শেষকালে কি করলাম জান? প্ৰবন্ধ লেখা শুরু করলাম। কিছু বইপত্তর আর ম্যাগাজিন পড়ে প্ৰবন্ধ লেখা চালু করলাম। এ-কাজে নিজের বিদ্যার প্রয়োজন ছিল না, প্ৰয়োজন ছিল কিছুটা বুদ্ধির। আস্তে আস্তে সেগুলো ছাপা হতে লাগল, কিঞ্চিৎ অর্থপ্ৰাপ্তিও ঘটত।
একদিন মেমসাহেবকে বললাম, দেখছি কেমন সুন্দর ঠকিয়ে রোজগার করছি।
নিজের বিদ্যা-বুদ্ধি দিয়ে রোজগার করাকে ঠকান বলে না। ‘ਚ বুঝি মেমসাহেব সেদিন বলেছিল, রাম নাম জপ করে যাও। অতশত ভাবতে হবে না, হয়ত একদিন ডাকতে ডাকতেই ভগবানের দেখা পেয়ে যাবে।
মেমসাহেবের পাল্লায় পড়ে সেই যে আমি কলম নিয়ে রাম নাম জপ শুরু করেছি, আজও তা থামাতে পারিনি। বিধাতার বিচিত্র খেয়ালে মেমসাহেব কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। জানি ও হয়ত আমার লেখা পড়তে পায় না বা পারে না। মাঝে মাঝেই মনে হয় কার জন্য লিখব? কিসের জন্য লিখব? ভগবানের কৃপা হলে পঙ্গুও উত্তঙ্গ গিরি লঙ্ঘন করতে পারে। আমি ভগবানের কৃপা লাভ করিনি, ভবিষ্যতেও নিশ্চয়ই করব না। জীবনে যা-কিছু পেয়েছি, যা-কিছু করেছি, তা সবই ঐ পোডাকপালীর জন্য। ভালবাসা দিয়ে মেয়েটা আমাকে পাগল করে দিয়েছে এবং সেই পাগলামি করতে করতে আমি আমার জীবকূটাকে নিয়ে জুয়া খেলেছি। &স্বাভাবিক অবস্থায়, সুস্থ মস্তিকে কোন মানুষ আমার। মত জীবনটাকে নিয়ে এমন খেলা করতে সাহস পাবে না। আমি পেরেছি, আজও কিছু কিছু পারছি কিন্তু আগামীকাল থেকে আর পারব না। পারব কেমন করে বল? ঐ পোড়াকপালী আমাকে গাছে চড়িয়ে দিয়ে মইটা নিয়ে পালিয়ে গেছে। ডালে ডালে, পাতায় পাতায় আমি ঘুরে বেড়াচ্ছি। কিন্তু কত কাল? সবকিছুরই তো একটা সীমা আছে।…
কি লিখতে গিয়ে কি লিখে ফেললাম। মেমসাহেবের কথা লিখতে গেলে আমার মাথাটা ঘুরে উঠে, বুদ্ধিভ্রংশ হয়। উচিতঅনুচিত বিচার করতে পারি না। জীবনে কোনদিন ভাবিনি মেমসাহেবের কথা লিখব। কিন্তু অবস্থার দুর্বিপাকে তোমাকে বাধ্য হয়েই লিখছি। আর কাউকে এসব নিশ্চয়ই লিখতাম না। তবে কি জান, চিঠিগুলো লিখে মনটা অনেক হাল্কা হচ্ছে। ভয়ও হচ্ছে। ডাক্তারবাবুরা যেমন নিজেদের প্রিয় স্ত্রী-পুত্রের চিকিৎসা করতে সঙ্কোচবোধ করেন, আমিও তেমনি আমার মেমসাহেবের কথা লিখতে ভয় পাচ্ছি। ভাব দিয়ে ভাষা দিয়ে, মেমসাহেবের প্রতি সুবিচার করা আমার পক্ষে নিশ্চয়ই সম্ভব নয়। রাগ, অভিমান, ভালবাসার মধ্য দিয়ে ও যে কি আশ্চৰ্যভাবে আমার জীবন-নৌকায় পাল তুলে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল, তা ঠিক করে বলা বা লেখার ক্ষমতা আমার নেই।
খবরের কাগজের রিপোর্টারি করার একটা নেশা আছে। সে নেশা প্ৰতিদিনের। একদিনের উত্তেজনা, নেশ কাটতে না কাটতেই নতুন উত্তেজনার জোয়ার আসে রিপোর্টারদের জীবনে। তাছাড়া সে উত্তেজনার বৈচিত্ৰ্য রিপোর্টারদের আরো বেশী মাতাল করে তোলে। সেই উত্তেজনার ঘোরেই অধিকাংশ রিপোর্টারদের জীবন কেটে যায়। ইচ্ছা বা ক্ষমতা থাকলেও বিশেষ কিছু করা কারুর পক্ষেই সম্ভব হয় না। মেমসাহেব চায় নি আমার জীবনটা শুধু এমনি অহেতুক উত্তেজনায় ভরে থাকুক। সে চেয়েছিল আমার কর্মক্ষেত্ৰকে আরো ব্যাপক ও বিস্তৃত করতে।
বোটানিক্যাল গার্ডেনের মধ্যে ঘুরতে ঘুরতে মেমসাহেব আমার হাত ধরে টেনে নিয়ে বললে, অত দূরে দূরে যাচ্ছ কেন?
