এডিটর মিঃ শ্ৰীবাস্তব খোলাখুলিভাবে জানালেন, বাট আই কাণ্ট পে ইউ মোর দ্যান ওয়ান হানড্রেড।
আমি বললাম, দ্যাটস অল রাইট। লেট আস মেক এ বিগিনিং।
আমার জীবনে এই পরম দিনগুলিতে মেমসাহেবকে স্মরণ ন করে পারিনি। তার প্রতি কৃতজ্ঞতায় আমার মন ভরে যেত। আকাশে কালো মেঘ দেখা দিলেই বৃষ্টিপাত হয় না। সে কালো মেঘে জলীয়বাষ্প থাকা প্ৰয়োজন। একটি ছেলের জীবনে একটি মেয়ের উদয় নতুন কিছু নয়। আমার জীবনেও হয়ত আরো কেউ আসত। কিন্তু আমি স্থির জানি পৃথিবীর অন্য কোন মেয়েকে দিয়ে আমার কর্মজীবনের অচলায়তনকে বদলান সম্ভব হতো না।
তাছাড়া মেয়ের একটু আদর পেতে চায়, ভালবাসা পেতে চায়। একটু সুখ, স্বাচ্ছন্দ্য, একটু বৈশিষ্ট্য প্ৰায় সব মেয়েরাই কামনা করে। সেই সুখ, সেই স্বাচ্ছন্দ্য পাবার জন্য অপ্রয়োজন হলে কোন মেয়ে আত্মত্যাগ করবে? খুব সহজ সরল চিরাচরিত প্ৰথায় মেমসাহেবের জীবনে এসব কিছুই আসতে পারত। কিন্তু সে তা চায় নি। সে চেয়েছিল, নিজের প্ৰেম-ভালবাসা, দরদ-মাধুৰ্য-অনুপ্রেরণা দিয়ে নিম্নবিত্ত বাঙালীঘরের একটি পরাজিত যোদ্ধাকে আবার নুতুন উদ্দীপনায় আত্মবিশ্বাসে ভরিয়ে তুলতে।
আমি জানতাম, আমার কর্মজীবনের এই সাময়িক সাফল্যের কোন স্থায়ী মূল্য নেই, নেই কোন ভবিষ্যৎ। কিন্তু তা হোক। এইসব ছোটখাটো অস্থায়ী সাফল্যের দ্বারা আমার হারিয়ে যাওয়া আত্মবিশ্বাস আমি ফিরে পেলাম। নিজের কর্মক্ষমতা সম্পর্কে একটু আস্থা এলো আমার মনে।
সর্বোপরি এ কথা আমি উপলব্ধি করলাম যে, শুধু কলকাতাকে কেন্দ্ৰ না করেও আমার ভবিষ্যৎ সাংবাদিক জীবন এগিয়ে যেতে পারবে। বরং একবার মাতৃনাম স্মরণ করে ভারতবর্ষের বিস্তীর্ণ রঙ্গমঞ্চে বেরিয়ে পড়লে ফল আরো ভাল হবে।
তুমি বেশ বুঝতে পারছি আমি কেন ও কার জন্য একদিন অকস্মাৎ কলকাতা ত্যাগ করে দিল্লী চলে এলাম। আজ আমার জীবন কত ব্যস্ত, কত বিস্তৃত। সাংবাদিক হয়েও সেই উত্তরে দাৰ্জিলিং, পূর্বে গৌহাটি, দক্ষিণে গঙ্গাসাগর ও পশ্চিমে চিত্তরঞ্জনসিন্ত্রীর মধ্যে আজ আমি বন্দী নই। বাংলাদেশকে আমি ভালবাসি। বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষকে আপনজন মনে করি। কিন্তু সমস্যাসন্ধুল ও নিত্য নতুন চিন্তায় জর্জরিত হয়ে বাঁচবার কথা ভাবতে গেলে ভয় হয়। যদি আনন্দ করে বাঁচতে না পারলাম, যদি এই পৃথিবীর রূপ-রস-গন্ধ-মাধুৰ্য উপতোগ করতে না পারলাম, তবে শুধু পিতৃপুরুষের স্মৃতিবিজড়িত মিউজিয়ামে জীবন কাটাবার মধ্যে মানসিক শান্তি পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু স্বস্তি নিশ্চয়ই পাওয়া যাবে না।
