অতসী আর একটি মুহুৰ্তও নষ্ট করতে রাজী নয় বলে, কাম অন। ফিনিশ ইওর গ্লাস।
চক্ষের নিমেষে বাকি শ্যাম্পেনটুকু গলা দিয়ে ঢেলে দিল অন্তরের অজানা গহবরে। ইচ্ছা ছিল না, কিন্তু বাধ্য হয়ে আমিও শেষ করে উঠলাম। চলে গেলাম ব্লাক এলিফ্যান্ট!
পালামে মেমসাহেব এসেছিল আমাদের রিসিভ করতে। অতসী ওকে কি বলেছিল জান? বলেছিল, টোয়েন্টয়েথ সেঞ্চুরীর এক’জন জার্নালিস্ট যে এত কনজারভেটিভ হয়, তা আমি ভাবতে পারিনি।
মেমসাহেব একটু হাসতে হাসতে জিজ্ঞাসা করল, কেন কি হয়েছিল?
মাই গড! কি হয় নি। তাই জিজ্ঞাসা কর। অতসী রায়ের ইনভিটেশনে নাইট ক্লাবে যেতে চায় না!
মেমসাহেব হাসতে হাসতেই একবার আমাকে দেখে নেয়। অতসী বলে, তুমি আর হাসবে না। যে অতসী রায়ের সঙ্গে লণ্ডনের ছোকরা ব্যারিস্টাররা এক কাপ কফি খেতে পেলে ধন্য হয়, সেই আমার সঙ্গে বেইরুটের ব্ল্যাক এলিফ্যাণ্টে বসে শ্যাম্পেন্ন খেতে দ্বিধা করে তোমায় এই অপদাৰ্থ প্রসপেকটিভ গার্ডিয়ান।
মেমসাহেব বাঁকা চোখে এক ঝলক আমাকে দেখে নিয়ে বলে, আই অ্যাম সরি অতসী। আই প্লীড গিল্টি…..
মেমসাহেবের গাল টিপে দিয়ে অতসী বলে, অত ভালবেসে না। ছোকরাটার মাথাটা খেলে।
যাই হোক সেবার ঢাকা থেকে লণ্ডন যাবার পথে প্ৰথমে কলকাতা, পরে দিল্লী এলো। কলকাতা থেকে সে যে মেমসাহেবকে নিয়ে এসেছে, তা জানতাম না। দিল্লী আসার খবরটাও আগে পাইনি। হঠাৎ একদিন সকালবেলায় অতসীর টেলিফোন পেয়ে চমকে গেলাম।
কি আশ্চৰ্য। আসার আগে একটা খবর দিলে না?
অতসী দুঃখ প্ৰকাশ করে, ক্ষমা চায়। শেষে একবার জরুরী কারণে তক্ষুনি হোটেলে তলব করে।
আমি কয়েক মিনিটের মধ্যেই ক্লারিজে হাজির হই। দোতলায় উঠেকরিডর দিয়ে একেরারে কোণার দিকে চলে যাই। দরজা নক করি।
কোন জবাব পেলাম না। আবার নক করলাম।
এবার উত্তর পাই, যাস্ট এ মিনিট।
দু’এক মিনিটের মধ্যেই অতসী দরজা খুলে অভ্যর্থনা করে। আদর করে ভিতরে নিয়ে যায়!
কি ব্যাপার? এবার যে একটা খবরও দিলে না?
বিলিভ মী, ইট অল হ্যাপেনড সাডেনলী। তাছাড়া কলকাতা থেকে বুকিং করতেই বড্ড ঝামালা পোহাতে হলো।
কদিন কলকাতায় ছিলে?
তিন দিন।
ডিড ইউ মীট মেমসাহেব?
মাই গড়। মেমসাহেব ছাড়া কি কোন চিন্তা নেই। আপনার মনে?
নিশ্চয়ই আছে। তবে আফটার মেমসাহেব।
হাত দিয়ে আমার মুখটা নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিয়ে অতসী জানতে চায়, আমিও তাই?
