জনার্দন গায়ের চাদরটা ঠিক করতে করতে বলল, ব্যস্ত হতে বললেও হতে পারব না। এখানে উনুন বা জ্বালানির কোনও ব্যবস্থা নেই।
বৈদর্ভী বলল, আমরা গাছের ডালপালা জ্বেলে রান্না করব। আপনি নিশ্চিন্তে কথা মুড়ি দিয়ে ঘুমোতে যান।
মানুষটা কাঁপা কাঁপা পায়ে বাড়ির পিছন দিকে চলে গেল। দোয়েল সেদিকে তাকিয়ে, বিড়বিড় করে বলল, ডেফিনিটলি হি ইজ আ গোস্ট। আমি চ্যালেঞ্জ করে বলতে পারি। ওই মানুষটা ভূত ছাড়া কিছু নয়।
শালিনী চোখ দিয়ে দোয়েলের বুকের ইঙ্গিত করে বলল, ভেতরের ওটা আছে তো রে? অসভ্য ভূত হলে কিন্তু এতক্ষণে খুলে নিয়ে গেছে।
সবাই খুব জোরে হেসে উঠল। বাড়ির বাইরের জংলি বাগান থেকে কয়েকটা পাখি উড়ে গেল পাখার আওয়াজ করে। শালিনী হাত তুলে বলল, বন্ধুগণ, সিদ্ধান্ত মতো এবার তোমরা তোমাদের মোবাইল ফোন বন্ধ করে দাও। বহির্জগতের সঙ্গে আমাদের সব যোগাযোগ এখন থেকে কাট।
রান্নাবান্নার কথাটা ঠিক নয়। খাবার সঙ্গে আনা হয়েছে। কিছুটা কেনা হয়েছে, কিছুটা শালিনী আর দোয়েল বাড়ি থেকে রান্না করে এনেছে। কিঙ্কিনি, বৈদর্ভী বাড়ি থেকে কিছু করেনি বলে তার কেনা খাবারের পুরো খরচটাই দিয়েছে। যখন পিকনিকের পরিকল্পনা হয়, তখনই শালিনী বলেছিল, ওখানে কিন্তু রান্না করা যাবে না। বড়মামা বলেছে, বাড়িটা কয়েকঘণ্টার জন্য খুলে দিতে পারি তার বেশি নয়। রান্নাঘর ভেঙে গেছে। কাছাকাছির মধ্যে কোনও দোকান। বাজারও নেই। খাবারটাবার সব নিয়ে যেতে হবে।
কিঙ্কিনি বলেছিল, তাই হবে। এমন একটা দুর্দান্ত বাড়ি পাচ্ছি, আর কী চাই?
দোয়েল বলেছে, ঠিকই বলেছিস। একেই নদীর পাশে, তারওপর আবার ভাঙা বাড়ি। সোনায় সোহাগা। একেবারে ছোটবেলায় পড়া গল্পের বই।
বৈদর্ভী বলেছে, তুই তো ছোটই। হায়ার সেকেন্ডারি দিয়েছিস ঠিকই কিন্তু তোর সব এখনও ছোটই আছে। এইটুকু।
কথাটা বলে অশ্লীল ইঙ্গিত করেছে বৈদর্ভী। দোয়েল বলেছে, তোর বুঝি বিরাট বড়?
চুপ কর দোয়েল, চুপ কর, বৈদর্ভীর কিন্তু কিছু এসে যাবে না। জামা খুলে দেখিয়ে দেবে, লজ্জায় পালাবার পথ পাবি না।
বাজে কথা থামা। জায়গাটার নাম কী? এখান থেকে কতদূর? আমরা যাচ্ছি কবে?
শালিনী ডান হাত ছাড়িয়ে ঘোষণার ঢঙে বলে, জায়গার নাম ঘূর্ণী। ওখানকার নদীর নামও ঘূর্ণী। ট্রেনে তিন ঘণ্টা। তারপর ভ্যান রিকশাতে আধঘণ্টার একটু বেশি। বাসেও যাওয়া যাবে। ঘুরপথে যেতে হবে। ঘণ্টাখানেক বেশি সময় লাগবে। বন্ধুগণ, বড়মামা যে কোনও সময় ওই ভাঙা বাড়ি বিক্রি করে দেবেন। সুতরাং আর সময় নষ্ট না করে সামনের রবিবার চল ঘুরে আসি।
দোয়েল বলে, রবিবার বাদ দিলে হয় না?
