মেমসাহেব আমার হাতটা চেপে ধরে বললে, তুমি আমাকে অমন করে অপমান করো না। ইচ্ছা–করলে শাসন করতে পার, বকতে পার। কিন্তু আমার ভালবাসা নিয়ে তুমি ঠাট্টা করো না।
মেমসাহেবের গলার স্বরটা বেশ ভারী হয়ে এসেছিল। আমি বেশ বুঝলাম, এর পরের ধাপেই ঝরঝর করে নেমে আসবে শ্ৰাবণধারা। ওর ঐ চোখে জল আমি ঠিক সহ্য করতে পারব না। বলে তাড়াতাড়ি ওর গাল টিপে বললাম, তুমি কি পাগল হয়েছে? তোমার ভালবাসা নিয়ে আমি ঠাট্টা করব?
মেমসাহেব একটু শান্তি পায়, স্বস্তি পায়। আমার কাঁধের ’পর মাথাটা রাখে। আমি ওর মুখে মাথায় হাত দিয়ে আদর করি। মেমসাহেব আরো আমার কাছে আসে। বলে, কেন যে তোমাকে ভালবেসেছি তা জানি না। হয়ত তুমি আমাকে অমন করে। চেয়েছিলে বলেই আমি তোমাকে ফিরিয়ে দিতে পারিনি। অনেকদিন রাত্রে একলা একলা চুপচাপ তোমার কথা ভেবেছি।
তাই নাকি?
তবে কি! ভাবিয়ে ভাবিয়ে তো তুমি আমাকে শেষ করলে!
তা তো বুঝলাম। কিন্তু আমার কাজকর্ম নিয়ে অত খিটখিটে কর, কেন?
মাথাটা নাড়িয়ে মেমসাহেব বলে, খিটখিট করব না? তোমার মত ফাকিবাজ, আড্ডাবাজ, স্ত্রৈণ লোককে খিটখিটে না করলে কাজ করান সম্ভব?
যার স্ত্রী নেই, সে আবার স্ত্রৈণ হবে কেমন করে?
বাজে বকো না। বিয়ে না করেই যা করছি সে আর বলার নয়। না জানি বিয়ে করলে কি করবে?
জান দোলাবৌদি, মেমসাহেব ভীষণ দুষ্টুমি করত। আমি আদর করলে গলে পড়ত, ভালবাসলে মুগ্ধ হতো, দুষ্টুমি করলে উপভোগ করত। কিন্তু পরে আমাকে টিপ্পানী কাটার বেলায় এমন একটা ভাব দেখাত যে ওরা যেন কোন তাগিদ নেই, প্রয়োজন নেই; সব কিছুই যেন আমার প্রয়োজন।
যাই হোক সেদিন বোটানিক্যাল গার্ডেনে বসে বসে কি বলেছিল। জান? বলেছিল, আমি চাই তুমি অনেক অনেক বড় হও। কেউ যেন বলতে না পারে। আমি আসায় তোমার জীবনটা নষ্ট হয়ে গেল। এইত নিজেকে গড়ে তোলার সময়। এর পরে সংসারধর্মে জড়িয়ে পড়লে আর কি এত অবসর পাবে? পাবে না। এখন তুমি একটি মুহুৰ্তও নষ্ট করবে না, আমি নষ্ট করতে দেব না। আমার সমস্ত স্বপ্ন, সাধনা, শক্তি দিয়ে তোমাকে আমি বড় করবই।
আমি বলি, তুমি নিজেও তো এগিয়ে যাবে। বিদেশ যেতে পার, রিসার্চ করতে পার…
মেমসাহেব অবাক হয়ে বলে, আমি? বিয়ের পর আমি কিছু করব না। চাকরি-বাকরি সব ছেড়ে দেব।
তবে কি করবে?
কি আবার করব? ঘর-সংসার করব।
তাই বলে চাকরি ছাড়বে কেন?
চাকরি করলে আর ছেলেমেয়ে মানুষ করা যায় না। তাছাড়া তোমার যা অদ্ভূত কাজ। কাজের তো কোন ঠিক-ঠিকানাই নেই। সুতরাং দুজনেই বাইরে বাইরে থাকলে চলবে কেন?