আজ যত সহজে এসব কথা লিখছি ব্যাপারটি তত সহজ নয়। যে পরিবারে জন্মেছি, যে পরিবেশে মানুষ হয়েছি, কৰ্মজীবন শুরু করেছি, সেখানকার সবকিছু সীমিত ছিল। আজ জীবিকার তাগিদে। বহুজনকে বহুদিকে ছড়িয়ে পড়তে হয়েছে, কিন্তু সেদিন জীবিকার জন্য, জীবনধারণের জন্য আমার পক্ষে সোনার বাংলা ত্যাগ করা অত সহজ ও স্বাভাবিক ছিল না। কিন্তু আমি সেদিন হাসিমুখেই হাওড়া স্টেশনে দিল্লী মেলে চড়েছিলাম।
১১. জীবনের গতিপথ ও গতিবেগের পরিবর্তন হয়
তুমিও জান, আমিও জানি, সবাই জানে মানুষের জীবনের গতিপথ ও গতিবেগের পরিবর্তন হয় মাঝে মাঝেই। আমার জীবনেও হয়েছে, হয়ত বা ভবিষ্যতেও হবে। আমার জীবনে মেমসাহেবের উদয় হবার আগে আমার জীবন এমন বিশ্ৰী টিমোতালে চলছিল যে, তা উল্লেখ করারই প্ৰয়োজন নেই। মেমসাহেবকে পাবার পর বেশ কিছুকাল এমন একটা অদ্ভুত নেশায় মশগুল ছিলাম যে, নিজের ভূত-ভবিষ্যৎ নিয়ে মাথা ঘামাবার অবকাশ বা প্ৰয়োজন বোধ করিনি।
কিন্তু তারপর মনের আকাশ থেকে অনশ্চিয়তার মেঘ কেটে যাবার পর আমার জীবনে এক আশ্চৰ্য জোয়ার এলো। প্ৰথম প্ৰথম মুহুর্তের আদর্শন অসহ্য, অসম্ভব মনে হতো। মনে হতো বুঝিবা হারিয়ে গেল, বুঝিবা কিছু ঘটে গেল। আমার মত মেমসাহেবের মনেও এমনি অনেক অজানা আশঙ্কা আসত। পরে দুজনে যখন দুজনকে সমস্ত মন প্ৰাণ দিয়ে পেলাম এবং সে পাওয়ার আনন্দে যখন সমস্ত মনটা মন্দির হয়ে গেল, তখন আস্তে আস্তে আজে-বাজে দুশ্চিন্তা বিদায় নিল।
মেমসাহেবের ঐ হাতটা নিজের হাতের মধ্যে না পেলে, মেমসাহেবের বুকে কান পেতে ঐ পরিচিত স্পন্দন না শুনলে প্ৰথম প্ৰথম মনে মনে বড়ই অস্বস্তি পেতাম। পরিচয়ের গণ্ডি পেরিয়ে ভালবাসার সেই প্ৰথম অধ্যায়ে মনটা বড়ই সংকীর্ণ হয়েছিল। শুধু মেমসাহেবকে কাছে পাওয়া ছাড়া যেন আর কোন চিন্তাই মনের মধ্যে স্থান পেত না। বিশ্ব-সংসারের আনন্দমেলায় আমাদের দুজনকে ছাড়া আর কাউকে কল্পনা করতে পারতাম না। দুনিয়ার আর সবাইকে কেমন যেন ফালতু অপ্রয়োজনীয় মনে হতো। জীবনের শুধু একটি দিক, একটি অঙ্গকেই সমগ্র জীবন ভেবেছিলাম। ধীরে ধীরে আমরা যত আপন হলাম, সঙ্গে সঙ্গে এইসব ভুল ধারণাও বিদায় নিল। তাছাড়া মেমসাহেবের ভালবাসা ক্ৰমে ক্ৰমে আমার সমগ্র জীবনকে, জীবনসত্তাকে আলিঙ্গন করল। শুধু আমার ব্যক্তিগত জীবনের একান্ত প্ৰিয়সঙ্গিনী নয়, শুধু যৌবনের আনন্দমেলার পার্শ্ববর্তিনী নয়, মেমসাহেব আমার সামগ্রিক জীবনের অংশীদার হলো।
তুমি তো জান আমাদের পূর্বপুরুষরা শুধু জানতেন পুত্রার্থে ক্রিয়তে ভাৰ্যা। আমাদের দেব-দেবীদের ইতিহাস পড়লে একএকজনের শত শত সহস্ৰ সহস্ৰ সন্তানের জননী হবার কাহিনী জানা যায়। সমাজের বিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সহস্র বা শত সন্তানের জননী হওয়ার কাহিনী অতীতের ইতিহাসের পাতায় বন্দী হয়েছে। কিন্তু তবুও স্বামীর শয্যা আর রান্নাঘরের মধ্যেই আমাদের নিরানব্বই ভাগ নারীর জীবন সীমিত।
