বৈদর্ভী কাছে সরে নীচু গলায় দ্রুত বলল, আমি নদীতে যাব না। আমার পায়ে টান পড়েছে, জলে নেমে মরব নাকি? ওদের রেখে তুই একটু পরেই চলে আয়।
কিঙ্কিনি চারপাশ তাকিয়ে চাপা গলায় বলল, পাগলামি করিস না বৈদর্ভী। আমি এবার সবাইকে বলে দেব ঠিক করেছি।
একইরকম গলা নীচু করে বৈদর্ভী বলল, যা খুশি বল। আই ডোন্ট কেয়ার। আমি তোকে চাই।
বৈদর্ভী এগিয়ে এসে কিঙ্কিনির হাত চেপে ধরল। কিঙ্কিনি হাত সরিয়ে বলল, ছিঃ এসব কী খারাপ কথা বলছিস তুই!
বৈদর্ভী ঠোঁটের কোনায় হেসে বলল, দেখবি খারাপ হলেও খুব ভালো লাগবে। এমনভাবে আদর করব তুই ছাড়তেই চাইবি না।
কানে হাত চাপা দিয়ে কাতর গলায় কিঙ্কিনি বলল, প্লিজ এরকম করিস না। কেউ জানলে বাজে একটা ব্যাপার হবে।
বৈদর্ভী হিসহিসে গলায় বলল, বাজে হলে হবে। অনেক তো ভালো ছিলি লাভ কী হল? আমি তোর জন্য এই ঘরে অপেক্ষা করব।
কিঙ্কিনি বুঝতে পারল তার অসুবিধে হচ্ছে, বৈদর্ভীর কথায় ঝিমঝিম করছে শরীর। আজ নতুন নয়। সেদিন ফোনে কথা বলার সময়ও হয়েছে। তবে এতটা নয়। আজ মেয়েটার শরীর অনেকটা দেখতে পাচ্ছে বলে? জড়তা ঝেড়ে ফেলতে চাইল কিঙ্কিনি। বলল, একদম না।
ঠিক নীচে নামার মুহূর্তে বৈদর্ভী সত্যি সত্যি ঘোষণা করল, সে যাবে না। তার পা ব্যথা করছে। জলে নামার ঝুঁকি নেবে না।
শালিনী বলল, তুই মগ নিয়ে চল, পাড়ে বসে মাথায় জল ঢালবি।
বৈদর্ভী বলল, তোরা যা, ততক্ষণ আমি আমার ইনজিওরড পা-টাকে রেস্ট দিই। তা ছাড়া হঠাৎ মনে পড়ে গেল, জলে আমার ফঁড়া আছে। হয়তো বা ডুবব না, দেখলি কুমির টেনে নিয়ে গেল। বরং একটা কাজ করিস, কিঙ্কিনিকে দিয়ে এক বালতি নদীর জল পাঠিয়ে দিস। নদীতে নামতেও হবে না, আবার নদীর জলে স্নান করাও হবে। হি হি।
দোয়েল বলল, দেখেছিস তো প্রথমে কত বড় বড় কথা বললি, ন্যুড হয়ে জলে নামবি, এই করবি সেই করবি, এখন ঘরে চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকবি বলছিস। ভালোই হয়েছে তোকে যেতে হবে না। টাওয়ালটা দে।
শালিনী বলল, কেন তুই টাওয়াল আনিসনি?
