না, একটুও নয়। হাত সরাতে গেল কিঙ্কিনি।
বৈদর্ভী গাঢ় গলায় বলল, প্লিজ।
কিঙ্কিনির বুকটা ছাত করে উঠল। মেয়েটার গলা অচেনা! সে হাত সরিয়ে পাশ ফিরে। বলল, কী ব্যাপার বল তো। তোর সমস্যাটা কী?
পিছনের সিটে-বসা কেউ বলে উঠল–
এই যে খুকিরা, ঝগড়াঝাটি হলের বাইরে গিয়ে করো। আমাদের ছবিটা দেখতে দাও।
বৈদর্ভী উঠে দাঁড়িয়ে লোকটার সঙ্গে ঝগড়া করতে যায়। তাকে টেনে বসায় কিঙ্কিনি। সেদিনের ঘটনাটায় খটকা লাগলেও ভুলে যেতে চায় কিঙ্কিনি। মনে মনে ভাবে, এটাও বৈদর্ভীর। মাত্রা ছাড়া ফাজলামি। কিন্তু দুদিন বাদে আবার হল। বেশি রাতে বৈদর্ভী ফোন করল। নীচু গলায় বলল, সত্যি তুই আমার সমস্যা বুঝতে পারছিস না?
কিঙ্কিনি ধমক দিয়ে বলল, কী সমস্যা?
বৈদর্ভী তরল গলায় হেসে বলল, ইস ন্যাকা, বুঝেও না বোঝার ভান করছে।
কিঙ্কিনি আমতা আমতা করে বলল, কী বুঝেছি? কী হয়েছে তোর?
আমি তোকে ভালোবাসি এটা তুই বুঝিস না? আই লাভ ইউ।
কী যা-তা শুরু করেছিস বৈদর্ভী? কিঙ্কিনি বোঝাতে চেষ্টা করে।
যা-তায়ের কী হয়েছে? মেয়েরা বুঝি মেয়েদের ভালোবাসতে পারে না।
কিঙ্কিনি একবার ভাবল বলে, বৈদর্ভী, তুই খুব বাড়াবাড়ি করছিস। এরকম করলে তোর। সঙ্গে সবরকম যোগাযোগ বন্ধ করে দেব। তারপর নিজেকে সামলাল সে। যদি তার বুঝতে ভুল হয়? হতেই পারে। বৈদর্ভী হয়তো মাত্রা ছাড়া ঠাট্টাই করছে। ও তো সারাক্ষণই এসবের মধ্যে থাকে। খুব সহজেই খারাপ কথা বলতে পারে। এইজন্য বন্ধুরা ওর কোম্পানি চায়। বলে, ও না থাকলে জমে না। কিঙ্কিনির ঘাবড়ানোর কথাটা নিশ্চয়ই বন্ধুদের বলবে। সে একটা বিরাট লজ্জার ব্যাপার হবে।
কিঙ্কিনি স্মার্ট হওয়ার চেষ্টা করল।
ভালোবাসিস তো মাঝরাতে বলার কী আছে? বন্ধু বন্ধুকে ভালোবাসবে না তো কী করবে?
বৈদর্ভী ওপাশ থেকে বলল, দুর, ওই ভালোবাসা নয়।
কিঙ্কিনি সহজ গলায় হেসে বলল, কোন ভালোবাসা? টাকা-পয়সা চাই?
বৈদর্ভী এক মুহূর্ত দেরি না করে ফিসফিস করে বলল, আমি তোর শরীর চাই। বুঝতে পারিস না কিঙ্কি? দেখিস তোরও ভালো লাগবে। মেয়েদের সঙ্গে মেয়েরা সেক্স করলে নাকি খুব ভালো লাগে।
শরীর শিরশির করে উঠল কিঙ্কিনির। বলল, চুপ কর, চুপ কর, ইস মাগো।
বৈদর্ভী পাত্তা দিল না। বলল, মেয়েরাই একমাত্র মেয়েদের শরীর বোঝে। কোনখানটা ছুঁলে ভালো লাগবে পুরুষমানুষ জানবে কী করে? ওদের সব বাঁধাধরা ব্যাপার। হি হি।
এসব তুই কোথা থেকে শিখলি! কিঙ্কিনি অবাক হয়ে গেছে।
অনেক ম্যাগাজিন আছে, নেট সার্চ করলে ফটোও পাবি। মেয়েতে মেয়েতে ফটো। ওসব ছাড়, আমি তোকে এখন চুমু খেতে চাই।
কথাতেই থামল না মেয়েটা। সত্যি সত্যি টেলিফোনের মধ্যে আওয়াজ করে চুমু খেতে লাগল! কী করবে বুঝতে পারল না কিঙ্কিনি। একটু যেন ভয়ও পেল। মেয়েটা কি পাগল হয়ে গেছে!
