কিঙ্কিনি ভেবেছিল জলে ডুব দিলে মন খারাপ ভাবটা কাটবে। কাটল না। সে শালিনীদের দিকে তাকিয়ে হাত নাড়ল।
দোয়েল চিৎকার করে বলল, এখন যাব না। অনেকক্ষণ থাকব।
গায়ে ভেজা তোয়ালে জড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে কিঙ্কিনি। শীত শীত করছে। কতক্ষণ এভাবে থাকবে? আবার মুখ তুলে ছাদের দিকে তাকাল। বৈদর্ভী হাতছানি দিয়ে ডাকছে। খারাপ হওয়ার হাতছানি? শরীর কেঁপে উঠল কিঙ্কিনির! কী করবে সে? সে কি খারাপ হবে? দেবনাথ চট্টোপাধ্যায় যে খারাপ মানুষ ছিলেন না। তা হলে? কিঙ্কিনি সিদ্ধান্ত নিল সে বৈদর্ভীর কাছে যাবে। সে খারাপ হবে।
ঘাটে খালি পায়ের জলছাপ রেখে ধীর পায়ে বাড়ির দিকে রওনা দিল সে।
দরজা ভেজিয়ে বৈদর্ভী ঝাঁপিয়ে পড়ল উন্মত্তের মতো। কিঙ্কিনির শরীর থেকে জলমাখা পোশাক টেনে হিঁচড়ে সরিয়ে মুখ ঘষতে লাগল বুকে, ঘাড়ে, গলায়। চুমুতে চুমুতে ভরিয়ে দিল স্তনদুটো। তারপর নতজানু হয়ে বসল কিঙ্কিনির সামনে। দুহাতে কোমর জড়িয়ে ধরে মুখ নামিয়ে দিল চরম আশ্লেষে। চাপা ঘর ঘর আওয়াজ তুলতে লাগল। শিহরণ আর লজ্জায় শীৎকার তুলল কিঙ্কিনি।
একসময় মাথা উঁচু করে জড়ানো গলায় বৈদর্ভী বলল, হয়েছে? হয়েছে তোর?
বৈদর্ভীর পুরুষালী কাঁধে নখ বসিয়ে চোখ বোজা কিঙ্কিনি বলল, প্লিজ, আর একবার… ওয়ানস মোর সোনা…।
ঠোঁটে মুখ নামাল বৈদর্ভী।
বিকেলে রওনা দেবার ঠিক আগে ব্যাগ থেকে মাঝারি মাপের একটা বোতল বের করল দোয়েল। লাজুক হেসে বলল, এটা ভদকা। তোদের জন্য সারপ্রাইজ। যাবার আগে ছাদে বসে। এক ছিপি করে খাব। কেমন হবে?
বৈদর্ভী লাফ দিয়ে বলল, ফাটাফাটি।
শালিনী মাথায় হাত দিয়ে বলল, সর্বনাশ! এই মেয়ে যে বাড়াবাড়ির চরম করছে। বাবাকে না জানিয়ে এসেছে, নদীতে স্নান করেছে, এবার মদের বোতলও বের করছে! কী হবে গো!
কিঙ্কিনি বলল, আমি এসবে নেই বাবা। আমি খাব না।
বৈদর্ভী বলল, আরে বাবা, মোটে তো এক ছিপি খাবি। আর দেরি না করে বসে যা সবাই। পিকনিক মেমরেবল করে রাখি।
শালিনী নাক কুঁচকে বলল, মুখে গন্ধ-টন্ধ থাকবে না তো?
দোয়েল বলল, থাকলে থাকবে। আই ডোন্ট কেয়ার। আমি এখন অ্যাডাল্ট।
বৈদর্ভী বলল, আর বীরত্ব ফলাতে হবে না। তাড়াতাড়ি দাও দেখি, ট্রেন ধরতে হবে।
শালিনী ভয় পাওয়া গলায় বলল, জনার্দনদা দেখে ফেললে কেলো, বড়মামাকে বলে দেবে।
বৈদর্ভী বলল, চিন্তা করিস না আমি নীচের দরজা আটকে এসেছি। চারটে মেয়ে বাড়িতে রয়েছে, কেউ হুট করে ঢুকলেই হল। তোর জনার্দনদা জানবে কী করে?
