এই ত ইদানীংকালে কত ছেলেমেয়েকে ভালবাসতে দেখলাম, দেখলাম স্বপ্ন দেখতে। ভালবাসা পেয়ে অনেক মানুষের জীবনধারাই পাল্টে যায়। সত্য কিন্তু আমার মেমসাহেব আমাকে শুধু পাণ্টে দেয় নি, সে আমাকে নতুন জীবন দিল। আমাকে ভালবেসে সে অন্ধ হয় নি। রাত্রির অন্ধকারে আমার তপ্ত শয্যায় পলাতকার মত সে আশ্রয় চায় নি, চেয়েছিল আমার সামগ্রিক জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে কিছু-না-কিছু ভূমিকা গ্রহণ করতে।
পুরুষের জীবনে কর্মজীবনের চাইতে বড় কিছু আর হতে পারে। না। কর্মজীবনে ব্যর্থতা, কর্মক্ষেত্রে পরাজয়, পুরুষের মৃত্যু সমান। কর্মজীবনে ব্যৰ্থ, পরাজিত, অপদস্থ পুরুষের জীবনে নারীর তালবাসার কি মূল্য? কোথায় স্বীকৃতি? মেমসাহেব এই চরম বাস্তব সত্য উপলব্ধি করেছিল। আমি কিন্তু, প্রেমের ঘোরে মশগুল ছিলাম। অত শত ভাবনআ-চিন্তা আমার ছিল না। মাদ্রাজ থেকে ঘুরে এসে নতুন কাজ বেশ মন দিয়ে করছি, কিছু টাকাপয়সারও আমদানি হচ্ছে। আমার মনটা খুশীতে ভরে গেল। তাছাড়া কলকাতায় কন্ধে না পেলেও সুদূর মাদ্রাজের একটি ইংরেজী দৈনিক পত্রিকায় কাজ পাবার জন্য সরকারী ও সাংবাদিক মহলে আমার কিছুটা মৰ্যাদা বেড়ে গেল। মনে মনে বোধহয় আমি একটু অহঙ্কারীও হলাম। আবার একদিন মেমসাহেব আমার চৈতন্যে কষাঘাত করল, এবার আর কিছু ভাবছ?
তোমার কথা-না, আমার কথা?
মেমসাহেব চীৎকার করে ওঠে, আঃ! বাজে বকো না।
আমি আশ্চৰ্য হয়ে যাই। তুমি রাগছ কেন?
মেমসাহেব দুই হাঁটুর ওপর মুখখান রেখে কি যেন ভাবছিল। আমার প্রশ্ন শোনা মাত্রই রাগ করে মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিল।
আমি ডাক দিলাম, মেমসাহেব।
জবাব এলো না।
আবার ডাকলাম, মেমসাহেব শোন না! তবুও কোন জবাব এলো না। একটু চিন্তিত হলাম। একটু কাছে এগিয়ে গেলাম। মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললাম, রাগ করছি কেন?
উত্তর এলো, একটু সরে বস। এটা তোমার নিজের ফ্ল্যাটের ডুইং রুম নয়, কলকাতার ময়দান।
বুঝলাম আবহাওয়া খারাপ। ফোর্সল্যাণ্ড করলে আমার প্লেনটাই ক্ষতিগ্ৰস্ত হবে, কোন মঙ্গল হবে না। তাই আবহাওয়ার উন্নতির আশায় আমি উপরে ঘুরপাক খেতে লাগলাম।
বেশ কিছুক্ষণ পরে মেমসাহেব বলল, নিজের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে কোন মানুষ যে এত নির্বিকার হতে পারে, তা তোমাকে দেখার আগে কল্পনা করতে পারিনি।
হঠাৎ এ-কথা বলছ?
সে-কথা বুঝলে কি আমার কপালে কোন দুঃখ থাকত।
আজ তোমার মুড়-টা খারাপ। s
হ্যাঁ। এবার আমার দিকে ঘাড় বেঁকিয়ে বলে, বলব, কেন?
বল না?
আপ্রিয় সত্য বলব?
নিশ্চয়ই।
সহস্থ করতে পারবে?
আমি বীরের মত উত্তর দিলাম, ও-তয়ে কম্পিত নয় বীরের হৃদয়।
একটু ঈষৎ বিদ্রূপের হাসি হাসল মেমসাহেব। বললো, আজেবাজে বকতে লজা করে না? কোথায় নিজেকে আরো এগিয়ে নিয়ে যাবার চেষ্টা করবে-তা নয় শুধু—-
এইত সবে নতুন একটা কাজ শুরু করেছি। আবার নতুন কি করব?