দোয়েল বলল, এনেছি, আমার দুটো লাগবে।
বৈদর্ভী চোখ নাচিয়ে বলল, ওনার একটায় ঢাকে না।
দোয়েল এগিয়ে গিয়ে বৈদর্ভীর পিঠে কিল বসাল।
নির্জন নদীর কাছে পৌঁছে হঠাই মনখারাপ হয়ে গেল কিঙ্কিনির। বৈদর্ভী কেন তার সঙ্গে এমন আচরণ করছে? কই অন্যদের সঙ্গে তো করছে না। তাকে কি খারাপ ভাবে? নিশ্চয় তাই। বাবা চলে যাওয়ার পর তাদের বাড়িটাকে তো অনেকে খারাপ ভাবে। এই পাঁচ বছরে সে কত কী শুনছে। সামনাসামনি বলেনি, আড়ালে আবডালে বলেছে। যখন বয়স ছোট ছিল, বন্ধুদের মায়েরা তার সঙ্গে মেয়েদের মিশতে দিত না। আজও মনে হচ্ছে, সেইসময় অনেকেই বাসে তার পাশে বসত না। ছুতোনাতা করে উঠে যেত। তপজা তো বলেই ফেলেছিল, কিছু মনে করিস না কিঙ্কি, তোর পাশে বসলে মা রাগ করবে। এ তো অল্প কানাঘুষো, আরও কত কী শুনতে হয়েছে! কেউ বলেছে, বাবা নাকি মায়ের জন্যই চলে গেছে। মায়ের অন্য পুরুষমানুষ আছে। অন্য পুরুষমানুষ ব্যাপারটা কী তখন বুঝত না। পরে অর্ধেন্দু দত্তকে দেখে বুঝতে পারল। লোকটা রাতবিরেতে ফোন করত, মা কলকাতায় যাওয়ার আগে গালে পাউডার দিত। একসময় মনে হত, তার প্রতি মায়ের রাগের কারণ, সে এসব জানে বলে। পরে বুঝেছিল না, কারণ অন্য। সে নাকি অনেকটা তার বাবার মতো। নদীর দিকে তাকিয়ে বুকের ভিতরটা অনেকদিন পরে হাহাকার করে উঠল কিঙ্কিনির। কেন সে বাবার মতো! কেন? চলে যাওয়ার সময় বাবা কি তার কথা মনে রেখেছিল? ছোট মেয়েটার জন্য থমকে দাঁড়িয়েছিল এক মুহূর্ত? দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে আবেগ সামলালো কিঙ্কিনি।
ঘাটের অবস্থা বাড়ির মতো অতটা বিপজ্জনক নয়। দোয়েল আর শালিনী ভালো সাঁতার জানে। কিঙ্কিনিও সাঁতার জানে। খুব ছোটবেলায় দেবনাথ ছেলেমেয়েদের পাড়ার সুইমিংপুলে নিয়ে গিয়ে সাঁতার শিখিয়েছিল। তারপর বহু বছর জলে নামা হয়নি। জলে পা দিয়েই কিঙ্কিনির বুকটা ছ্যাৎ করে উঠল। অভ্যেস নেই, যদি কোনও বিপদ হয়? বাড়িতে বলে আসেনি। কাদের সঙ্গে কোথায় গেছে দাদার খুঁজে বের করতে করতেই অনেকটা সময় চলে যাবে। তার থেকে বড় কথা মুডটা হঠাৎই চলে গেছে।
শালিনী চিৎকার করে উঠল, কী হল তোর? থম মেরে গেলি কেন?
কিঙ্কিনি শুকনো হেসে বলল, কই! কিছু হয়নি তো?
দোয়েল বলল, বাড়ির জন্য মন কেমন করছে।
কিঙ্কিনি হেসে বল, আমাদের বংশে ওটি নেই। বাড়ির জন্য মন কেমন করা কী বস্তু আমরা জানি না। আমার বাবার কাণ্ড দেখে বুঝতে পারিস না?
দোয়েল বলল, সরি কিঙ্কি, আমি কিছু মিন করে বলিনি।
কিঙ্কিনি বড় করে হেসে বলল, দুর, আমি কি তাই ভেবেছি? কথাটা মনে হল তাই বললাম। মজার কথা বলতে ভালো লাগে।
শালিনী বলল, ঠিক আছে আয় এবার জলে ঝাঁপ দিই।
দোয়েল বলল, ঝাঁপ-টাপ হবে না, নীচে কী আছে কে জানে বাবা, এমনি সিঁড়ি দিয়ে নামছি। আয় কিঙ্কি।
তারা জলে নেমে পড়ল। এবং দ্রুত খানিকটা দূর চলেও গেল। কিঙ্কিনি সাঁতার কাটতে গেল না, কোনওরকমে কটা ডুব দিয়ে উঠে এল। তোয়ালে দিয়ে মাথা মোছার পর মুখ তুলে দেখল, ভাঙা বাড়ির ছাদে দাঁড়িয়ে আছে বৈদর্ভী। হাসছে। পিছনে ফিরল কিঙ্কিনি। শালিনী আর দোয়েল ঘাট থেকে খানিকটা দূরে জলে হুটোপুটি করছে। ফাঁকা নদীতে কোথা থেকে যেন দুটো বালক এসে জুটেছে! আশ্চর্য! এরা কি জলের তলায় লুকিয়ে ছিল? নাকি ভেসে এল? কিছু একটা হবে। শালিনীদের সঙ্গে ওরা দিদি দিদি বলে মিশে গেছে। গাছের ডালপাতা নিয়ে কী। যেন খোল বানিয়ে খেলছে চারজনে। হাসছে খিলখিল করে। যেন কতদিনের চেনা!
