বাবা না থাকলেও কিঙ্কিনি চায়নি, তাদের আউটিং রবিবার হোক। রবিবার মা বাড়িতে থাকবে। কথাবার্তা যতই কমে আসুক, সারাদিন বাইরে থাকলে একটা কৈফিয়ত তো দিতেই হয়। যদিও কিঙ্কিনি দাঁতে দাঁত চেপে অপেক্ষা করে আছে। মাকে বড় ধরনের একটা ধাক্কা দেবে। হায়ার সেকেন্ডারির রেজাল্ট বেরোলেই দেবে। কলকাতার কোনও কলেজে ভরতি হবে। হোস্টেলে থাকবে। এখানকার পাট একেবারের মতো চুকিয়ে চলে যাবে। মা যদি হোস্টেলের খরচ দিয়ে রাজি না হয়, তা হলে নিজে টিউশন বা পার্টটাইম চাকরি করবে। আজকাল কলকাতায় ভদ্রসভ্য ভাবে মেয়েদের কাজের সুযোগ হয়েছে। দাদাকে বললে কোনও একটা কল সেন্টারে ঢুকিয়ে দিতে পারবে না? নিশ্চয় পারবে। ওই লাইনে ওর চেনা। তার খুব ইচ্ছে করে এফ এম রেডিয়োতে আর জে ধরনের কাজ করতে। অনেকেই তার গলার প্রশংসা করে। এই মফস্সল শহরে থাকলে কিচ্ছু হবে না। বাবার মতো একদিন পালাতে হবে।
তাই সপ্তাহের মাঝেই এই ঘূর্ণীতে, শালিনীর মামার ভাঙা বাড়িতে হুল্লোড় করতে আসা হয়েছে। কথায় কথায় একদিন এই বাড়িটার গল্প করেছিল শালিনী। বৈদর্ভী বলল, চল শালিনী, ওখানে আমরা ঘুরে আসি। ভাঙা বাড়িতে পিকনিক দারুণ জমবে। প্রস্তাব শুনে বাকিরা লাফিয়ে উঠল। সেদিন দুজন ছেলেও ছিল। অনীক আর প্রিয়ম। কম্পিউটার ক্লাসে একসঙ্গে পড়ে।
অনীক বলল, আজই সব ফাইনাল করে ফেল। চাঁদা কত করে?
শালিনী বলল, খেপেছিস নাকি? মরে গেলেও বড়মামা, ওই বাড়িতে আমাদের ঢুকতে দেবে না। বাড়ি ভেঙে পড়ছে। অনেক ঘরে দরজা-জানলাই তো নেই, চুরি হয়ে গেছে। কিছুদিন হল, একজন কেয়ারটেকার রাখা হয়েছে। যত তাড়াতাড়ি পারে বাড়িটা বিক্রি করে হাঁফ ছেড়ে বাঁচবে। যতই নদীর ধারে হোক আর গাছপালা থাকুক, পোড়ো বাড়ি রেখে কী হবে? অনেক বছর আগে মামারা দল বেঁধে কলকাতা থেকে গাড়ি করে বেড়াতে যেত। আমিও গেছি। এখন আর কেউ ওদিকে পা বাড়ায় না। সে অবস্থা নেই। মেইনটেন হয় না। বাড়ি বেদখল হওয়ার জোগাড়।
প্রিয়ম বলল, বেদখল হওয়ার আগে আমরা একবার দখল নিতে চাই শালিনী প্লিজ। মাত্র একদিনের জন্য তুই পারমিশান জোগাড় কর। আমি ক্যামেরা নিয়ে যাব। পোড়ো বাড়ির ওপর একটা ফোটো ফিচার করার শখ আমার বহুদিনের। ফেসবুকে হন্টেড হাউস বলে একবার দিয়ে দিতে পারলে মারকাটারি কাণ্ড হবে। তোর বড়মামার বাড়ি দেশে-বিদেশে নাম করে যাবে। দলে দলে সবাই আসতে চাইবে।
শালিনী চোখ পাকিয়ে বলল, খবরদার, ওই সব একদম করবি না, বাড়িটা বিক্রি করতে হবে না? ভূতের বাড়ি বললে আর কেউ নেবে?
