আমি বললাম, না, না, ঘুমুচ্ছি কোথায়। এমনি শুয়ে আছি। শিবুদা উপদেশ দেন, এত বেলা অবধি ঘুমোলে কি জীবনে কিছু করা যায়।
তবে রে। আমি প্ৰায় লাফ দিয়ে উঠে পড়ি। বলি, আচ্ছা! শিবুদা, কর্পোরেশনের যেসব কর্মচারীরা শেষ রাত্তিতে উঠে। গ্যাসপোস্টের আলো নিবিয়ে বেড়ায় আর রাস্তায় জল দেয়, তাদের ভবিষ্যৎ কি খুব উজ্জল?
শিবুদা দাবড় দেয়, তুই বড্ড বাজে বকিস। এই জন্যই তোর কিছু হবে না।
একটু আগে বললে, বেলা করে ঘুমুবার জন্য, এখন বলছ বেশী কথা বলার জন্য আমার কিছু…
আঃ তুই থামবি না শুধু শুধু তর্ক করবি?
উঠে পড়লাম। কিছুক্ষণের মধ্যে তৈরি হয়ে খোকার দোকান থেকে দুকাপ চা নিয়ে শিবুদার সম্মুখে হাজির হলাম। জিজ্ঞাসা করলাম, তারপর শিবুদা, কি ব্যাপার? হঠাৎ এই সাত-সকালে?
শিবুদা নীল সুতোর লম্বা বিড়িটায় একটা টান মেরে সারা ঘরটা দুৰ্গন্ধে ভরিয়ে দিল। বলল, চল, একটা ইণ্টারেস্টিং লোকের কাছে যাব।
কার কাছে?
আগে চল না, তারপর দেখবি।
শিবুদার সঙ্গে তর্ক করা বৃথা। সুতরাং অযথা সময় নষ্ট না করে . শিবুদার অনুসরণ করলাম। ট্রাম-বাসে উঠলাম, নামিলাম। কবার মনে নেই, তবে দু-তিনবার তো হবেই। তারও পরে পদব্ৰজে অলি-গলি দিয়ে বেশ খানিকটা। আর একটু এগিয়ে গেলে নিশ্চয়ই মহাপ্ৰস্থানের পথ পেতাম। কিন্তু সেই মুহুর্তে শিবুদা বলল, দাঁড়া, দাঁড়া, আর এগিয়ে যাস না।
একটা ভাঙা পোড়োবাড়ির মধ্যে ঢুকেই শিবুদা হঁক দিল, মধুদা।
উপরের বারান্দা থেকে একটা ছোট্ট মেয়ে জবাব দিল, শিবুকাকু। বাবা উপরে।
আমরা সোজা তিনতলার চিলেকোঠায় উঠে গেলাম। মধুদাকে দেখেই বুঝলাম, তিনি জ্যোতিষী। কিন্তু পেশায় ঠিক সাফল্য লাভ করতে পারেন নি।
মধুদার সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দিলেন শিবুদা।
মধুদা কাগজপত্র সরাতে সরাতে বললেন, এর মধ্যেই একটু কষ্ট করে বসুন ভাই।
বসলাম। শিবুদ-মধুদা প্ৰায় ঘণ্টাখানেক ধরে শনি-মঙ্গল-রাহুকেতু নিয়ে এমন আলোচনা করলেন যে, আমি তার এক বর্ণও বুঝলাম না।
ঘণ্টাখানেক পরে শিবুদার অনুরোধে মধুদা আমার জন্ম সনতারিখ ইত্যাদি ইত্যাদি জেনে নিয়ে চটপট একটা ছক তৈরি করে ফেললেন। একটু ভাল করে চোখ বুলিয়ে নিয়ে বললেন, বেশ छाल।
শিবুদা প্রশ্ন করেন, ভাল মানে? মধুদা মনে মনে হিসাব-নিকাশ করতে করতেই জবাব দেন, ভাল মানে ভাল; তবে বেশ কাঠ-খড়ি পোড়াতে হবে।
নাকে একটু নস্য দিয়ে কর গুনতে গুনতে বলেন, তাছাড়া একটু বিলম্বে উন্নতির যোগ।
শিবুদা ছকটার ওপর ঝুকে পড়ে বলেন, হ্যাগো মধুদা, এর যে ত্রিকোণে মঙ্গল।
তবে নবমে নয়, পঞ্চমে। তবুও বেশ ভাল ফল দেবে।