এই পর্যন্ত হলে তা-ও কথা ছিল। সেদিন রাতে কিঙ্কিনি বিচ্ছিরি একটা স্বপ্ন দেখল। দেখল, সত্যি সত্যি বৈদর্ভী তাকে চুমু খাচ্ছে! সে বাধা দিচ্ছে না! উলটে মেয়েটাকে জড়িয়ে ধরছে। এটা কেন হবে? তার তো বাধা দেওয়ার কথা।
এরপর থেকে বৈদর্ভী সম্পর্কে অস্বস্তি শুরু হয়েছে। হালকা অস্বস্তি।
ডাকাডাকি করতে হল না, ভাঙা বাড়ির কাছাকাছি যেতেই জবুথবু ধরনের একটা মাঝবয়সি লোক এসে উঁচু লোহার গেটটা খুলে দিল। চার মেয়ে ঢুকে পড়ল হইহই করে। লক্ষ করার বিষয়, বাড়িটা ভাঙা হলেও গেট কিন্তু মজবুত। জং ধরেনি। তার মানে নিয়মিত রং করা হয়। কবজায় তেল পড়ে। বাড়ির মালিক বাড়ির দিকে নজর না দিলেও গেটের দিকে নজর রেখেছেন। সম্ভবত বুঝেছেন, সম্পত্তি রক্ষা করতে হলে, সম্পত্তির থেকে সম্পত্তির ফটকটাই আসল।
শালিনী এগিয়ে গিয়ে বলল, আপনিই জনার্দনদা তো? এই বাড়ির কেয়ারটেকার?
মানুষটার গায়ে চাদর। একটু একটু কঁপছে যেন। অতিথিদের প্রতি বিন্দুমাত্র উৎসাহ না দেখিয়ে সে বলল, হ্যাঁ আমিই জনার্দন! কলকাতা থেকে বাবু খবর পাঠিয়েছেন। আমি দুটোতলায় একটা করে ঘর পরিষ্কার করে রেখেছি। এর বাইরে অন্য কোথাও যাবেন না।
শালিনী তাড়াতাড়ি বলল, আমি জানি। আর ছাদ? ছাদে যাওয়া যাবে তো?
না, যাওয়া যাবে না, ছাদের পাঁচিল ভাঙা। মেঝেতেও ফাটাফুটি হয়েছে। পা দিলে ধসে যেতে পারে।
শালিনী কাচুমাচু গলায় বলল, বড়মামা কিন্তু বলেছিল, আমরা ছাদের একটা দিকে যেতে পারব।
জবুথবু মানুষটা মাথা নীচু করে বিশ্রীভাবে কাশতে লাগল। বুক থেকে ঘঙ ঘঙ ধরনের আওয়াজ বেরোচ্ছে। কাশি শেষ হলে বলল, কলকাতায় উনি বলতে পারেন, কিন্তু কিছু ঘটলে তো আমার ঝামেলা। ছাদে যাওয়া যাবে না। ছাদের তালা খুলব না। বাড়ির বাইরেটা দেখছেন তো? জঙ্গল, আগাছায় ভরতি। সাপখোপ থাকতে পারে। বেশি বাইরে ঘোরাঘুরি না করাই ভালো। যতক্ষণ থাকবেন ঘরে থাকার চেষ্টা করবেন। একতলায় বাথরুম আছে, বাইরে কুয়ো আছে। কিছুটা জল তুলে দিয়ে এসেছি। বাকিটা নিজেদের তুলে নিতে হবে।
শালিনী হতাশ ভঙ্গিতে বলল, আপনাকে ডাকলে পাব তো?
না পাবেন না। আমার জ্বর হয়েছে, আমি ওষুধ খেয়ে শুয়ে পড়ব। আপনারা কি রান্নাবান্না করবেন?
মানুষটার কটকটে ধরনের কথা শুনে সবাই বিরক্ত। দোয়েল রাগ রাগ গলায় বলল, করলে করব। আপনাকে ব্যস্ত হতে হবে না।
