তালা ভাঙা গেল না। কিন্তু মিনিট পনেরোর চেষ্টায় দরজা থেকে একটা কড়া উপড়ে ফেলা গেল। কাঠের গোড়ায় ঘুণ ধরেছিল। কড়াটা যেন এতদিন অপেক্ষা করছিল, কবে খুলে পড়বে। আজ খুলে গিয়ে হাঁফ ছেড়ে বাঁচল।
ছাদে পা দিয়েই চারজনে লাফিয়ে উঠল। লাফিয়ে ওঠবার মতোই দৃশ্য। বাড়ির ঠিক পিছন দিয়েই নদী চলে গেছে। ঘূর্ণী নদী। ছাদ থেকে সেই নদীর অনেকটাই দেখা যায়।
শালিনী দু-হাত ছড়িয়ে বলল, আমার গ্র্যান্ড গ্র্যান্ড ফাদার শুধু নদীটার জন্যই এখানে বাড়ি কিনেছিলেন। সন্ধের পর ছাদে মাদুর পেতে বসে এস্রাজ বাজাতেন।
কিঙ্কিনি বলল, উরিব্বাস সে তো বিরাট রোমান্টিক ব্যাপার।
নদী চওড়ায় খুব বড় কিছু নয়। ওপাড় দেখা যাচ্ছে স্পষ্ট। ডানপাশে বাঁক নেওয়ার মুখে কয়েকটা নৌকো দাঁড়িয়ে আছে অলসভাবে। হয়, মাছ ধরছে, নয়তো রোদ পোয়াচ্ছে। জলে কোথাও মেঘের ছায়া কোথাও রোদ। হঠাৎ নদীর দিকে তাকালে মনে হবে, কোনও মেয়ে তার শাড়ির আঁচল পেতে দিয়েছে। সেই আঁচলে আলো ছায়ায় নকশা কাটা। চারজনেই ভাঙা পাঁচিলের ধারে গিয়ে নদী দেখতে লাগল।
শালিনী বলল, নদীর এটাই ম্যাজিক। মেয়েদের চট করে মাথা গুলিয়ে দেয়। নদী দেখার জন্য তারা যে-কোনওরকম ঝুঁকি নিতে পারে।
দোয়েল শান্ত অথচ দৃঢ় গলায় বলল, আমি আরও ঝুঁকি নেব। নদীতে স্নান করব। ওই যে ঘাটটা রয়েছে, ওখান থেকে জলে লাফ দেব।
শালিনী হেসে বলল, তোর বাবা যদি জানতে পারে? একেই না বলে এসেছিস, তারপর নদীতে স্নান! বাপরে।
দোয়েল সুর করে বলল, আমি ভয় করব না, ভয় করব না। নদীতে ডুব না মেরে ফিরব না গো ফিরব না।
বৈদর্ভী দোয়েলের পিঠে চাপড় মেরে বলল, সত্যি বীর বটে, তুই হলি নদী বীরাঙ্গনা।
কিঙ্কিনি বলল, আমিও দোয়েলের সঙ্গে জলে নামব। আমাকে বাবা বকতে পারবে না, কারণ সেই সুযোগ নেই।
শালিনী বলল, এসব মাথা থেকে বাদ দে। জলে কারেন্ট আছে। নাম শুনে বুঝতে পারছ না? ঘূর্ণী নদী। তার ওপর এদিকটায় কোনও লোকজনও নেই। ডুবে যাওয়ার সময় যে কেউ লাফ দিয়ে বাঁচাবে, নো চান্স। হাজার চিৎকারেও কেউ আসবে না। শুধু পাখি উড়ে যাবে।
দোয়েল বলল, সেইজন্যেই তো সুবিধে, নিজেদের মতো জলকেলি করব। কেউ দেখবে। না।
বৈদর্ভী বলল, সুইমিং কস্টিউম এনেছিস?
কিঙ্কিনি বলল, দুর নদীতে আবার সুইমিং কস্টিউম কী?
