দোয়েল ছেলেদের মতো ঘুসি পাকিয়ে তেড়ে এল। শালিনী বলল, মারপিট পরে করবি। আগে চল।
কিঙ্কিনি সিরিয়াস গলায় বলল, তোর মামারবাড়ি কোথায় শালিনী! নদী? মিথ্যে কথা বলিসনি তো?
বৈদর্ভী কষ্ট করে উঠে দাঁড়িয়েছে। দু-পা খুঁড়িয়ে হেঁটে বলল, কোথায় যাব? আমি গাছে উঠতে পারব না বাবা। আমার পা ভেঙে গেছে।
দোয়েল বলল, চিন্তা করিস না তোকে দড়ি দিয়ে বেঁধে তুলে নেব। গাছ-পিকনিকে তুই আজ সারাক্ষণই দড়িতে ঝুলবি। ট্রাপিজের মতো।
হাসতে হাসতে চারজনেই আরও খানিকটা এগিয়ে গেল।
ভ্যান রিকশা চালক গোড়া থেকেই মজা পাচ্ছে। সেই স্টেশন থেকে যখন এই চার মেয়ে তার গাড়িতে উঠেছে তখন থেকেই। প্যান্ট-জামা পরা মেয়েরা কখনও তার ভ্যানে ওঠেনি। কাঁধে একটা করে ব্যাগ। সবথেকে বড় কথা, এরা নিজেরা ঠিক জানে না কোথায় যাচ্ছে। শুধু বলেছে, নদীর ধারে চল। একটা গাছ দেখলে নেমে পড়ব। অদ্ভুত! নদীর পাশে গাছ কি কম আছে? কথা শুনে মনে হয়েছিল, ঠাট্টা করছে। এখন দেখা যাচ্ছে ঘটনা সত্যি। সত্যি মেয়েগুলো গাছ দেখে নেমে পড়েছে। বাড়িতে ফিরে গল্প করার মতো ব্যাপার। শালিনী এসে ভাড়া মিটিয়ে দিল।
ভ্যানচালক বলল, তোমরা কখন ফিরবে? রাত কোরো না।
অন্য সময় অচেনা কেউ তুমি সম্বোধন করলে শালিনী আজকাল রেগে যায়। এই মানুষটার কথায় মজা পেল। লোকটা শুধু তুমি করে বলছে না, বাবা-কাকার মতো উপদেশও দিচ্ছে।
শালিনী হেসে বলল, কেন? দেরি করলে কী হবে? ভাবছি রাতে থাকব।
এ আবার কী কথা! খবরদার, ও কাজও করো না। রাতে থাকবে কী!
কেন সমস্যা কোথায়? এখানে ভূত আছে নাকি? শালিনী ভুরু কুঁচকে, মিটিমিটি হেসে বলল।
ভ্যানচালক তার গাড়ি পিছনে ঠেলে বলল, ভূত নেই, তবে ডাকাত আছে। জায়গা ভালো না। আলো থাকতে ফিরে যেও। মেয়েছেলে এখানে অন্ধকারে থাকে নাকি! তারওপর আজকাল সন্ধের পর ঝড়বৃষ্টি হচ্ছে।
শালিনী ফিক করে হেসে বলল, মেয়েছেলেদের তুমি নিতে আসবে? আসবে বিকেলে?
ভ্যানচালক সিটে উঠে বলল, ঠিক আছে দেখব। অন্য ভাড়া না থাকলে আসব।
অন্য ভাড়ার কথা ভাবতে হবে না। তুমিও এসো, আমরা পুষিয়ে দেব।
রাস্তা ছেড়ে গাছের দিকে আরও কয়েক পা এগোতেই কিঙ্কিনি হাততালি দিয়ে চিৎকার করে উঠল–
ওই তো, ওই তো!