আবার পরে বলল, ঘর-সংসারের কাজকর্ম করে তোমার কাজকর্মে একটু সাহায্য করার চেষ্টা করব। তোমার মত জার্নালিস্ট না হতে পারি অন্তত তোমার সেক্রেটারী তা হতে পারব।
এমনি করে একদিন অকস্মাৎ পিছন ফিরে দেখি আমার কর্মজীবনে একটা বিরাট পরিবর্তন এসে গেছে। দৈনন্দিন রিপোর্ট করা ছাড়াও নিত্য নতুন লেখার কাজে বেশ ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। ক্লিপিং করা, ফাইল করা, লাইব্রেরীতে গিয়ে নোটস নেওয়া, বইপত্তর পড়া, তারপর লেখা এবং সে লেখা ছাপাবার ব্যবস্থা করা নিয়ে সারাটা দিন বেশ ব্যস্ততার মধ্যে কেটে যায়। রোজ রোজ মেমসাহেবের সঙ্গে দেখা করারও সময় হয় না।
ইতিমধ্যে উত্তরবঙ্গে সর্বনাশা বন্যা দেখা দিল। ঘরবাড়ি রেললাইন ভেসে গেল, জমিজমা ডুবে গেল, হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ লোক হাহাকার করে উঠল। নিউজ এডিটরের নির্দেশে আমাকে ছুটিতে হলো সেই বিধ্বংসী বন্যার রিপোর্ট করতে। মেমসাহেবকে কলেজে টেলিফোন করে খবরটা দিলাম। স্টেশনে এসে আমার হাতে নির্মাল্য দিয়ে বলেছিল, কালীঘাটের মার নির্মাল্য। কাছে রেখো, কোন বিপদ হবে না।
শুধু নির্মাল্য দিয়েই শান্তি পায় নি। বিস্কুট-জ্যাম-জেলীর একটা বিরাট প্যাকেট দিয়ে বলেছিল, ফ্লাড এরিয়ায় নিশ্চয়ই খাওয়াদাওয়ার মুশকিল হবে। এগুলো রেখে দাও।
দিন পনের বাদে আমি ঘুরে এলাম। মেমসাহেব তো আমাকে দেখে চমকে উঠল, তোমার এ কি অবস্থা?
কি আবার অবস্থা?
কি হয়েছে তোমার শরীর!
অনিয়ম-অত্যাচার হলে শরীর খারাপ হবে, তাতে আশ্চৰ্য হবার–কি আছে? কদিন পরে আবার সব ঠিক হয়ে যাবে।
সেদিন ও আর বিশেষ কিছু বলল না। পরের দিন এক বোতল টনিক নিয়ে হাজির। হুকুম হলো, দুবেলা দু’ চামচ করে খাবে। ভুল হয় না যেন। আর ঘণ্টায় ঘণ্টায় চা খাওয়াটা বন্ধ করা তো।
চা খাওয়া বন্ধ করব?
কথাটা শুনে যেন আকাশ থেকে পড়লে বলে মনে হচ্ছে। প্ৰায় তাই। সাকসেসফুল জার্নালিস্টর হুইস্কি আর আনসাকসেসফুল জার্নালিস্টরা চা খেয়েই তো বেঁচে থাকে। সেই চা ছাড়লে কি এবার হুইস্কি ধবর?
নিশ্চয়ই! তা না হলে আমার কপাল পোড়াবে কেমন করে?
আমি নিয়ম-কানুন ছাড়া, বন্ধনহীন উন্মত্ত পদ্মার মত বেশ জীবনটা কাটাচ্ছিলাম। ছন্নছাড়া জীবনটা বেশ লাগত। কিন্তু এই মেয়েটা এসে সব ওলট-পালট করে দিল। আমাকে প্ৰায় ভদরলোক করে তুলল। সর্বোপরি আমার চোখে, আমার প্রাণে একটা সুন্দর শান্ত সংসার-জীবনের স্বপ্ন এঁকে দিল।
১২. দীর্ঘদিন তৈলমর্দন করেও
বহুজনকে দীর্ঘদিন তৈলমর্দন করেও কলকাতার কোন পত্রপত্রিকায় যখন কোন চাকরি জোটাতে পারলাম না, তখন এক্সপ্রেস আর ক্রনিকেলের ঐ সামান্য অস্থায়ী কাজও বড় ভাল লেগেছিল। কিন্তু কতকাল? মেমসাহেবকে নিয়ে আমার জীবনের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে কোন অনিশ্চয়তা ছিল না। কর্মজীবনে সে অনিশ্চয়তা আমাকে এবার ধীরে ধীরে উদ্বিগ্ন করতে লাগল।