এটা তো তোমার ড্রইংরুম নয়—
মেমসাহেব প্ৰায় বিদ্যুৎবেগে আমাকে জড়িয়ে ধরে একটা গাছের আড়ালে নিয়ে গেল। দু’হাত দিয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরে বললে, তুমি রাগ করেছ?
পাগল। রাগ করব কেন?
খুব বেশী রাগ করেছ, তাই না?
বিন্দুমাত্র রাগ করিনি। ভাল চাকরি পেতে হলে ইউ. পি. এস. সির পরীক্ষা দিতে হয়, পাশ করতে হয়; তেমনি তোমাকে পেতে হলেও তো আমাকে কিছু কিছু পরীক্ষা দিতে হবে, পাশ করতে হবে…
ও হাত ধরে আমার মুখটা চেপে ধরে বলে, বাজে কথা বলো না।
বাজে না মেমসাহেব। ইচ্ছা করলে আমার চাইতে অনেক বেশী সুপ্রতিষ্ঠিত কাউকে তুমি তোমার জীবনে পেতে পারতে কিন্তু একবার যখন আমার খেয়াঘাটে পিছলে পড়ে গেছ, তখন আমাকেই তৈরি করার চেষ্টা করছি।
একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ছেড়ে মেমসাহেব বললো, তোমার মনটা আজ বিক্ষিপ্ত। তাই আজ বলব না, দু’চারদিন পরে বলব।
পরে কেন? আজই বল।
আজি বললে তুমি বিশ্বাস করবে না। তোমার ওপর রাগ করতে পারি। কিন্তু অবিশ্বাস কোনদিন করব না।
ঠিক?
ঠিক।
মেমসাহেব আমার হাতটা টেনে নিয়ে নিজের মাথার উপর দিয়ে বলে, আমার মাথায় হাত দিয়ে বল তুমি অবিশ্বাস করবে না।
অত রাগ, অত দুঃখ, অত অভিমানের মধ্যেও আমার মুখে হাসির রেখা ফুটে উঠল। আমি ওর মাথায় হাত দিয়ে বললাম, সত্যি বলছি তোমাকে কোনদিন অবিশ্বাস করব না।
দুজনে একটু এগিয়ে একটু ছায়ায় বসলাম। মেমসাহেব বললো, কর্মজীবনে সুপ্ৰতিষ্ঠিত অন্য কোন ছেলের সঙ্গে আমার বিয়ে হতে পারত, হয়ত সে তোমার চেয়ে ঢের ঢের বেশী রোজগার করত। কিন্তু আমার মনে হয় অতি সুপ্রতিষ্ঠিত পুরুষের হৃদয়ে স্ত্রীর প্রতিষ্ঠা পাওয়া খুব দুর্লভ।
একটু থামে। আবার বলে, দ্যাখ, ঠিক পয়সাকড়ির প্রতি আমার খুব বেশী মোহ নেই। একটু সুখে-স্বাচ্ছন্দ্যে থাকতে ইচ্ছা! করে ঠিকই কিন্তু তাই বলে বেশী পয়সাকড়ি হলে মনটা নষ্ট হয়ে যায়। আমি তা চাই না।
আমি বললাম, তুমি যে প্ৰায় উদয়ের পথের ডায়ালগ বলা শুরু করলে।
