আমি তাড়াতাড়ি ওর মুখটা চেপে ধরে বলি, আর বলে না। মন্ত্র না পড়লেও তুমি আমার স্ত্রী, আমি তোমার স্বামী।
মেমসাহেব আমার বুকের মধ্যে লুটিয়ে পড়ল। একটু পরে গলায় আঁচল দিয়ে আমার পায়ে মাথা রেখে প্ৰণাম করল।
চাঁদটা হঠাৎ একটু মেঘে ঢাকা পড়ল। আর সেই অন্ধকারের সুযোগে আমি–
মেমসাহেব সঙ্গে সঙ্গে দাবিড় দিয়ে বলল, আবার অসভ্যতা। হেস্ট্রিংস থেকে এগিয়ে এসে আউট্রাম ঘাটের পাশ দিয়ে আস্তে আস্তে আমরা আবার মিশে গেলাম নগর কলকাতার জনসমুদ্রে।
কিন্তু জান দোলাবৌদি, সে রাত্রে আনন্দে আর আত্মতৃপ্তিতে ঘুমুতে পারিনি। তোমার জীবনেও তো এমনি দিন এসেছিল। এবার কলকাতা গেলে সেদিনের কাহিনী না শোনালে তোমার মুক্তি নেই।
১০. বিশেষ বিশেষ পরিস্থিতিতে
তুমি তো জান জীবনের এক একটা বিশেষ বিশেষ পরিস্থিতিতে মানুষেরও এক একটা রূপ, চরিত্র দেখা দেয়। যে ছেলেমেয়ের রাত ন’টার পর ঘুমে ঢুলতে থাকে, পরীক্ষার আগে তারাই নির্বিবাদ রাত দেড়টা-দু’টো অবধি পড়াশুনা করে। বিয়ের আগে যে মেয়ের রাত জাগতে পারে না, শুনেছি বিয়ের পর তারা নাকি ঘুমুতেই চায় না। তাই না? কেন সন্তানের মা হবার পর? ঘুমিয়ে ঘুমিয়েও মায়ের দল জেগে থাকেন। দেহটা ঘুমের কোলে লুটিয়ে পড়ে। কিন্তু মন? অতন্দ্ৰ প্রহরীর মত সারা রাত সে সন্তানকে পাহারা দেয়। সামান্য কটি মাসের ব্যবধানে কিভাবে একটা প্ৰমত্ত কুমারী শান্ত, স্নিগ্ধ কল্যাণী জননী হয়। সে কথা ভাবলেও আশ্চৰ্য লাগে।
মানুষের চরিত্রের আরো কত বিচিত্র পরিবর্তন হয়। সে পরিবর্তনের ফিরিস্তি দিতে গেলে মানব-সভ্যতার একটা ছোটখাটো ইতিহাস লিখতে হবে। তাছাড়া মনুষ্য-চরিত্রের এসব মামুলি কথা তোমাকে লেখার কোন প্রয়োজনও নেই। সেদিন গঙ্গার ধারে মেমসাহেবের কথা শুনে আর চোখের জল দেখে আমারও এক আশ্চৰ্য পরিবর্তন হলো। ঘর-কুনো মধ্যবিত্ত বাঙালীর ছেলে হয়ে কলকাতার ঐ গণ্ডিবদ্ধ জীবনের মধ্যে বেশ ছিলাম। মেমসাহেবের প্রেমের নেশায় নিজের কর্মজীবন সম্পর্কে বেণু উদাসীন হয়ে পড়েছিলাম।
সেদিন অকস্মাৎ মেমসাহেবের ভালবাসার চাবুক খেয়ে আমি চিন্তিত না হয়ে পারলাম না। ধুতি-পাঞ্জাবি আর কোলাপুরী চটি পরে জামাই সেজে মেমসাহেবের সঙ্গে প্রেম করলেই যে জীবনের সব কিছু প্ৰয়োজন মিটবে না, মিটতে পারে না সে কথা বোধ হয় সেদিনই প্ৰথম উপলব্ধি করলাম। তাছাড়া আর একটা উপলদ্ধি হলে আমার। মেমসাহেব আমাকে তালবাসে, আমাকে প্ৰাণমন দিয়ে কামনা করে। সে জানে একদিন আমারই হাতে তার সিথিতে সীমন্তিনী সিদুর উঠবে, আমার দীর্ঘায়ু কামনায় হাতে শাখা পারবে; সে জানত আরো অনেক কিছু। জানত, সে একদিন আমার সন্তানের জননী হয়ে সগর্বে পৃথিবীর সামনে দাঁড়াবে।
সারা দুনিয়ার সমস্ত মেয়ের মত সেও ভবিষ্যৎ জীবনের স্বপ্ন দেখেছিল তার স্বামীকে কেন্দ্র করে। কিন্তু যৌবনের কালবৈশাখীর ধূলি ঝড়ে মেমসাহেবের স্বচ্ছ দৃষ্টি হারিয়ে যায় নি, ভবিষ্যতের স্বপ্ন বাস্তবের মাটি ছেড়ে আরব্য উপন্যাসের অলীক অরণ্যে পালিয়ে যায় নি। তাইতো সে চেয়েছিল তার ভালবাসায় আমার জীবন ভরে উঠুক। সে চায় নি। পৃথিবীর অসংখ্য কোটি কোটি স্বামী-স্ত্রীর দীর্ঘ তালিকায় শুধুমাত্র আর দুটি নামের সংযোজন।
তাইতো সেদিন ফেরার পথে মেমসাহেব আমাকে অন্যমনস্ক দেখে ডাকল, শোন।
আমি নিরুত্তর রইলাম। মেমসাহেব আমার পাশে এসে হাতটা ধরে ডাকল, শোন।
বল।
রাগ করেছ?
