দৈনন্দিন রিপোর্টিং ছাড়া প্ৰবন্ধ ফিচার ইত্যাদি লেখা ঠিকই চলছিল। কখনও এ কাগজে, কখনও সে কাগজে এসব লেখা ছাপাও হচ্ছিল। কোন কোন লেখা অমনোনীতও হচ্ছিল। মাঝে মাঝে দশ-পনের-বিশ টাকার মানিঅর্ডার বা চেকও পাচ্ছিলাম। মন্দ লাগিছিল না। কিন্তু সাংবাদিক ফেরিওয়ালা হয়ে তো জীবন কাটাতে পারি না। এই অনিশ্চয়তার মধ্যে মেমসাহেবকে তো টেনে আনতে পারি না। তাছাড়া আমাকে পাশ কাটিয়ে অনেক পরিচিত নতুন ছেলেছোকরার দল আলিগলি দিয়ে কর্মজীবনের রেড রোড ধরে ফেলল। নিজেকে বড়ই অপদাৰ্থ, অকৰ্মণ্য মনে হল।
মেমসাহেবকে আমি কিছু বলতাম না। নিজের মনে মনেই অনেক কথাই চিন্তা করতাম। একবার ভাবলাম চুলোয় যাক জার্নালিজম। যদি খেতে পরতে না পেলাম। তবে আবার জার্নালিজম-এর শখ কেন? দুর্বল মুহুর্তে অন্য চাকরি-বাকরি নেবার কথাও তাবলাম। কিন্তু পরের মুহুর্তে নিজের মনকে শাসন করেছি। বুঝিয়েছে, না তা হয় না। এতবড় পরাজয় আমি মেনে নিতে পারব না। যৌবনেই যদি কর্মজীবনের এত বড় পরাজয় মেনে নিই, তবে ভবিষ্যতে কি করব? কি নিয়ে লড়াবা?
আবার তেবেছি কলকাতা ছেড়ে পালিয়ে যাই। দিল্লী, বোম্বে বা লণ্ডন চলে যাই। কিন্তু পালিয়ে যাওয়া বললেই তো আর পালিয়ে যাওয়া যায় না। বিলেতে যেতে অনেক টাকার প্রয়োজন। সে টাকা আমার ছিল না। তাছাড়া বিলেত গিয়ে কি করতাম। বিলেত গিয়ে কেরানীগিরি বা বাস কণ্ডাকটর হয়ে এ্যাণ্টনি সাহেব হবার শখ কোনদিনই আমার ছিল না। কয়েকটা দেশী কাগজের কাজ নিয়ে বিলেতে যাবার পরিকল্পনা অনেক দিন মনের মধ্যে উকিঝুকি দিয়েছিল। কিন্তু তার জন্যও দেশের মধ্যে অনেক ঘোরাঘুরি প্রয়োজন ছিল। আমার পক্ষে তাও সম্ভব হয় নি। রাসবিহারী এভিন্যুর পোস্টাফিসে মেমসাহেবের কিছু টাকা ছিল। আমার কল্যাণে ইতিমধ্যেই তাতে দু’একবার হাত পড়েছিল। সুতরাং ওদিকে হাত বাড়ানোর কথা আর ভাবতে পারলাম না।
দু’একবার অত্যন্ত আজেবাজে চিন্তাও মাথায় এসেছে। ভেবেছি মেমসাহেবকে কিছু না জানিয়ে অকস্মাৎ একদিন যেখানে হোক উধাও হয়ে যাই। যৌবনে প্ৰাণবন্ত সব ছেলেমেয়েরাই প্ৰেমে পড়ে। ক’জন সে প্ৰেম আঁকড়ে ধরে থাকতে পারে?
