তারপর ঐ ঘরে বসেই তিনজনে ব্রেকফাস্ট খাচ্ছিলাম। মেমসাহেব বলল, জান, অতসীর সঙ্গে আমার কি বাজী হয়েছে?
কি?
অতসী বলে, না, না, কিছু না।
আমি বলি, থাক মেমসাহেব, এখন বলে না। অতসী ঘাবড়ে গেছে।
অতসী কফির পেয়ালা নামিয়ে রেখে বলল, তাহলে আমিই বলি শুনুন, বাজী হয়েছিল যে আমি যদি আপনাকে ভোলাতে পারি। তাহলে কাজলদি আমাকে একটা শাড়ী প্ৰেজেণ্ট করবে। আর আমি হেরে গেলে আমি কাজলদিকে একটা শাড়ী প্রেজেন্ট করব।
এতক্ষণে বুঝলাম অসতী কেন আমার সঙ্গে অভিনয় করেছিল। আমি বললাম, অসতী তোমার কাজল দিকে তোমার শাড়ী কিনে দিতে হবে না। তুমি যে তোমার কাজলদিকে টেনে আনতে পেরেছ, সেজন্য তুমিই তো প্ৰথমে শাড়ী পাবে।
আমি দুজনকেই শাড়ী কিনে দিয়েছিলাম। দুজনেই খুশী হয়েছিল। আমিও খুশী হয়েছিলাম। একটা সপ্তাহ যেন স্বপ্নের মধ্যে দিয়ে কেটে গেল।
অতসী আমাদের দুজনকে সত্যি ভালবাসে। ও মেমসাহেবকে কাজলদি বলে কেন জান? অতসী বলত মেমসাহেবের চোখ দুটিতে ইয়ং ভগবান সযত্নে কাজল মাখিয়ে দিয়েছেন। সেজন্যই অতসী। মেমসাহেবকে কাজলদি বলত। ভারী চমৎকার নাম, তাই না?
যাই হোক এদের আমি ভালবাসি, আমি এদের কল্যাণ কামনা করি। ওরাও আমার মঙ্গল কামনা করে। আমি ওদের প্রতি কৃতজ্ঞ কিন্তু মেমসাহেবের স্মৃতিকে মান করতে পারে না কেউ। পারবে কেন বল? আমার ভবিষ্যতের জন্য মেমসাহেব যে মূলধন বিনিয়োগ করেছিল, তার কি কোন তুলনা হয়? হয় না।
তাছাড়া আরো একটা ব্যাপার আছে। আমার জীবনের সেই অমাবস্যার রাতে শুধু মেমসাহেবই এসেছিল আমার পাশে। প্ৰেম দিয়েছিল, ভালবাসা দিয়েছিল, অভয় দিয়েছিল আমাকে। নিজের প্ৰাণের প্রদীপের মঙ্গল-আলো দিয়ে আমাকে সেই তিমির রাত্রি থেকে প্ৰভাতের দ্বারদেশে এনে দিয়েছে আমার সেই মেমসাহেব। তাইতো তার সে স্মৃতিকে মান করার ক্ষমতা শত সহস্ৰ বনানী বা অতসীর নেই।
সেবার বাইরে থেকে ঘুরে আসার পর মেমসাহেব আমাকে বলল, তোমার কাজকর্ম সম্পর্কে নতুন কিছু ভাবনি?
ভেবেছি বৈকি।
কি ভেবেছ?
ভেবেছি যে কলকাতার মায়া কাটিয়ে একটু বাইরে চেষ্টা করব।
তবে করছি না কেন?
কিছু অসুবিধা আছে বলে।
মেমসাহেব ছাড়ার পাত্রী নয়। তাছাড়া আমার জীবন সম্পর্কে উদাসীন থাকা আজ আর তার পক্ষে সম্ভব নয়। তাইতো একদিন অপ্ৰত্যাশিতভাবে মেমসাহেব আমার হাতে দুশো টাকা গুঁজে দিয়েঃ বলল, একবার দিল্লী বা বোম্বে থেকে ঘুরে এসো। হয়ত একটা কিছু জুটেও যেতে পারে।
প্ৰথমে টাকাটা নিতে বেশ সঙ্কোচ বোধ হচ্ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিয়েছিলাম। কারণ আমি জানতাম আমার কল্যাণই ওর কল্যাণ। সুতরাং আমার জন্য শুধু দুশো টাকা কেন, আরো অনেক কিছু সে হাসি মুখে দিতে পারে। তাছাড়া আমার কল্যাণ যজ্ঞে তার আহুতি প্ৰত্যাখ্যান করার সাহস আমার ছিল না। তবুও টাকাটা হাতে করে বেশ কিছুক্ষণ বসে রইলাম।
কিছুক্ষণ পরে মেমসাহেব জিজ্ঞাসা করল, কি ভাবছ?