রাগ করব কেন?
আমাকে ছেড়ে তোমাকে বাইরে যেতে বললাম বলে।
না, না।
আমরা দুজনে পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে এগিয়ে চললাম। মেমসাহেব। আবার শুরু করে, আমার সর্বস্ব কিছু দিয়েও যদি তোমার সত্যকার কল্যাণ করতে না পারি, তাহলে আমি কি করলাম दव्।’
একটু থামে। আবার বলে, তুমি শুধু আমার স্বামী হবে, শুধু আমিই তোমাকে মর্যাদা দেব, ভালবাসাব, তা আমি চাই না। আমি চাই তুমি আমাদের দুজনের গণ্ডির বাইরেও অসংখ্য মানুষের ভালবাসা পাও, তাঁদের স্নেহ-ভালবাসা পাও, তাদের আশীৰ্বাদ পাও।
আবার একটু থামে, একটু হাসে। তারপর ফিস ফিস করে বলে, কত মেয়ে তোমাকে চাইবে অথচ শুধু আমি ছাড়া আর কেউ তোমাকে পাবে না।
হাত দিয়ে আমার মুখটা ঘুরিয়ে জিজ্ঞাসা করল, ভাবতে পাের, তখন আমার কি গৰ্ব, কি আনন্দ, কি আত্মতৃপ্তি হবে?
কি উত্তর দেব? আমি শুধু হাসি। বাসায় ফিরে অনেক রাত অবধি অনেক কিছু ভাবলাম। পরের কটা দিন নানা জায়গায় ঘুরে ফিরে নিজেও কিছু টাকা যোগাড় করলাম। বাইরের খবরের কাগজ সম্পর্কে কিছু কিছু খবরও জেনে নিলাম।
তারপর একদিন সত্যি সত্যিই আমি মাদ্রাজ মেলে চড়লাম। মেমসাহেব আমাকে বিদায় জানাতে এসেছিল। বলল, আমার মনে হয় তোমার নিশ্চয়ই কিছু হবে। তবে না হলেও ঘাবড়ে যেও না। সারা দেশে তো কম কাগজ নেই। আরো দু-চার জায়গায় ঘোরাঘুরি করলে কোথাও না কোথাও চান্স পাবেই।
আমি নিরুত্তর রইলাম। সামনের লাল আলো, সবুজ হলো, গার্ড সাহেবের বাঁশি বেজে উঠল।
মেমসাহেব বলল, সাবধানে থেকে। যেখানে সেখানে যা তা খেও না…চিঠি দিও।
আমি মুখে কিছু বললাম না। শুধু মেমসাহেবের মাথায় হাত দিয়ে আশীৰ্বাদ করলাম।
মাদ্রাজ মেলের কামরায় বসে হঠাৎ পুরানো দিনের কথা মনে হলো।…
রবিবার সকাল। আটটা কি সাড়ে আটটা বাজে। ঘুম ভেঙে গেলেও তন্দ্ৰাচ্ছন্ন হয়ে তখনো চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়েছিলাম। আমাদের সিনিয়র সাব-এডিটর শিবুদা এসে হাজিরা। ঘরে ঢুকেই নির্বিবাদে চাদরটা টান মেরে বললেন, ছি, ছি, এখনও ঘুমুচ্ছিস?