আমিও না হয় পারলাম না। কি হয়েছে তাতে? মেমসাহেব দু-চারদিন কান্নাকাটি করবে, দু’এক বেলা হয়ত উপবাস করবে। কেউ কেউ হয়ত কয়েকদিন উপহাস করবে, কেউ বা হয়ত কিছু কিছু অপ্রিয় মন্তব্য করবে। কিন্তু তার পর? নিশ্চয়ই সব কিছু ঠিক হয়ে যাবে। ডেভেলপমেণ্ট ডিপার্টমেন্টের আমেরিকা ফেরত ফিসারি এক্সপার্ট সুবোধবাবু নিশ্চয়ই মেমসাহেবকে অপছন্দ করবেন না। তারপর শুভদিনে শুভক্ষণে বুড়ো সাজ্জাদ হোসেনের সানাই বেজে উঠলে সুবোধবাবু জামাই বেশে হাজির হবেন। কিছু পরে মেমসাহেব বধু বেশে কলাতলায় সুবোধকে মালা পরাবে, পুরোহিত মন্ত্র পড়ে সম্পত্তি ট্রান্সফার পাকাপাকি করবেন। তারপর বাসর। একটু হাসি, একটু ঠাট্টা, একটু তামাশা। লোকচক্ষুর আড়ালে হয়ত একটু স্পৰ্শ, একটু অনুভূতি। দেহমনে হয়ত বা একটু বিদ্যুৎ প্রবাহ।
আমার মাথাটা একটু ঝিমঝিম করল। তবে সামলে নিলাম। পরের দিনটার জন্য খুব বেশী চিন্তা হয় না। কিন্তু তার পরের দিন। ফুলশয্যার কথা ভাবতে গিয়েই মাথাটা হঠাৎ ঘুরে উঠল। রজনীগন্ধা দিয়ে সাজান ঐ ফোমড রবারের শয্যায়। মেমসাহেবের একচ্ছত্র অধিপতিরূপে সুবোধ। তিলে তিলে ধীরে ধীরে যে মুকুল চব্বিশ-পঁচিশ বসন্তে পল্লবিত হয়ে আমার মানস-প্রতিমা মেমসাহেব হয়েছে, যার মনের কথা, দেহের উত্তাপ, বুকের স্পন্দন শুধু আমি জেনেছি, পেয়েছি ও অনুভব করেছি, সেই মেমসাহেবের অঙ্গে সুবোধের স্পর্শ। অসম্ভব। তাছাড়া যে মেমসাহেব তার জীবন সর্বস্ব দিয়ে নৈবেদ্য সাজিয়ে আমাকে সুখী, সার্থক করতে চেয়েছে, তাকে এভাবে বঞ্চিত করে পালিয়ে যাব? না, না, তা হয় না।
তবে?
তবে কি করব, তা ভেবে কোন কুলকিনারা পাচ্ছিলাম না। মনে মনে অবশ্য ঠিক করেছিলাম। কলকাতায় আর বেশীদিন থাকব। না। খবরের কাগজের রিপোর্টার হবার দৌলতে বাংলাদেশের বহু প্ৰথিতযশা লব্ধপ্ৰতিষ্ঠ মানুষের সঙ্গে পরিচিত হবার দুর্ভাগ্য আমার হয়েছিল।
দুর্ভাগ্য!
হ্যাঁ, দুর্ভাগ্য। দুৰ্ভাগ্য নয়ত কি বলব বল? কলকাতার ময়দানে মনুমেণ্টের নীচে লক্ষ লক্ষ মানুষ এদের বক্তৃতা শোনে, হাততালি দেয়, গলায় মালা পরায়। প্ৰথম প্ৰথম এদের কাছে এসে নিজেকে কৃতাৰ্থ মনে করতাম। শিক্ষা-সংস্কৃতির ধ্বজা উড়িয়ে যাঁরা সিনেট হল—ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউট—মহাবোধি সোসাইটি হল গরম করে তুলতেন, তাঁদের সবাইকেও ঠিক শ্ৰদ্ধা করে উঠতে পারলাম না। সাড়ে তিন কোটি বাঙালী নারী-পুরুষ-শিশুর দল যাঁদের মুখ চেয়ে বসে আছে, যাদের বক্তৃতা আমরা নিত্য খবরের কাগজের পাতায় ছাপছি, তাঁদের স্বরূপটা প্ৰকাশ হওয়ায় আমি যে কি দুঃখ, কি আঘাত পেয়েছিলাম, তা ভাষায় প্ৰকাশ করতে পারব না। কি কি কারণে এদের আমি শ্রদ্ধা করতে পারিনি, সে-কথা লেখার অযোগ্য। বিদ্যাসাগরের বাংলাভাষা দিয়ে এদের কাহিনী লিখলে বিদ্যাসাগরের স্মৃতির অবমাননা করা হবে, বাংলাভাষার অপব্যবহার করা হবে। তবে যদি এইসব মহাপুরুষের কথা লিখতে পারতাম, যদি সে-ক্ষমতা আমার থাকত, তবে বাংলাদেশের কিছু মানুষ। নিশ্চয়ই বাঁচতে পারত।