না, কিছু না।
তবে এমন চুপ করে রইলে?
এমনি।
মেমসাহেব আমার হাতটা টেনে নিয়ে একটু নাড়াচাড়া করে বলল, আমি বলব তুমি কি ভাবছ?
বলো।
সত্যি বলব?
নিশ্চয়ই।
আমার টাকা নিতে তোমার লজ্জা করছে, অপমানবোধ হচ্ছে। তাই না?
না, না, তা কেন হবে। আমি উড়িয়ে দেবার চেষ্টা করি।
মেয়েদের মন আমাদের চাইতে অনেক সতর্ক, অনেক হুশিয়ার। মেমসাহেব বলে, স্বীকার করতে লজ্জা করছে?
আমি কোন উত্তর দিই না। চুপ করেই বসে থাকি। মেমসাহেবও অনেকক্ষণ চুপ করে থাকে।
বেশ কিছুক্ষণ কেটে গেল।
মেমসাহেব। আবার শুরু করে, তুমি এখনও আমাকে ঠিক আপনি বলে ভাবতে পার না, তাই না?
আমি তাড়াতাড়ি মেমসাহেবের কাছে এগিয়ে যাই। ওর মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলি, ছিছি, মেমসাহেব, ওকথা কেন বলছ?
একটু থামি।
আবার বলি, তোমার চাইতে আপন করে আর কাউকেই তো পাইনি।
আপন ভাবলে আজ তোমার মনে এই দ্বিধা আসত না।
আমি আরো কিছু সাস্তুনা দিলাম। কিন্তু একটু পরে খেয়াল করলাম। মেমসাহেবের চোখে জল।
তাড়াতাড়ি মেমসাহেবকে বুকের মধ্যে টেনে নিলাম। চোখের জল মুছিয়ে দিলাম। একটু আদরও করলাম। শেষে ওর ফোলা ফোলা গাল দু’টো চেপে বললাম, পাগলী কোথাকার।
মেমসাহেব আমার কোলের মধ্যে শুয়ে রইল। কিন্তু তবুও স্বাভাবিক হতে পারল না। কিছু পরে একটা দীর্ঘনিশ্বাস ছেড়ে বলল, তোমার এত কাছে এসেও তোমাকে পাব না, তা কল্পনা করতে পারিনি।
লক্ষ্মীটি মেমসাহেব আমার! তুমি দুঃখ করে না।
মেমসাহেব উঠে বসল। একটু স্থির দৃষ্টিতে চাইল আমার দিকে। মুহুর্তের জন্য চিন্তার সাগরে ডুব দিয়ে কোথায় যেন তলিয়ে গেল। তারপর বলল, আমাদের জীবনে সংস্কারের একটা বিরাট ভূমিকা আছে, তাই না?
হঠাৎ একথা বলছ?
ঠোঁটের কোণে একটু বিদ্রূপের হাসি এনে মেমসাহেব বলে, অপরিচিত দুটি ছেলে-মেয়েকে কলাতলায় বসিয়ে একটু মন্ত্র পড়ালেই তারা কত আপন হয়। ঐ সংস্কারটুকু ছাড়া যত কাছেই আসুক না। কেন, দুটি ছেলেমেয়ে ঠিক আপন হতে পারে না।
তারপর আমার দিকে ইশারা করে জিজ্ঞাসা করে, তাই না? তুমি আমাকে সন্দেহ করছ? আমাকে অপমান করছি? ছি, ছি, তোমাকে অপমান করব? শুধু বলছিলাম যে আমি যদি তোমার বিবাহিতা স্ত্রী হতাম। তাহলে আমার গয়না বিক্ৰী করে তোমার মদ্যপান বা যত্রতত্র গমনের অধিকার থাকত, কিন্তু…।
