই ছুটে এল মর্গে। কীভাবে মৃতদহ বাড়ি নিয়ে যাওয়া হবে তা-ও ঠিক হয়ে গিয়েছিল। দেহ। দেখেছিল নীলাদ্রিই। জামা, আংটি দেখতে হয়নি, একঝলক মুখ দেখেই বুঝেছিল, না, মানুষটা তার বাবা নয়। মর্গে অনেকে এলেও ভিতরে ভিড় বাড়ানোর নিয়ম নেই। একা গিয়ে মৃতদেহ দেখে আসত নীলাদ্রি। কোনও রকম সন্দেহ হলে আর একজনকে ডেকে নেওয়া যেত। সেরকম সন্দেহ খুব কমই হয়েছে। হাতে গুনে বার দুই বিভ্রান্ত হয়েছে। মনে হয়েছে হলেও হতে পারে। এই রকম একটা শার্ট ছিল না বাবার? ঘড়ির ব্যান্ডটাও তো এক! প্রথম প্রথম খুব খারাপ লাগত। বীভৎস মৃতদেহের সারি দেখে শিউরে শিউরে উঠত। ভয় করত। রাতে ঘুম হত না। একেকদিন যামিনীকে ডেকে তুলত।