মধুদা সেদিন অনেক কথা বলেছিলেন। আজ সবকিছু মনে নেই। তবে ভুলিনি একটি কথা। বলেছিলেন, শুক্ৰ স্থানটি বড় ভাল। কোন মহিলার সহায়তায় জীবনে উন্নতি হবে।
সেদিন কথাটি বিশ্বাস করিনি। কিন্তু আজ মাদ্রাজ মেলের কামরায় বসে কথাটা মনে না করে পারলাম না। আগে কোনদিন কল্পনা করতে পারিনি। আমার জীবনের রুক্ষ প্ৰান্তর মেমসাহেবের স্রোতস্বিনী ধারায় ধন্য হবে। নাটক-নতেলে এসব সম্ভব হতে পারে। কিন্তু আমার জীবনে? নৈব নৈব চ।
মাদ্রাজ মেলের কামরায় বসে মনে হলো মেমসাহেবের স্বপ্ন, সাধনা, ভালবাসা নিশ্চয়ই একেবারে ব্যর্থ হতে পারে না। সত্যি আমার মাদ্রাজ যাওয়া ব্যর্থ হলো না। সাদার্ন একসপ্রেসের এডিটর বললেন, কাগজে স্পেসের বড় অভাব। কলকাতার স্পেশ্যাল স্টোরি ছাড়া কিছু ছাপার স্পেস পাওয়াই মুস্কিল। তাইতো কলকাতায় ঠিক ফুলটাইম লোকের দরকার নেই।
আমি মনে মনে দশ হাত তুলে ভগবানকে শতকোটি প্ৰণাম জানালাম। মাসে মাসে দেড়শ টাকা। আনন্দে প্ৰায় আত্মহারা হয়ে পড়লাম। দৌড়ে মাউণ্ট রোড টেলিগ্ৰাফ অফিসে গিয়ে মেমসাহেবকে আর্জেণ্ট টেলিগ্ৰাম করলাম, মিশন সাকসেসফুল রিমেমবারিং ইউ স্টপ স্টাটিং টুমরো মাদ্রাজ-মেল।
হাওড়া স্টেশনে মেমসাহেব আমাকে হাসিমুখে অভ্যর্থনা জানিয়ে বলল, আর বেশী আড্ডা দেবে না। মন দিয়ে কাজ করবে।
নিশ্চয়ই, তবে—
বাঁকা চোখে মেমসাহেব বলে, তবে মানে?
সাত দিন পরে কলকাতা ফিরেই কাজ শুরু করবো?
তবে কি করবে?
একটা দিন অন্তত তোমাকে…
মেমসাহেব হাসতে হাসতে বলে, এতক্ষণে অরিন্দম কহিলা…
শুধু আমার নয়, মেমসাহেবেরও তো ইচ্ছা করে আমার কাছে আসতে, প্ৰাণভরে আমাকে আদর করতে। তাছাড়া এই কদিনের আদর্শনের জন্য তার মনের মধ্যে অনেক ভাব, ভাষা পুঞ্জীভূত হয়ে উঠেছিল। কলকাতার এই জেলখানার বাইরে একটু মুক্ত আকাশের তলায় আমাকে নিবিড় করে কাছে পাবার জন্য। ওর মনটাও আনচান করছিল। ব্যাকুল হয়ে উঠেছিল। আমার নতুন জীবনের দ্বারদেশে আমাকে সাদর অভ্যর্থনা জানাবার জন্য। তাইতো আমার কাছ থেকে একটু ইঙ্গিত পেয়েই বিনা প্ৰতিবাদে প্ৰস্তাবটি মেনে নিল।
জানি তোমার মাথায় যখন একবার ভূত চেপেছে তখন কিছুতেই ছাড়বার পাত্ৰ তুমি নও, মেমসাহেব মন্তব্য করে।
তাই বুঝি, আমি বলি। তোমার যেন কোন কামনা-বাসনা, ইচ্ছা-অনিচ্ছা বলে কোন কিছু নেই।
একটি দিনের জন্য আমরা দুজনে আবার হারিয়ে গেলাম। কলকাতার লক্ষ লক্ষ মানুষের কেউ জানল না গঙ্গা যেখানে সাগরের দিকে উদ্দামবেগে ছুটে চলেছে, যেখানে সমস্ত সীমা অসীম হয়ে গেছে, বন্ধন যেখানে মুক্তি পেয়েছে, সেই কাকদ্বীপের অন্তবিহীন মহাশূন্যে আমাদের দুটি প্রাণবিন্দু বিলীন হয়ে গেল।