তুমি কি করবে তুমি তা জান না?
আমি সত্যি সত্যিই ভাবনায় পড়ি। ভেবে পাই না কি বলতে চায় ও। আমি ওর হাতটা চেপে ধরে বলি, লক্ষ্মী মেমসাহেব, ফ্রাঙ্কলি বল না কি বলতে চাইছ। রাগারগি করে কি লাভ আছে?
মেমসাহেব বলে, এই নতুন কাজটা পাবার পর মনে হয় তুমি যেন আর কিছু চাও না। তাই না?
নিশ্চয়ই চাই কিন্তু চাইলেই যে পাওয়া যায় না, সে-কথা তো
তুমি জানি।
শুধু মেমসাহেবের কথা ভাবলে জীবনে আর কোনদিন কোন কিছুই পেতে হবে না। নতুন কিছু পেতে হলে ঘুরতে হয়, লোকজনের সঙ্গে দেখাশুনা করতে হয়, পরিশ্রম করতে হয়।।
ও-কথাটা ঠিকই বলেছিল। দৈনন্দিন কাজকর্ম করে বাকি সময়টুকু মেমসাহেবের জন্য গচ্ছিত ছিল।
মেমসাহেব আবার বলে, আমাকে তো অনেক পেয়েছ, প্ৰাণভরে পেয়েছ। এখন তো আমার পক্ষে আর কোন চুলোয় যাওয়া সম্ভব হবে না। আমি চাইলেও কেউ আমাকে নেবে না। সুতরাং তুমি তো নিশ্চিন্ত। এবার তাই বলছিলাম, তুমি নিৰ্ভয়ে নিজের কাজ করতে পার।
আমি নতুন কাজটা পেয়ে একটা ধাপ এগিয়েছিলাম। সঙ্গে সঙ্গে থমকেও দাঁড়িয়েছিলাম। অন্ততঃ কিছুদিন নিশ্চিন্তে থাকবার বাসনা ছিল। মেমসাহেবের তা সহ্য হলো না। মেমসাহেব চাইল কর্মজীবনে যতদিন স্থিতি, মৰ্যাদা না। আসবে, ততদিন বিশ্রাম করার কোন প্ৰশ্নই উঠতে পারে না।
কাগজে তো কত লোক কত আর্টিকেল, কত ফিচার, কত গল্প লেখে, তুমিও তো লিখলে পার।
কোনদিন তো ওসব লিখিনি। রিপোর্ট লেখা ছাড়া আর কিছুই তো লেখার সুযোগ আসে নি।
সুযোগ আসে না, সুযোগ করে নিতে হয়।
তোমাকে তো আগেই লিখেছি ও আমার মত বেশী বক বক করত না। অল্প অল্প কথা দিয়েই মেমসাহেবের মনের ভাব বেরিয়ে আসত।
দোলাবৌদি, আজকাল একদল ডাক্তার যেমন পেটেণ্ট ওষুধ, ক্যাপসুল, ট্যাবলেট, ইনজেকশন দিয়েই সমস্ত চিকিৎসা করে, তেমনি খবরের কাগজের প্রায় সব রিপোর্টাররাই বাধাধরা গদে রিপোর্ট লিখতে পারে। রোগীর জন্য একটা মিকশচারের প্রেসক্রিপশন করতে হলে ডাক্তারবাবুর মস্তিষ্কের ব্যায়াম করতে হয়। মামুলি খবরের কাগজের রিপোর্ট লেখার বাইরে কিছু লিখতে গেলেও রিপোর্টারবাবুদের কিছু কেরামতি থাকা দরকার। আমার সে কেরামতি কোনকালেই ছিল না, আজও নেই। কিন্তু ঠেলার নাম বাবাজী। মেমসাহেবের চোখের জল, দীর্ঘনিঃশ্বাস সহ করা অসম্ভব বলেই আমি বাধ্য হয়ে কলম নিয়ে কেরামতি শুরু করলাম।
আমার সে কি দুর্দিন, তুমি তা কল্পনা করতে পারবে না। কাগজ-কলম নিয়ে বসলেই বুক ফেটে কান্না আসত; তবুও থামতে পারতাম না। কিন্তু চেষ্টা করলেই কি সবকিছু সম্ভব? আমার পক্ষেও সম্ভব হলো না।
