মেমসাহেব আমার বুকের মধ্যে আত্মসমৰ্পণ করে বলল, আমি জানি তুমি এমনি করে ধাপে ধাপে এগিয়ে যাবে।
তুমি জান?
হ্যাঁ।
কেমন করে জানলে?
খবরের কাগজ বলতে তুমি যে পাগল সে কথাটা কি আমি জানি না? তারপর বেশ গর্ব করে মেমসাহেব বলল, খবরের কাগজকে না। তালবাসলে এমন পাগল কেউ হতে পারে না।
তাতে কি হলো?
কিছু হয় নি, মেমসাহেব বোধ করি আর আমার প্রশংসা করা সমীচীন মনে করে না।
একটা দমকা ঝড়ো হাওয়া এলো। সামনের সমুদ্রমুখী ভাগীরথীর অনন্ত জলরাশি ফুলে ফুলে নাচানাচি শুরু করে। ভাগীরথী যেন আরো তেজে, আরো আনন্দে সমুদ্রের দিকে দৌড়াতে লাগল।
মেমসাহেব উঠে বসে বলে, এই শান্ত গঙ্গা হিমালয়ের কোল থেকে প্ৰায় হাজার দেড়েক মাইল চলাবার পর সমুদ্রের কাছাকাছি এসে কত বিরাট, কত বেশী প্ৰাণচঞ্চল। মানুষও ঠিক এমনি। সঙ্কীর্ণ গণ্ডি থেকে বৃহত্তর জীবনের কাছে এলে মানুষ অনেক উদার, অনেক প্ৰাণচঞ্চল হয়। তাই না?
আমি চুপ করে থাকি। কোন কথা না বলে মেমসাহেবের উদার গভীর চোখ দু’টোকে দেখি।
মেমসাহেব খোপাটা খুলে আমার কাঁধের ওপর মাথাটা রেখে দেয়। সামনে বুকের পর দিয়ে তার দীর্ঘ অবিন্যস্ত বিনুনি লুটিয়ে পড়ে নীচে।
আমি বলি, আচ্ছা মেমসাহেব, তুমি তো আমার উন্নতির জন্য এত ভাবছি, এত করছি কিন্তু আমি তো তোমার জন্য কিছু করছ
আমার জন্য আবার কি করবে? আমার জন্যই তো তুমি তোমাকে তৈরি করছ।
কিন্তু তবুও—
এতে কোন কিন্তু নেই। হাজার হোক আমি মধ্যবিত্ত বাঙালীঘরের মেয়ে। যতই লেখাপড়া শিখি না কেন, স্বামী-পুত্ৰ নিয়েই তো আমার ভবিষ্যৎ।
মেমসাহেব থামে। দৃষ্টিটা তার চলে যায় দিগন্তের অন্তিম সীমানায়। মনটাও বোধহয় হারিয়ে যায়। ভবিষ্যতের অজানা পথে। আমি বেশ বুঝতে পারি। বর্তমান নিয়ে মেমসাহেব একটুও চিন্তা করে না। তার সব চিন্তা-ভাবনা, ধ্যান-ধারণা আগামী দিনগুলিকে নিয়ে… সে স্বপ্ন দেখে। স্বপ্ন? না, না, স্বপ্ন কেন হবে? সে স্থির ধারণা করে নিয়েছে চাকরি-বাকরি ছেড়েছুড়ে দিয়ে সে মনপ্ৰাণ দিয়ে শুধু সংসার করবে, আমাকে সুখী করবে, আমার কাজে সাহায্য করবে। তারপর? তারপর, সে মা হবে।
ইদানীংকালে মেমসাহেব একবার নয়, বহুবার স্বামী-পুত্র নিয়ে সংসার করার কথা বলল। ওর ছেলে কি করবে, মেয়ে কেমন হবে, সে-কথাও বলেছে বেশ কয়েকবার। শুনতে ভালই লাগে। প্ৰথমে সারা মন আনন্দে, আত্মতৃপ্তিতে ভরে যায়, কিন্তু একটু পরে কেমন যেন খটকা লাগে। হাজার হোক মানুষের জীবন তো। কোথা দিয়ে কি হয়ে যায়, কে বলতে পারে? আমি বাস্তবের মুখোমুখি হয়েছি, দেখেছি অনেক মানুষ অনেক রকম স্বপ্ন দেখে কিন্তু কজনের জীবনে সে স্বপ্ন সার্থক হয়? তাইতো মেমসাহেবকে বুকের মধ্যে পেয়ে আনন্দ পাই কিন্তু তার ভবিষ্যৎ জীবনের আশাআকাঙ্ক্ষার কথা শুনলে আমার বুকের মধ্যে কেমন করতে থাকে।
সেদিন সমুদ্রগামী চঞ্চল আত্মহারা ভাগীরথীর পাড়ে বসে মেমসাহেবের কাছে আবার স্বামী-পুত্র নিয়ে সুখের সংসার করার কথা শুনে আমি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলাম। তারপর আস্তে আস্তে ওর কপালে মুখে হাত বুলিয়ে আদর করতে করতে বললাম, তুমি কি জান তুমি স্বামী-পুত্র নিয়ে সুখী হবেই?
