ডেপুটি হাই-কমিশনারকে আপনার কথা বলাতেই এক উইকের ছুটি পেয়েছি। আদারওয়াইজ…!
তরুণ একটা দীর্ঘনিশ্বাস ছেড়ে বলল, ঠিক আছে। কি করা যাবে!
সঙ্গে সঙ্গেই বন্দনা বলল, আমি কিন্তু দাদা, মাসখানেক থাকব।
বিকাশের খাওয়া-দাওয়ার কি হবে?
একি একটা প্রশ্ন? অত্যন্ত সহজ হয়ে বন্দনা উত্তর দেয়, কেন? দিনে ইন্ডিয়া হাউসের বিখ্যাত ক্যান্টিন, আর রাত্রে স্বহস্তে সাত্ত্বিক আহার, অথবা ইতালিয়ান কাফে!
এতদিন ওই হোটেল-রেস্তোরাঁয় খেয়ে কাটাবে?
বিকাশ বলে, না না, তাতে কি হয়েছে!
মফঃস্বলের ফৌজদারি কোর্টের উঁকিলের মতো বন্দনার কাছে অফুরন্ত আগুমেন্টের রসদ। এতকাল কিভাবে কাটিয়েছে?
তরুণ একটু শাসন করে, আঃ! বন্দনা! বিয়ের পর যেন একটু মুখরা হয়েছ!
ছুটি-ছাটা নিয়ে বেশ তর্কটা জমে উঠেছিল, কিন্তু হঠাৎ টেলিফোনটা বেজে উঠতেই ছেদ পড়ল।
দ্যাখ তো বন্দনা, কে? হয়তো ভাবিজী।
কে ভাবিজী?
আমার কন্সাল জেনারেলের স্ত্রী।
ঠিক যা সন্দেহ করেছিল তাই। সবাই তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে রওনা দিল মিঃ ট্যান্ডনের বাড়ির দিকে।
১৭. এককথায় যাকে বলে ভুরিভোজ
এককথায় যাকে বলে ভুরিভোজ তাই হলো। সবাই দল বেঁধে ড্রইংরুমে এলেন পোস্ট-ডিনার আড্ডার জন্য।
আচ্ছা ভাবিজী, আমার জন্য তো এমন ভুরিভোজের আয়োজন কোনোদিন হয়নি।
ভাবিজী তরুণের কথার জবাব না দিয়ে বন্দনাকে বললেন, দেখেছ তোমার দাদার কি হীন মনোবৃত্তি? কোথায় বোন-ভগ্নীপতিকে খাইয়েছি বলে খুশি হবে, তার বদলে কিনা হিংসা করছে।
বন্দনা হাসে, বিকাশ হাসে, মিঃ ট্যান্ডনও হাসেন। কেউ কোনো কথা বলেন না।
মিসেস ট্যাভন আবার শুরু করলেন, বিয়ের পর ছেলেমেয়েদের ইজ্জতই আলাদা। বিয়ের পর তুমিও এমনি ইজ্জত, আদর-আপ্যায়ন পাবে।
বন্দনা কিছু বলতে গিয়ে থেমে গেল। শুধু একবার চুরি করে বিকাশের দিকে তাকাল, একটু হাসল।
বিয়ে না করলে ভালো-মন্দ খেতেও পাব না? অবাক হয়ে তরুণ প্রশ্ন করে।
ভাবিজীর স্পষ্ট জবাব, না।
সুড আই ম্যারি টুমরো?
এবার ভাবিজী হঠাৎ সীরিয়াস হলেন। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, আই উইশ ইউ কুড, তরুণ!
ভাবিজীর ভাবান্তরে, ওই ছোট্ট একটা দীর্ঘনিশ্বাসে সমস্ত ঘরের আবহাওয়াটাই পাল্টে গেল। অটামের বার্লিনের আকাশ হঠাৎ মেঘে ছেয়ে গেল।
জানো বন্দনা, আমার আর ভালো লাগে না। সত্যি ভালো লাগে না। নিজের ছেলে-মেয়ে আত্মীয়স্বজন কতদুরে পড়ে রয়েছে। এদের নিয়েই তো আমার সংসার।
মিঃ ট্যান্ডন, তরুণ, বিকাশ চুপটি করে মুখ ঘুরিয়ে বসেছিল। বন্দনা বলল, তা তো বটেই।
আবার একটা দীর্ঘনিশ্বাস। আর এদেরই মুখে যদি হাসি না দেখি, তাহলে কেমন লাগে বলো তো?