কাগজের গ্লাসেই ভদকা ঢালা হল। প্রথম চুমুকে গা গুলিয়ে ওঠে, জ্বালা করে ওঠে পেট। তারপর ধীরে ধীরে অজানা একরকমের ভালোলাগা ছড়িয়ে পড়তে লাগল শরীর জুড়ে। মাথা ঝিমঝিম করে উঠল। তখন আকাশে কালো করে মেঘ জমতে শুরু করেছে। নদী থেকে উড়ে আসছে বাতাস। এবার ভদকার সঙ্গে মাপ করে সফট ড্রিঙ্কস মেশানোর দায়িত্ব নিয়েছে। দোয়েল। তার এই গুণ দেখে বাকিরা বিস্মিত! সে নাকি বাবা কাকাকে দেখে শিখেছে। যত সময় যেতে লাগল, জিনিসটার স্বাদ আরও ঘন হয়ে আসতে লাগল।
দুবার গ্লাস শেষ করে যখন তিন নম্বরের পালা শুরু হয়েছে তখন আকাশ পুরোপুরি কালো। হুড়মুড়িয়ে বৃষ্টি এল মিনিট পাঁচেকের মধ্যে। অসময়ের কালবৈশাখী। অসময়ের কালবৈশাখী কি অতিরিক্ত জোর পায়? কে জানে পায় কিনা। তবে মেয়েরা দারুণ মজা পেল। তারা ঠিক করল ঝড়ের মধ্যেই নদীর কাছে যাবে। শালিনী প্রায় টলতে টলতে বলছে, ঝড়ের সময়ে নদীতে একধরনের সঙ্গীত তৈরি হয়। জল ছুঁলে সেই সুর শরীরেও বাজে। কথাটায় বাকিরা হইহই করে উঠল। এখনই নদীর জল ছোঁয়া হবে। জনার্দন বারণ করলে কোনও পাত্তা দেওয়া হবে না।
শালিনী জড়ানো গলায় বলল, হু ইজ জনার্দন? হি ইজ নো বডি।
বৈদর্ভী বলল, বেশি বকবক করলে চ্যাংদোলা করে ছাদ থেকে ফেলে দেব শালাকে।
কিঙ্কিনি হুংকার দিল, চল, নদীতে চল।
.
রাত এগারোটার অল্প কিছু পর বাড়ি ফিরল কিঙ্কিনি। কিছু করার ছিল না। ঝড়ে ওভারহেড তার ছিঁড়ে গেছে। ট্রেন বন্ধ। রাত নটার লাস্ট বাস ধরে ঘুরপথে ফিরতে হয়েছে। নীলাদ্রি সাইকেল নিয়ে স্টেশনে গেছে।
রান্নাঘরের জানলা থেকে মেয়েকে দেখতে পেল যামিনী। দরজা খুলতেই বিশ্রী বিশ্রী গন্ধ ভেসে এল। চমকে উঠল যামিনী। কীসের গন্ধ, মদের না?
ঘরে পা রেখে কিঙ্কিনি জড়ানো গলায় বলল, চমকে উঠলে কেন মা? কী ভেবেছিলে? বাবা এসেছে? হি হি। ঠিক এক কায়দায় বেল বাজিয়েছি না টিং টিং, টিং টিং।
নাকে আঁচল চাপা দিয়ে সরে দাঁড়াল যামিনী।
০৬. বাড়িটা হলুদ রঙের
বাড়িটা হলুদ রঙের। তবে ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়ার কারণে রং ঠিকমতো বোঝা যাচ্ছে না। শেষ বিকেলের আলোকে বলে কনে দেখা আলো। এই আলোয় কালো মেয়েও নাকি ফরসা হয়ে ওঠে। অথচ এই বাড়িটাকে দেখাচ্ছে মলিন। মলিন বাড়ির দরজা দিয়ে ছিটকে বেরিয়ে এল। নীলাদ্রি। কোনওরকমে সিঁড়িকটা টপকে হুড়মুড়িয়ে নেমে গেল নীচে, পেট চেপে উবু হয়ে বসে পড়ল ফুটপাথের ওপর।
রাস্তার দুপাশে অনেকেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। কেউ একা দাঁড়িয়ে, কেউ এসেছে দল বেঁধে। তারা চাপা গলায় কথা বলছে। প্রায় সকলেরই চোখেমুখে উদ্বেগ। বড় রাস্তা থেকে একটু ঢুকে এই গলিটাই থমথমে। কয়েকজন নির্লিপ্ত ভঙ্গির মানুষও রয়েছে। তারা বসে আছে ফুটপাথে, ব্যাটারির খোল আর আধলা ইটের ওপর। বেশিরভাগেরই লুঙ্গির ওপর খালি গা, থলথলে শরীর। কেউ বিড়ি টানছে, কেউ কানের কাছে রেডিয়ো ধরে গান শুনছে। একজনের হাতে অ্যালুমিনিয়ামের থালা। কিছু খাচ্ছে। নীলাদ্রি পাশে বসে বমি করায় তারা বিন্দুমাত্র বিচলিত হল না। পুলিশ মর্গ থেকে ছিটকে বেরিয়ে মানুষ বমি করবে না তো কী করবে? আর এই ছেলে তো নেহাতই ছোট।