ঐ লম্বা ভ্রূ দু’টো টান করে চোখ ঘুরিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বলে, নিশ্চয়ই। নিশ্চয়ই? মেমসাহেবের ঠোঁটের কোণায় একটু বিদ্রূপের হাসি দেখা দেয়। বলে, কেন, তুমি কি আর কাউকে নিয়ে সুখী হবার কথা ভাবছ?
মাঝে মাঝে ইচ্ছা করে কিন্তু তুমি কি ঘাড় থেকে নামবে?
আমি তোমার ঘাড়ে চেপেছি, না তুমি আমার ঘাড়ে চেপেছ? একটু থামে, আবার বলে, আর কেউ এসে দেখুক না। মজা দেখিয়ে দেব।
তাই বুঝি?
তবে কি? তোমাকে পূজা করব?
আগেকার দিনে পতিব্ৰতা স্ত্রীরা স্বামীকে সুখী করার জন্য বহুবিবাহে কোন দিন। আপত্তি করতেন না, তা জান?
শুধু আগেকার দিনের কথা কেন বলছ? আরও একটু এগিয়ে ‘প্ৰাগৈতিহাসিক দিনে, যখন জঙ্গলে বাস করতে তখন তো তোমরা পুরুষেরা আরো অনেক কাণ্ড করতে। সুতরাং এখনও তাই করা না!
একটু ঠাণ্ড মিঠে হাওয়া বয়ে যায়। মেমসাহেব এক মূহুর্তে বদলে যায়। দু’হাত দিয়ে আমার গলা জড়িয়ে বলে, আমি জানি তুমি আর কাউকে কোনদিন ভালবাসতে পারবে না।
জান?
একশবার, হাজার বার জানি।
কেমন করে জানলে?
সে তুমি বুঝবে না।
বুঝব না?
তুমি যদি মেয়ে হতে তাহলে বুঝতে।
তার মানে?
সন্তানের মনের কথা যেমন আমরা বুঝতে পারি, তেমনি স্বামীদের মনের কথাও আমরা জানতে পারি।
দোলাবৌদি তুমি তো মেয়ে। তাই বুঝবে কত গভীরভাবে সারা অন্তর দিয়ে ভালবাসলে এসব কথা বলা যায়।
সাদার্ন একসপ্রেসের কাজ শুরু করে দিলাম বেশ মন দিয়ে। মাঝে মাঝে মন চাইত ফাঁকি দিই, মেমসাহেবকে নিয়ে আড্ডা দিই, স্ফূর্তি করি। কিন্তু পারতাম না। ওকে ঠকাতে বড় কষ্ট হতো। যার সমস্ত জীবন-সাধনা আমাকে কেন্দ্ৰ করে, যে আমার মঙ্গলের মধ্য দিয়ে নিজের কল্যাণ দেখতে পায়, তাকে মুহুর্তের জন্যও বঞ্চনা করতে আমার সাহস বা সামর্থ্য হয় নি।
ঝড়ের বেগে না হলেও আমি বেশ নির্দিষ্টভাবে এগিয়ে চলেছিলাম। মেমসাহেবকে বুকের মধ্যে পেয়ে আমি আমার জীবন-নদীর মোহনার কলরব শুনতে পেতাম।
মান্স কয়েক পরে আমি আবার বাইরে বেরুলাম। এবার লক্ষ্মেী। কিছুকাল আগে ক্রনিকেলের এডিটরের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল এবং সে পরিচয়ের সূত্র ধরেই তার কাছে হাজির হলাম। বললেন, কলকাতার করসপণ্ডেণ্টের দরকার নেই। তবে সপ্তাহে একটা করে ওয়েস্টবেঙ্গল নিউজ লেটার ছাপতে পারি।