দোয়েল এক দৃষ্টিতে নদীর দিকে তাকিয়ে আছে। বলল, বিকিনি পরে সমুদ্রে নামা যায়, নদীতে যায় না।
শালিনী হেসে বলল, নদীতে মনে হয় শাড়ি ফিট করে। ভেজা গা, কাঁধে কলসি, যেন যমুনার জল থেকে রাধা উঠছে।
সবাই হেসে উঠল। বৈদর্ভী বলল, এক কাজ করি চল, সবাই নুড হয়ে জলে নামি। দেখবি নিমেষের মধ্যে আশপাশে সব গ্রামে খবর হয়ে গেছে, চারটে মেয়ে জামাকাপড় খুলে নদীতে স্নান করছে। দলে দলে লোক আমাদের দেখতে ছুটে আসবে। নদীর পাড় দেখবি মানুষে মানুষে গিজগিজ করছে। আমরা ডুবে যাচ্ছি দেখলে একসঙ্গে হাজার লোক জলে ঝাঁপ মারবে। ভেসে যাওয়ার ভয়ও থাকবে না। হি হি।
দোয়েল বলল, বৈদর্ভীর প্ল্যানটা নট ব্যাড।
শালিনী আঁতকে উঠল, কোনটা? ন্যুড হয়ে জলে নামাটা?
দোয়েল হাত উলটে বলল, সমস্যা কোথায়? ছেলেরা যদি থাকত, এতক্ষণে দেখতিস জামা প্যান্ট খুলে নেমে গেছে।
কিঙ্কিনি বলল, ছেলেরা যা পারে আমরা তা পারি নাকি?
বৈদর্ভী ভাঙা পাঁচিলে হেলান দিয়ে বলল, আমি পারি। যদি তোরা চ্যালেঞ্জ করিস, তা হলে আমি জামাকাপড় খুলে নদীতে গিয়ে সাঁতার কেটে আসতে পারি। আমি ছেলেদের থেকে কম কিছু নই। তোরা কি চ্যালেঞ্জ করছিস?
দোয়েল হেসে বলল, হ্যাঁ করছি। আমি চ্যালেঞ্জ করছি, তুই পারবি না।
বৈদর্ভী সহজভাবে বলল, কী দিবি?
কিঙ্কিনি বলল, অ্যাই তোরা অসভ্যতামি থামাবি?
দেখা গেল, নদী আছে শুনে সকলেই স্নানের জন্য কমবেশি তৈরি হয়ে এসেছে। সুইমিং কস্টিউম না আনলেও অতিরিক্ত একসেট জামা কাপড়, বড় তোয়ালে এনেছে। কিঙ্কিনি আর শালিনী শালোয়ার বের করে পরল, দোয়েল ছোটো ঝুলের পায়জামা। বৈদর্ভীর পোশাকটাই একটু গোলমেলে। শর্ট প্যান্ট স্লিভলেস গেঞ্জি পরে এসে কিঙ্কিনিকে বলল, কেমন দেখাচ্ছে ডার্লিং?
কিঙ্কিনি একটু চমকেই উঠল। বাঃ সুন্দর লাগছে! সুন্দরের থেকে অন্যরকম লাগছে বেশি। গায়ের রং বাদামি আর কালোর মাঝামাঝি হওয়ার কারণে মেয়েটার শরীরে একটা বুনো ভাব ফুটেছে। বৈদর্ভীর এই রূপের কথা আগে জানা ছিল না কিঙ্কিনির। জানার কথাও নয়। এতটা খোলামেলা ভাবে আগে কখনও বৈদর্ভীকে দেখেনি সে। কলকাতায় যে পোশাক রাস্তাঘাটে কোনও ব্যাপার নয়, মফস্সলে সেটাই অসম্ভব। তাই এসব পরে রাস্তায় বেরোনোর কোনও প্রশ্নই ওঠে না। স্প্যাগেটি পরার কারণে বৈদর্ভীর বুক, পিঠ দেখা যাচ্ছে অনেকটা। বুকদুটো তার মতো বড় না, ছোটই। যেন আলগোছে ছুঁয়ে আছে। চওড়া কাঁধে একটু পুরুষালি ধরন। হাত, পায়ের পেশিগুলোও স্পষ্ট। শরীরে মেয়ের নরমসরম ভাবের বদলে একটা কাঠিন্য।
বৈদর্ভী জিভ দিয়ে ঠোঁট চেটে বলল, হাঁ করে কী দেখছিস?
কিঙ্কিনি দ্রুত সামলে নিয়ে বলল, তোর বেহায়াপনা দেখছি। আর বাকি কী রাখলি? এটা তো কলকাতা নয়, পাড়াগাঁয়ের মানুষ এসব দেখলে ভিরমি খাবে। গায়ে টাওয়াল চাপা দিয়ে চল।