তুমি তো অন্য ক্যাটাগরীর।
অতসী কেমন যেন একটা অদ্ভুত দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকায়। বলে, কেন, আমি কি আপনার মেমসাহেবের জায়গায়…
আমি সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াই। শুধু বলি, অতসী আমার অনেক কাজ আছে। এখন চলি, পরে দেখা হবে।
অতসী সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়ায়। দু’হাত দিয়ে আমার দু’টো হাত চেপে ধরে। বলে, না, তা হবে না। আপনি এখন আমার কাছেই থাকবেন।
আমি অবাক হয়ে যাই। ভেবে কুলকিনারা পাই না। অতসীর এই বিচিত্র পরিবর্তনের কারণ। মুহুর্তের মধ্যে নারী-চরিত্রের বিচিত্রধারার নানা সম্ভাবনার কথা চিন্তা করে নিলাম। ভাবলাম, মনের টান, না দেহের দাবী? বড়লোকের মেয়ের খামখেয়ালি নাকি…
অতসীকে নিয়ে আমার অন্ত শত চিন্তা করার প্রয়োজনীয়তা বোধ করলাম না। যা ইচ্ছে তাই হোক। আমি ফালতু ঝামেলায় জড়িয়ে না পড়লেই হলো।
আরো একটু চিন্তা করি। ডিপ্লোম্যাট হয়ে ডিপ্লোম্যাসী করছে না তো?
আমি বললাম, অতসী, ঘোড়ার গাড়ির একটা কোচোয়ানের হাতে ইমপালা দিয়ে খেলা করতে তোমার ভয় হচ্ছে না?
ওসব হেঁয়ালি ছাড়ুন। আই অ্যাম ফিলিং লোনলি, উড ইউ গিভ মী কম্পানী অর নট?
হোয়াই নট হ্যাভ বেটার কম্পানী?
আমার খুশী।
কিন্তু আমার তো খুশী নাও হতে পারে?
এক ঝলক অতসীকে দেখে নিলাম। দু’হাত দিয়ে অতসীর ডান হাতটা টেনে নিয়ে হাণ্ডসেক করে বললাম, গুড বাই!
আমি ঝড়ের বেগে ঘর থেকে বেরিয়ে করিডর দিয়ে হন।হন। করে এগিয়ে যাচ্ছিলাম সিঁড়ির দিকে। হঠাৎ পিছন থেকে কানে ভেসে এলো, শোন।
থমকে দাঁড়ালাম। কিন্তু স্বপ্ন ভেঙে যাবার ভয়ে পিছন ফিরলাম না, মনের ভুল?
শোন?
আমার জীবন-রাগিণীর সুরকারের ঐ কণ্ঠস্বর দ্বিতীয়বার শোনার পর আর নিজেকে সংযত রাখতে পারলাম না। পিছন ফিরলাম।
কি আশ্চৰ্য! মেমসাহেব!
অতসীর ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে মুচকি হাসতে হাসতে মেমসাহেব ডাক দিল, এই শোন…
আমি প্ৰায় দৌড়ে গেলাম। মেমসাহেব আমাকে অভ্যর্থনা করার জন্য স্থির হয়ে দাঁড়িয়েই রইল। আমি অবাক বিস্ময়ে বললাম, তুমি।
সেই শান্ত, স্নিগ্ধ, মিষ্টি গলায় মেমসাহেব বলল, কি করব বল, অতসী জোর করে নিয়ে এলো।
তুমি বেশ কল্পনা করতে পারছি তারপর ক্লারিজ হোটেলের ঐ কোণার ঘরে কি কাণ্ড হলো! প্ৰথম আনন্দে ও কৃতজ্ঞতায় আমি অতসীকে জড়িয়ে ধরে বললাম, টেল মী অতসী হোয়াট ক্যান আই ডু ফর ইউ?
অতসী বলল, বেশী কিছু চাইব না। শুধু অনুরোধ করব। আগামী সাত দিন এদিকে এসে দুটি যুবতীকে বিরক্ত করবেন না।
প্ৰতিজ্ঞা করছি বিরক্ত করব না, তবে তোমাদের আনন্দ দেবার জন্য, সুখী করার জন্য নিশ্চয়ই আসব।’
মেমসাহেব টিল্পানী কেটে বলল, অতসী ওসব কল্পনাও করিস না। পুরুষদের যদি আত সংযম থাকত। তাহলে পৃথিবীটা সত্যি পাল্টে যেত।
আমি মেমসাহেবকে বলি, বিশ্বামিত্রের মত কাজকর্ম নিয়ে আমি তো বেশ ধ্যানমগ্ন ছিলাম। কিন্তু তুমি মেনকা দেবী এক হাজার মাইল দূরে নাচতে এলে কেন?