আর এগুতে পারলেন না ভাবিজী। গলার স্বর আটকে এল। ঠিক তাকিয়ে না দেখলেও সবাই বুঝল, মিসেস ট্যান্ডনের চোখের কোণায় জল এসে গেছে।
সিচুয়েশনটা সেভ করার চেষ্টা করলেন স্বয়ং ট্যান্ডন। আঃ, এখন আর দুঃখ করছ কেন? ইন্দ্রাণী উইল বি উইথ আস ভেরি সুন।
মিসেস ট্যান্ডন দপ করে জ্বলে উঠলেন। বাজে বকো না তো! ভেরি সুন ভেরি সুন করতে করতে তো তুমি রিটায়ার করতে চলেছ!
প্রথম দিনের পরিচয়, ব্যবহারেই ভাবিজীকে দেখে স্তম্ভিত, মুগ্ধ হয় বন্দনা, বিকাশ। দাদাকে ওঁরা এত ভালোবাসেন?
হ্যাঁ।
ফেয়ারলি প্লেসে বা রাইটার্স বিল্ডিং-এ সারা জীবন কাটাতে হয় অনেককেই। পাশাপাশি বসে সারাজীবন কাজ করতে করতে তিক্ততা আসে বৈকি! কিন্তু যাদের জীবনে সে স্থায়িত্ব কোনোদিনই আসবে না, আসতে পারে না, তাদের সবার মন ঠিক বিষাক্ত হতে পারে না। হবার অবকাশ নেই। বিষ একটু এগুতে না এগুতেই ট্রান্সফার! কানাডা থেকে আলজিরিয়া, লন্ডন থেকে কলম্বো, পিকিং থেকে প্যারিস। আট-দশ-বারো বছর পর যখন আবার দেখা হয়, তখন সে বিষের চিহ্ন পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া যায় না।
অতীত দিনের এই তিক্ততা যদি কেউ মনে করে রাখত তবে কি ওবেরয় আজও ফরেন-সার্ভিসে থাকতে পারত?
রাত্রে ফিরে এসে এইসব গল্পই হচ্ছিল তিনজনে মিলে। বড় কৌচটায় দাদার পাশে বসে ওবেরয়ের কথা শুনছিল বন্দনা। বিকাশ সামনের কৌচে বসেছিল।
ওবেরয় তখন আফ্রিকার সীমান্ত রাজ্য মরোক্কোতে পোস্টেড। চুয়াল্লিশ বছর ফরাসি শাসনে থাকার পর মরোক্কো স্বাধীন হয়েছে। সারা দেশের মানুষ আনন্দে মাতোয়ারা হয়ে উঠল। মারাক্কেশ স্কোয়ারে সারা দিনরাত্রি হৈ-হুঁল্লোড় চলত। ওবেরয় ঘুরে ঘুরে সেসব দেখত।
রাবাতে ইন্ডিয়ান মিশন খোলা হলেও ফুল টাইম অ্যাম্বাসেডর তখনো আসেনি। ওবেরয় ও আর দু তিনজন মিলেই সব কাজ করত। ভারত মরোক্কো থেকে কিছু ফসফেট কিনলেও আর বিশেষ কোনো ব্যবসা-বাণিজ্যের লেন-দেন ছিল না দু দেশের মধ্যে। কমার্শিয়াল কাউন্সিলারের, পদও মঞ্জুর করা হয়নি। ওবেরয়কেই এক্সপোর্ট-ইমপোর্টের টুকটাক খোঁজখবর ঘুরে ফিরে জোগাড় করতে হতো। ঘুরত ক্যাসাব্লাঙ্কা, মারাক্কেশ, ফেজ, তাঞ্জিয়ার।
তরুণ একটা সিগারেট ধরিয়ে বলল, ওই ঘোরাঘুরিই হলো ওর কাল।
বড় বড় হোটেলে যাতায়াত শুরু হলো ঘন ঘন। গ্রানাদায় হোটেল ট্যুর হাসানে, কখনও কনসুলাত-এ। শুরু হলো নাচ-গান খানা-পিনা।
সিগারেটে একটা লম্বা টান দিয়ে তরুণ বলল, মরোক্কোর নাইট ক্লাবগুলো সস্তা হয়ে আরো সর্বনাশ হল।
বিকাশ ছোট্ট একটা প্রশ্ন করে, সস্তা মানে?