বৈদর্ভী বলে, হোয়াই? রবিবার বাদ কেন? রবিবারই তো ভালো। কম্পিউটার ক্লাস নেই। ট্রেনে ভিড় কম।
দোয়েল বেজার মুখে বলে, বাড়িতে বাবা থাকবে। খ্যাচ খ্যাচ করবে। কোথায় যাচ্ছ? কার সঙ্গে যাচ্ছ? কখন ফিরবে? এখনও ভাবে ক্লাস এইটে পড়ি।
শালিনী বলে, এদিক থেকে আমার কোনও সমস্যা নেই। বাবা আমাকে কিছুতে বারণ করে না। জানে আমি কখনও খারাপ কিছু করব না।
বৈদর্ভী কাধ আঁকায়। ঠোঁট উলটে বলে, এর মধ্যে বাবার কথা উঠছে কেন? আমি কোথায় যাব আমি বুঝব? আঠেরো বছর হয়ে গেছে। নাউ আই অ্যাম অ্যাডাল্ট।
দোয়েল মুখ দিয়ে ফুঃ ধরনের আওয়াজ করে বলে, রাখ তোর আঠেরো! ওসব বলতেই ভালো লাগে। আটতিরিশ হলেও বাবারা পিছনে পড়ে থাকে। আমার দিদির তো বিয়ে করে ছেলেমেয়ে হয়ে গেল। এখনও দেখি বাবা ফোন করে বলে, মিমি, বিকেলের দিকে ঝড়-বৃষ্টি হতে পারে ছাতা নিয়ে বেরোস কিন্তু।
কথাটা বলার সময় বাবার গলা নকল করে দোয়েল। শালিনী বলে, আহা, এটা আর পিছনে পড়ে থাকা কী হল? মেয়েকে বাবারা তো ভালোবেসে এসব বলবেই।
দোয়েল বলে, ও গড, এটা ভালোবাসা? এটাকে বলে বাড়াবাড়ি। একবার কী কেলেঙ্কারি হয়েছিল জানিস? শুনলে তোদের চোখ ছানাবড়া হয়ে যাবে। বিশ্বাসই করবি না। তখন সবে দিদির বিয়ে হয়েছে। দিদি শ্বশুরবাড়িতে। বাবা মাঝেমাঝেই কলকাতায় যায়। একদিন দিদি মাকে ফোন করে বিরাট চেঁচামেচি শুরু করল। কী ব্যাপার না বাবা নাকি মাঝেমধ্যেই বালিগঞ্জে গিয়ে দিদির শ্বশুরবাড়ির সামনে ঘুরঘুর করে। যদি দিদিকে একবারে ছাদে বা বারান্দায় দেখা যায় এই ধান্দা। দিদির এক দেওর হাতেনাতে ধরে ফেলেছে।
শালিনী হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ে। বৈদর্ভী মুখ বেঁকিয়ে বলে, হাসিস না শালিনী। এটা হাসির ব্যাপার নয়। দোয়েলের দিদির অবস্থাটা একবার ভেবে দেখ তো। কী এমব্যারাসিং। এইজন্যই বাঙালি মেয়েরা কমপ্লিট মানুষ হতে পারল না। বাবাদের আদিখ্যেতার কারণে শুধু মেয়ে হয়েই রইল। বাইরের দেশে এসব ফালতু জিনিস নেই।
কথাটা বলতে বলতে বৈদর্ভী কিঙ্কিনির দিকে তাকিয়ে চুপ করে যায়। বাকিরাও তাকায়। বুঝতে পারল, প্রসঙ্গটা নিয়ে এতখানি আলোচনা ঠিক হয়নি। কিঙ্কিনি শুকনো হেসে বলল, তা হলে আমার কোনও সমস্যা নেই বল। বাবা নেই বলে আমি কমপ্লিট মানুষ হতে পারব। তাই না?
শালিনী তাড়াতাড়ি প্রসঙ্গ পালটানোর জন্য বলল, তা হলে রবিবার বাদ।
কিঙ্কিনি আবার হেসে বলল, আমি কী বলব? আমার তো বাবার কেস নেই। যাদের সে ঝামেলা আছে তারা বলবে।