অনীক এগিয়ে এসে বলল, প্রিয়ম তা হলে বাদ, আমি যাব।
বৈদর্ভী আড়চোখে তাকিয়ে বলল, চারটে মেয়ের সঙ্গে একা যাবি? ভয় পাবি না?
অনীকের মধ্যে একটা হিরো সাজার শখ আছে। সবসময় ফিটফাট। চোখে সানগ্লাস। সাইকেলটা এমন ভাবে ধরে যেন সাইকেল নয় মোটরবাইক। বুদ্ধিও কমের দিকে। সুযোগ পেলেই মেয়েরা খেপায়। বৈদর্ভীর কথায় চোখ কুঁচকে বলল, কেন ভয় পাব কেন? তোরা কি রাক্ষস?
কিঙ্কিনি বলল, না, রাক্ষস নই মানুষ। কচি পাঁঠা ভালোবাসি।
অনীক ভুরু কুঁচকে বলল, মানে!
দোয়েল ফিক করে হেসে বলল, মানে বুঝে লাভ নেই। চাপ নিস না অনীক।
কিঙ্কিনি বলল, তুই আজই তোর বড়মামার সঙ্গে কথা বল শালিনী। আমরা এই ভয়ঙ্কর জায়গাতে যাব।
শালিনী বলল, কথা বলে লাভ নেই।
প্রিয়ম অতি উৎসাহে বলল, আমরা যদি কথা না বলে নিজেদের মতো চলে যাই? ব্যাপক হবে কিন্তু।
শালিনী মুখ ভেংচে বলল, ব্যাপক হবে না আমার পিঠে ব্যাপক পিটুনি পড়বে?
শেষপর্যন্ত সবই হল। শালিনীর বড়মামা তার ভাঙা বাড়িতে একবেলার জন্য পিকনিকের অনুমতি দিলেন। কিন্তু প্রিয়ম পড়ল জুরে।
বৈদর্ভী বলল, জ্বর না ছাই, মেয়েরা যাবে শুনে বাড়ি থেকে ছাড়ছে না।
অনীকও ডুব দিয়েছে। ফোন করলে তুলছে না। মেসেজ পাঠালে রিপ্লাই দিচ্ছে না। কিঙ্কিনি বলল, ছাগলটার বাড়িতে গিয়ে হামলা করব নাকি?
বৈদর্ভী হাত নেড়ে বলল, দুর দুর, ভয় পেয়ে গেছে। চারটে মেয়ের সঙ্গে একা যাবে শুনে নার্ভ ফেল করেছে। ছেলেদের আমার চিনতে বাকি আছে নাকি? চল আমরা চারজনেই যাব।
একতলা আর দোতলার যে ঘরদুটো জনার্দন খুলে পরিষ্কার করে দিয়েছে দুটোতেই বড় বড় খাট পাতা। তিনতলার ঘরে খাবারের ব্যাগট্যাগ রেখে বৈদর্ভী ছাড়া সকলেই ছুটল ছাদের দিকে। এখনও নদী দেখা হয়নি। ছাদে যেতেই হবে। ছাদের দরজায় সামনে এসে থমকে দাঁড়াতে হল। সত্যি তালা দেওয়া। তালার সাইজও বেশ বড়। কী হবে তা হলে? কিঙ্কিনি আর শালিনী তালা ধরে টানাটানি করল। দরজা নড়বড় করে উঠল, তালার কিছু হল না। একটু পরেই মচকে যাওয়া পা টানতে টানতে ওপরে উঠে এল বৈদর্ভী। তার হাতে একটা বড় সাইজের হাতুড়ি।
শালিনী বলল, এটা কী রে!
বৈদর্ভী মুখ কুঁচকে বলল, হাতুড়ি চিনিস না? মাথায় এক ঘা দিলে বুঝতে পারবি। সিঁড়ির নীচে পেয়ে গেলাম। কেয়ারটেকার কয়লা ভাঙে। এখানে এখনও কয়লা-ঘঁটের উনুন চলে। এটা না পেলেও অবশ্য কিছু এসে যেত না, দরজা খোলার একটা না একটা ব্যবস্থা তো করতেই হত। জনার্দন বলল আর আমরা ভালোমানুষের মতো মুখ করে নদী না দেখে ফিরে গেলাম, তা তো হতে পারে না। নে সর। তালাটা ভাঙতে দে।