দোয়েল ছুটে গেল। বৈদর্ভী ছুটতে গিয়ে আউচ বলে পায়ে হাত দিয়ে থেমে গেল। সত্যি তার লেগেছে। গাছের ফাঁক দিয়ে এবার বাড়িটা দেখা গেছে। ভেঙে পড়া একটা পুরোনো বাড়ি। বাড়ি খুব বড় কিছু নয়, তিনতলা। সারা গায়ে সিমেন্টের পলেস্তারা খসে খসে লালচে ইট বেরিয়ে পড়েছে। হঠাৎ দেখলে মনে হবে, একটা ধ্বংসস্তূপ। গা ছমছম করে ওঠে। কিন্তু একটু তাকিয়ে থাকলেই ভালো লেগে যায়। মনে হয়, পেনসিলে আঁকা ছবির মতো। জারুল গাছটা বাড়িটাকে রাস্তা থেকে আড়াল করে রেখেছিল।
কিঙ্কিনি হাত বাড়িয়ে শালিনীর গাল টিপে বলল, থ্যাঙ্কিউ ডার্লিং। তোমার জন্যই এমন দারুণ জায়গায় আসতে পারলাম।
দোয়েল বলল, এবার ঠিকমতো ফিরতে পারলে হয়।
কিঙ্কিনি হাত তুলে বলল, আসতে না আসতে ফেরার কথা বলছিস কেন! আমি সিওর এ বাড়িতে ভূত আছে। আজ ভূতেদের সঙ্গে থাকব।
বৈদর্ভী নাক টেনে বলল, তা থাক, কিন্তু দেখিস অসভ্য ভূতের পাল্লায় পড়িস না।
শালিনী বলল, পড়লে পড়ব। সভ্য মানুষের থেকে অসভ্য ভূত ভালো।
বৈদর্ভী কাঁধের ব্যাগটা শালিনীর দিকে এগিয়ে বলল, ধর তো। আমার পায়ে ব্যথা করছে। আমি একটা অসভ্য ভূতের কথা শুনেছিলাম, বেটা চান্স পেলে মেয়েদের আন্ডারগার্মেন্টস খুলে দিত।
শালিনী থমকে দাঁড়িয়ে বলল, মানে?
বৈদর্ভী বলল, মানে আবার কী! এই ধর একটু পরে দেখলি সব ঠিকঠাক আছে, শুধু তোর জামার ভেতরে ব্রা-টা ভ্যানিশ। তুই জানতেও পারিসনি ভূত কখন খুলে নিয়ে গেছে। এই নিয়ে বেশি লাফালাফি করলে আরও কেলেঙ্কারি করে দেবে। তখন দেখবি…।
বৈদর্ভীর বলার ভঙ্গিটা এমন ছিল, যেন ঘটনাটা সত্যি। সবাই হেসে উঠল। দোয়েল কানে হাত দিয়ে বলল, আর এগোবি না।
বৈদর্ভী আবার বলল, তা হলে নে ব্যাগটা ধর। নইলে কিন্তু সব বলব।
শালিনী মুখ বেঁকিয়ে বলল, পায়ে ব্যথা কাঁধে ব্যাগ নিতে অসুবিধে কোথায়? তুই দুম করে ভ্যান থেকে লাফ দিলি কেন? এই ছেলে-ছেলে ভাবটা এবার ছাড় বৈদর্ভী।
বৈদর্ভী তার ছোট করে কাটা চুলে হাত বুলিয়ে বলল, ছাড়ব কেন? আমি তো ছেলেই। আজ তোরা সাবধানে থাকিস। এক জওয়ান আউর তিন জওয়ানি। সবকটাকে রেপ করব।
দোয়েল বলল, জওয়ান বলছিস কেন? এক খোঁড়া জওয়ান বল।
বৈদর্ভী মুখ পাকিয়ে বলল, চেপে ধরলে খোঁড়া জওয়ানের জোর বুঝতে পারবি।
কিঙ্কিনি ছাড়া সবাই হেসে উঠল। এই ব্যাপারে বৈদর্ভীকে নিয়ে কিঙ্কিনির চাপা একটা অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। এতদিন মেয়েটার যেসব কাজ ঠাট্টা-ইয়ার্কি বলে মনে হত, কদিন হল অন্যরকম লাগছে। গত সপ্তাহে বন্ধুরা মিলে সিনেমা দেখতে গিয়েছিল। হল অন্ধকার হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই বৈদর্ভী চুপিচুপি তার হাত ধরল। হাত ছাড়াতে গেলে ফিসফিস করে বলল, কী হয়েছে? এমন করছিস কেন?
ইয়ার্কি মারিস না বৈদর্ভী। হাত ছাড়। নীচু গলায় বলল কিঙ্কিনি।
ঠিক আছে ছাড়ব। একটু তো ধরি। হাতটা কী নরম রে কিঙ্কিনি!
কিঙ্কিনির বাঁ-হাতের তালুতে আঙুল ঘষতে থাকে বৈদর্ভী। কিঙ্কিনির হাত, শরীর শিরশির করে উঠল।
